যুদ্ধ ও বিশ্ব খাদ্য নিরাপত্তা : এক অনিবার্য মহাবিপর্যয়

প্রকাশ : ২৯ মার্চ ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

আজকের বিশ্ব যখন প্রযুক্তির চরম শিখরে, তখনও ক্ষুধার মতো একটি মৌলিক আদিম সমস্যার কাছে আমরা অসহায় হয়ে পড়ছি। এর পেছনে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা জলবায়ু পরিবর্তন যতটা না দায়ী, তার চেয়ে অনেক বেশি দায়ী মানুষের সৃষ্ট সংঘাত ও যুদ্ধ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক যুদ্ধ স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, কামানের গোলা শুধু প্রতিপক্ষের বাঙ্কার ধ্বংস করে না, তা বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের অন্নসংস্থানও তছনছ করে দেয়। যুদ্ধ আজ বিশ্ব খাদ্য নিরাপত্তার জন্য একক বৃহত্তম হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

যুদ্ধ সরাসরি কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থা পঙ্গু করে দেয়। যখন কোনো অঞ্চলে যুদ্ধ শুরু হয়, তখন আবাদি জমিগুলো রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। কৃষক তার লাঙল ফেলে জীবন বাঁচাতে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ঘর ছাড়ে। ফলে বিশাল এলাকা অনাবাদি থেকে যায়। শুধু তাই নয়, যুদ্ধের কারণে সেচ ব্যবস্থা, গুদামজাতকরণ এবং পরিবহণ অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে যায়।

আধুনিক বৈশ্বিক অর্থনীতিতে কোনো দেশই স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। প্রতিটি দেশই কোনো না কোনোভাবে একে অন্যের ওপর নির্ভরশীল। যেমন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কথাই ধরা যাক। এই দুটি দেশ বিশ্বের মোট গমের চাহিদার প্রায় ৩০ শতাংশ সরবরাহ করত। যুদ্ধের কারণে কৃষ্ণসাগর দিয়ে পণ্য পরিবহণ ব্যাহত হওয়ায় লোহিত সাগর থেকে শুরু করে আফ্রিকার প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত রুটির দাম আকাশচুম্বী হয়েছে। যখন একটি ‘রুটির ঝুড়ি’ হিসেবে পরিচিত অঞ্চল যুদ্ধে লিপ্ত হয়, তখন তার রেশ সারা বিশ্বের খাবারের টেবিলে গিয়ে পৌঁছায়।

খাদ্য নিরাপত্তার সঙ্গে জ্বালানি ও কৃষি উপকরণের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। যুদ্ধের ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যায়, যা সরাসরি কৃষি পণ্যের উৎপাদন ও পরিবহণ খরচ বাড়িয়ে দেয়। ট্র্যাক্টর চালানো থেকে শুরু করে পণ্য বাজারে নেওয়া- সবখানেই বাড়তি খরচ যুক্ত হয়। এছাড়া, রাশিয়া ও বেলারুশ বিশ্বের প্রধান সার রপ্তানিকারক দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। যুদ্ধের কারণে সারের সরবরাহ কমে যাওয়ায় এবং দাম বেড়ে যাওয়ায় উন্নয়নশীল দেশের কৃষকরা পর্যাপ্ত সার ব্যবহার করতে পারছে না। এর ফলে ফসলের ফলন কমছে, যা আগামী বছরগুলোতে আরও বড় ধরনের খাদ্য সংকটের পূর্বাভাস দিচ্ছে। অর্থাৎ, আজকের যুদ্ধ শুধু বর্তমানের খাবার কেড়ে নিচ্ছে না, তা ভবিষ্যতের উৎপাদনও অনিশ্চিত করে তুলছে।

