অনলাইন প্রতারণা এখন বৈশ্বিক সমস্যা

তৌসিফ রেজা আশরাফী

প্রকাশ : ২৯ মার্চ ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ডিজিটাল যুগ আমাদের জীবনকে যেমন সহজ করেছে, তেমনি খুলে দিয়েছে অপরাধের এক নতুন দিগন্ত। একসময় প্রতারণা বলতে বোঝানো হতো মুখোমুখি ঠকানো, জাল দলিল বা সরাসরি অর্থ আত্মসাৎ। কিন্তু আজ প্রতারণার রূপ বদলেছে এখন তা ঘটছে স্মার্টফোনের স্ক্রিনে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, এমনকি একটি সাধারণ ফোন কলের মাধ্যমে। অনলাইন প্রতারণা এখন শুধু বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি একটি সংগঠিত, প্রযুক্তিনির্ভর এবং দ্রুত বিস্তারমান অপরাধব্যবস্থা।

বাংলাদেশসহ বিশ্বজুড়ে ডিজিটাল আর্থিক সেবা, মোবাইল ব্যাংকিং এবং ই-কমার্সের বিস্তার ঘটেছে দ্রুতগতিতে। গবেষণা বলছে, এই ডিজিটাল সম্প্রসারণ যেমন অর্থনীতিকে গতিশীল করেছে, তেমনি তৈরি করেছে নতুন ঝুঁকিও। বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৫ সালে ডিজিটাল লেনদেন ৩০ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে, অথচ একই সময়ে সাইবার জালিয়াতির অভিযোগ বেড়েছে প্রায় ২৫ শতাংশ।

বিশেষ করে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (MFS), অনলাইন ব্যাংকিং এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে কেন্দ্র করে প্রতারণার সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। একটি বেসরকারি গবেষণা সংস্থার জরিপ অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৬৫ শতাংশ ইন্টারনেট ব্যবহারকারী জীবনের কোনো না কোনো সময়ে অনলাইন প্রতারণার ঝুঁকির সম্মুখীন হয়েছেন, এবং তাদের মধ্যে প্রায় ১৮ শতাংশ সরাসরি ক্ষতির শিকার হয়েছেন।

বর্তমানে অনলাইন প্রতারণার নানা রূপ দেখা যাচ্ছে। সবচেয়ে প্রচলিত কিছু হলো ফিশিং (ভুয়া লিংক বা ওয়েবসাইটের মাধ্যমে তথ্য চুরি), OTP বা ব্যাংক তথ্য জেনে নেওয়া, অনলাইন শপিং প্রতারণা, ভুয়া বিনিয়োগ স্কিম, চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে অর্থ হাতিয়ে নেওয়া। বাংলাদেশের সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, অনলাইন শপিং প্রতারণাই সবচেয়ে বেশি ঘটছে। একটি সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, মোট অনলাইন প্রতারণার প্রায় ৪০ শতাংশই ই-কমার্স সংশ্লিষ্ট। এছাড়া বিনিয়োগ প্রতারণা প্রায় ২৫ শতাংশ এবং চাকরির প্রতারণা প্রায় ১৫ শতাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায়। গবেষণায় আরও দেখা গেছে, এসব প্রতারণা সাধারণত একটি নির্দিষ্ট ধাপে পরিচালিত হয়। প্রথমে ভুক্তভোগীকে ছোট অংকের অর্থ বিনিয়োগে উৎসাহিত করা হয়, পরে ধীরে ধীরে বড় অংকের টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়। এক আন্তর্জাতিক জরিপে উঠে এসেছে, প্রায় ৭২ শতাংশ ভুক্তভোগী প্রথমে ‘বিশ্বাসযোগ্য অফার’ দেখে আকৃষ্ট হয়েছিলেন।

সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন অসংখ্য ঘটনা সামনে এসেছে, যেখানে সাধারণ মানুষ প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। এটি একটি বড় প্রবণতার প্রতিফলন যেখানে প্রতারকরা মানুষের বিশ্বাস, অজ্ঞতা এবং আবেগকে কাজে লাগায়। একটি জরিপে দেখা গেছে, প্রতারণার শিকারদের মধ্যে প্রায় ৫৫ শতাংশই মধ্যবিত্ত শ্রেণির এবং তাদের বড় অংশই প্রথমবারের মতো এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন। আরেকটি বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৪৫ বছরের বেশি বয়সীদের মধ্যে ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি, কারণ তারা প্রযুক্তিগত প্রতারণার কৌশল সম্পর্কে কম অবগত।

বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি কারণকে দায়ী করছেন-

ডিজিটাল অজ্ঞতা : অনেক ব্যবহারকারী এখনও সাইবার নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতন নন। তারা সহজেই ভুয়া লিংকে ক্লিক করেন বা ব্যক্তিগত তথ্য শেয়ার করেন। একটি জরিপ অনুযায়ী, প্রায় ৫৮ শতাংশ ব্যবহারকারী শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ব্যবহারের গুরুত্ব সম্পর্কে জানেন না।

প্রযুক্তির অপব্যবহার : ডিপফেইক, এআই এবং উন্নত সফটওয়্যার ব্যবহার করে প্রতারকরা এখন আরও বিশ্বাসযোগ্য প্রতারণা করতে পারছে। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, এআই-নির্ভর প্রতারণার ঘটনা গত দুই বছরে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।

আইনি দুর্বলতা ও প্রয়োগের সীমাবদ্ধতা : আইন থাকলেও তার প্রয়োগ যথাযথ নয়। অনেক ক্ষেত্রে অভিযোগ করলেও দ্রুত বিচার বা অর্থ পুনরুদ্ধার সম্ভব হয় না। একটি জরিপে দেখা গেছে, মাত্র ২০ শতাংশ ভুক্তভোগী আইনি সহায়তা নিতে আগ্রহী হন।

তৌসিফ রেজা আশরাফী

লেখক ও শিক্ষার্থী, দিনাজপুর আইন কলেজ