প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার

জান্নাতুল ফেরদৌস জেরিন

প্রকাশ : ২৯ মার্চ ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

একটি সমৃদ্ধ জাতি গঠনের পূর্বশর্ত হলো সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। কিন্তু আমাদের সমাজের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা দীর্ঘদিন ধরে অবহেলা ও বঞ্চনার শিকার হয়ে আসছেন। আধুনিক বিশ্বে প্রতিবন্ধিতাকে এখন আর কোনো শারীরিক ত্রুটি বা ‘অভিশাপ’ হিসেবে দেখা হয় না; বরং একে বৈচিত্র্যের একটি অংশ হিসেবে গণ্য করা হয়।

বাংলাদেশেও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার সুরক্ষায় আইন ও নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে, তবে এর বাস্তব প্রতিফলন এখনও অনেক ক্ষেত্রে অনুপস্থিত।

বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার সুরক্ষায় ‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩’ একটি মাইলফলক। এই আইনে শিক্ষা, কর্মসংস্থান, চলাফেরা এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে।

এছাড়া জাতিসংঘ ঘোষিত প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার সনদ (CRPD)-এ বাংলাদেশ স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে তাদের মর্যাদা রক্ষায় আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সরকারি হিসাবমতে, দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ কোনো না কোনোভাবে প্রতিবন্ধিতার শিকার। অথচ এই বিশাল জনবলকে মূলধারার বাইরে রেখে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG) অর্জন করা অসম্ভব।

প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা এখনও বড় চ্যালেঞ্জ। সাধারণ স্কুলগুলোতে প্রায়ই অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে এসব শিশু ভর্তি হতে পারে না।

ব্রেইল পাঠ্যপুস্তক, ইশারা ভাষা বা বিশেষায়িত শিক্ষা উপকরণের অভাবে অনেক মেধাবী প্রাণ ঝরে যাচ্ছে। আইন অনুযায়ী প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য আসন সংরক্ষণ এবং সহায়ক পরিবেশ থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে তার চিত্র ভিন্ন। অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন ছাড়া তাদের স্বাবলম্বী করা সম্ভব নয়।

প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো কর্মসংস্থানের অভাব। তাদের কর্মক্ষমতাকে খাটো করে দেখার একটি নেতিবাচক প্রবণতা আমাদের নিয়োগকর্তাদের মধ্যে বিদ্যমান। অথচ সঠিক প্রশিক্ষণ ও সুযোগ পেলে তারা তথ্যপ্রযুক্তি, হস্তশিল্প এমনকি প্রশাসনিক কাজেও দক্ষতার পরিচয় দিতে পারেন। সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা থাকলেও বেসরকারি খাতে তাদের অংশগ্রহণ এখনও নগণ্য। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ভিক্ষাবৃত্তি বা অন্যের ওপর নির্ভরশীলতা থেকে সরিয়ে আনতে ক্ষুদ্রঋণ এবং কারিগরি শিক্ষার প্রসার ঘটানো জরুরি।

শহর বা গ্রামের অবকাঠামো এখনও প্রতিবন্ধী-বান্ধব হয়ে ওঠেনি। গণপরিবহন, ফুটপাত, সরকারি-বেসরকারি অফিস বা শপিং মল- কোথাও তাদের জন্য র‌্যাম্প (Ramp) বা বিশেষ টয়লেটের ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। চলাফেরার এই সীমাবদ্ধতা তাদের ঘরের কোণে বন্দি করে রাখে, যা তাদের মানসিক বিকাশে অন্তরায়। একটি আধুনিক রাষ্ট্রে লিফট, প্রশস্ত দরজা এবং উপযুক্ত গণপরিবহন ব্যবস্থা থাকা বাঞ্ছনীয়, যা একজন হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী বা দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তি স্বাধীনভাবে ব্যবহার করতে পারেন।

আইন বা অবকাঠামোর চেয়েও বড় বাধা হলো আমাদের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রায়ই করুণার পাত্র হিসেবে দেখা হয়। অনেক পরিবারে তাদের বোঝা মনে করে লুকিয়ে রাখা হয়। এই মানসিকতা পরিবর্তনের সময় এসেছে। তারা দয়া বা অনুদান চান না, তারা চান তাদের মেধা প্রমাণের সুযোগ। ইশারা ভাষাকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং গণমাধ্যমে তাদের সফলতার গল্প তুলে ধরা প্রয়োজন যাতে সাধারণ মানুষের মধ্যে ইতিবাচক ধারণা তৈরি হয়। সুপারিশ ও করণীয়

প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার নিশ্চিত করতে হলে বহুমুখী পদক্ষেপ প্রয়োজন-

আইনের কঠোর প্রয়োগ : ২০১৩ সালের সুরক্ষা আইনের প্রতিটি ধারা বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কঠোর হতে হবে।

কারিগরি শিক্ষা : তাদের সক্ষমতা অনুযায়ী বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করতে হবে।

ভাতা বৃদ্ধি : বর্তমান মূল্যস্ফীতির বাজারে প্রতিবন্ধী ভাতার পরিমাণ বৃদ্ধি করা এবং তা স্বচ্ছতার সাথে বণ্টন করা জরুরি।

স্থাপত্যিক পরিবর্তন : সব নতুন ভবন ও গণপরিবহনে প্রতিবন্ধী-বান্ধব নকশা বাধ্যতামূলক করা।

স্বাস্থ্যসেবা : বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে ফিজিওথেরাপি, সহায়ক সরঞ্জাম (হুইলচেয়ার, হিয়ারিং এইড) এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা।

প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা আমাদের সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাদের পেছনে ফেলে রেখে কোনো রাষ্ট্র উন্নত হতে পারে না। তারা আমাদের ভাই, বোন, বন্ধু বা সহকর্মী। তাদের প্রতি সহমর্মী হওয়া মানে এই নয় যে তাদের ছোট করা, বরং তাদের অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া।

সরকার, বেসরকারি সংস্থা এবং সাধারণ নাগরিক- সবাই মিলে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়তে পারলেই প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার প্রকৃত অর্থে প্রতিষ্ঠিত হবে। ২০৪১ সালের উন্নত বাংলাদেশ গড়তে হলে প্রতিটি মানুষের মেধা ও শ্রমকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

জান্নাতুল ফেরদৌস জেরিন

শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়