যুদ্ধ শুধু পরোক্ষভাবে খাদ্য সংকট সৃষ্টি করে না, অনেক ক্ষেত্রে খাদ্য ‘যুদ্ধের অস্ত্র’ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। অবরোধ বা ব্লকেড তৈরি করে একটি জনপদ ক্ষুধার্ত রাখা যুদ্ধের ইতিহাসে এক কলঙ্কিত অধ্যায়। যখন কোনো অঞ্চলে খাদ্য সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়, তখন নারী ও শিশুরা সব থেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অপুষ্টি ও অনাহার শুধু মানুষের শারীরিক ক্ষতি করে না, একটি প্রজন্মের মেধা ও সম্ভাবনাও ধ্বংস করে দেয়।

গাজা থেকে শুরু করে সুদান কিংবা ইয়েমেন- প্রতিটি সংঘাতপূর্ণ এলাকায় আমরা দেখছি কীভাবে খাদ্যের অভাব দুর্ভিক্ষে রূপ নিচ্ছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর তথ্য মতে, বিশ্বে বর্তমানে ক্ষুধার্ত মানুষের এক বিশাল অংশই বাস করে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশগুলোতে। শান্তির অভাব যেখানে প্রকট, সেখানে পেট ভরে দুমুঠো ভাত খাওয়া এক বিলাসিতায় পরিণত হয়েছে।

যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ববাজারে যখনই কোনো পণ্যের সংকট দেখা দেয়, অমনি শুরু হয় মজুতদারি ও মুনাফাখোরি। এর ফলে স্থানীয় বাজারে খাদ্য দ্রব্যের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যায়। নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো তাদের আয়ের সিংহভাগ শুধু খাবারের পেছনে ব্যয় করতে বাধ্য হচ্ছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য বা উন্নত জীবনযাত্রার জন্য সঞ্চয় করার সুযোগ তাদের আর থাকছে না। এই অর্থনৈতিক চাপ সমাজ ও রাষ্ট্রে অস্থিরতা তৈরি করে, যা অনেক সময় নতুন সংঘাতের জন্ম দেয়। অর্থাৎ, যুদ্ধ খাদ্য সংকট তৈরি করে, আর সেই খাদ্য সংকট আবার নতুন যুদ্ধের উসকানি দেয়।

যুদ্ধ ও খাদ্য সংকটের এই দুষ্টচক্র থেকে বেরিয়ে আসা সহজ নয়, তবে অসম্ভবও নয়। এজন্য প্রয়োজন বৈশ্বিক সদিচ্ছা এবং সমন্বিত উদ্যোগ। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রথম শর্ত হলো শান্তি। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে শুধু ত্রাণ পাঠানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে যুদ্ধ বন্ধে কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে। কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কমিয়ে আঞ্চলিক পর্যায়ে খাদ্য উৎপাদন বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। বিশ্বব্যাপী উৎপাদিত খাদ্যের একটি বড় অংশ নষ্ট হয়। এই অপচয় কমিয়ে তা অভাবী মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার প্রযুক্তিগত উন্নয়ন প্রয়োজন। খাদ্যকে যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা আন্তর্জাতিক আদালতে কঠোর অপরাধ হিসেবে গণ্য করতে হবে এবং দায়ীদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে।

পরিশেষে বলা যায়, মানবসভ্যতা যখন মঙ্গল গ্রহে বসতি স্থাপনের স্বপ্ন দেখছে, তখন পৃথিবীতে কোটি কোটি মানুষের ক্ষুধার্ত থাকা চরম লজ্জাজনক। যুদ্ধ কোনো সমস্যার সমাধান দেয় না, বরং নতুন হাজারো সমস্যার জন্ম দেয়। খাদ্য মানুষের মৌলিক অধিকার, কোনো রাজনৈতিক দর কষাকষির পণ্য নয়। বিশ্বনেতাদের মনে রাখা উচিত, একটি ক্ষুধার্ত পৃথিবী কখনই টেকসই শান্তিতে থাকতে পারে না। তাই আগামীর পৃথিবী বিপদমুক্ত করতে হলে কামানের গর্জনের চেয়ে ফসলের মাঠের হাসিকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। যুদ্ধ থামলে তবেই পৃথিবীর ক্ষুধার জ্বালা মিটবে।