বেলফোর থেকে বর্তমান : রক্তাক্ত এক ইতিহাসের প্রতিচ্ছবি
সাদিয়া সুলতানা রিমি
প্রকাশ : ৩০ মার্চ ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
ইতিহাস কখনও নিছক অতীতের গল্প নয়; এটি বর্তমানের বাস্তবতা এবং ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করে। ১৯১৭ সালের বেলফোর ঘোষণা সেই ধরনেরই একটি ঘটনা, যার প্রতিধ্বনি আজও বিশ্ব রাজনীতির অন্দরমহলে প্রবলভাবে অনুরণিত হচ্ছে। এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে মধ্যপ্রাচ্যকে রক্তাক্ত করে তোলা এই ইতিহাস শুধু ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতের কাহিনি নয়, এটি মানুষের বেদনা, বাস্তুচ্যুতি, অধিকারহীনতা এবং অসম শক্তির রাজনীতির এক নির্মম দলিল।
বেলফোর ঘোষণা ছিল একটি চিঠি ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী আর্থার বেলফোরের পক্ষ থেকে লর্ড রথসচাইল্ডের কাছে পাঠানো। এতে ফিলিস্তিনে ‘ইহুদি জাতির জন্য একটি জাতীয় আবাস’ প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। কিন্তু এই প্রতিশ্রুতির সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য ছিল যে ভূখণ্ডের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছিল, সেখানে বসবাসকারী মানুষের মতামতকে সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করা হয়েছিল। ফিলিস্তিন তখনও ব্রিটিশদের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে ছিল না, তবুও একটি বহিরাগত শক্তি সেই ভূমির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে দেয়।
এই ঘোষণার পেছনে ছিল ঔপনিবেশিক স্বার্থ ও কূটনৈতিক হিসাব-নিকাশ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে ব্রিটেন মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করতে চেয়েছিল। সাইক্স-পিকো চুক্তির মাধ্যমে ফ্রান্সের সঙ্গে গোপনে অঞ্চল ভাগাভাগির যে পরিকল্পনা করা হয়, বেলফোর ঘোষণা ছিল তারই ধারাবাহিকতা। একদিকে আরবদের স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি দেওয়া, অন্যদিকে একই ভূখণ্ডে আরেক জাতির জন্য রাষ্ট্র গঠনের প্রতিশ্রুতি এই দ্বৈত নীতি ভবিষ্যতের সংঘাতের বীজ বপন করে।
পরবর্তী সময়ে লিগ অব নেশনসের ম্যান্ডেট ব্যবস্থার মাধ্যমে ব্রিটেন ফিলিস্তিনের শাসনভার পায় এবং বেলফোর ঘোষণাকে বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে যায়। এর ফলে ইউরোপ থেকে ইহুদি অভিবাসন বৃদ্ধি পায় এবং স্থানীয় আরব জনগোষ্ঠীর মধ্যে উদ্বেগ ও ক্ষোভ তৈরি হয়। জমির মালিকানা, রাজনৈতিক অধিকার এবং সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব নিয়ে দ্বন্দ্ব ক্রমেই তীব্র হতে থাকে।
১৯৪৭ সালে জাতিসংঘের বিভাজন পরিকল্পনা পরিস্থিতিকে নতুন মোড় দেয়। ফিলিস্তিনকে দুই ভাগে ভাগ করার প্রস্তাব দেওয়া হয় একটি ইহুদি রাষ্ট্র এবং একটি আরব রাষ্ট্র। যদিও এই পরিকল্পনা আন্তর্জাতিক মহলে সমর্থন পায়, ফিলিস্তিনি আরবরা এটিকে অন্যায্য বলে প্রত্যাখ্যান করে। কারণ, তখনকার জনসংখ্যার বাস্তবতার সঙ্গে এই বিভাজন সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না।
১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ঘোষণার পরপরই শুরু হয় প্রথম আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ। এই যুদ্ধ শুধু একটি রাষ্ট্রের জন্মই নয়, বরং লক্ষাধিক মানুষের বাস্তুচ্যুতির সূচনা করে। ফিলিস্তিনিদের কাছে এটি ‘নাকবা’ বা বিপর্যয় হিসেবে পরিচিত যেখানে প্রায় ৭ লাখ ৫০ হাজার মানুষ তাদের ঘরবাড়ি হারিয়ে শরণার্থী হয়ে পড়ে।
এরপরের দশকগুলোতে মধ্যপ্রাচ্য একের পর এক যুদ্ধের সাক্ষী হয় ১৯৫৬, ১৯৬৭, ১৯৭৩ সাল, প্রতিটি সংঘাতই অঞ্চলটিকে আরও অস্থিতিশীল করে তোলে। ১৯৬৭ সালের ছয় দিনের যুদ্ধে ইসরায়েল পশ্চিম তীর, গাজা, পূর্ব জেরুজালেম এবং গোলান মালভূমি দখল করে নেয়। এই দখলদারিত্ব আজও আন্তর্জাতিক রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে রয়ে গেছে।
এই দীর্ঘ সংঘাতের সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হয়েছে সাধারণ মানুষকে। হাজার হাজার প্রাণহানি, লক্ষ লক্ষ মানুষের বাস্তুচ্যুতি, ধ্বংসপ্রাপ্ত শহর ও অবকাঠামো এসবই এই ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। গাজা উপত্যকা আজ বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ এবং সংকটাপন্ন অঞ্চল, যেখানে মানুষের মৌলিক অধিকার প্রতিনিয়ত হুমকির মুখে।
তবে এই সংঘাত শুধুমাত্র ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। এটি পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে প্রভাবিত করেছে। লেবাননের গৃহযুদ্ধ, সিরিয়ার অস্থিরতা, ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা সবকিছুর পেছনে কোনো না কোনোভাবে এই সংঘাতের ছায়া রয়েছে। একইসঙ্গে এটি বৈশ্বিক শক্তিগুলোর মধ্যেও বিভাজন সৃষ্টি করেছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, রাশিয়া এবং অন্যান্য শক্তিধর দেশগুলোর স্বার্থ জড়িত।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ইসরায়েলের অন্যতম প্রধান মিত্র হিসেবে তারা দীর্ঘদিন ধরে সামরিক ও কূটনৈতিক সহায়তা প্রদান করে আসছে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি ও প্রভাব ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, কিন্তু একইসঙ্গে এটি সমালোচনারও জন্ম দিয়েছে।
অন্যদিকে, ফিলিস্তিনিদের সংগ্রাম বিশ্বজুড়ে সহানুভূতি ও সংহতির প্রতীক হয়ে উঠেছে। মানবাধিকার, ন্যায়বিচার এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের প্রশ্নে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও মানবাধিকার সংগঠন বারবার এই অঞ্চলের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
বর্তমান সময়েও এই সংঘাতের অবসান ঘটেনি। বরং এটি নতুন নতুন রূপে অব্যাহত রয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গাজায় সংঘর্ষ, পশ্চিম তীরে সহিংসতা এবং জেরুজালেমকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা আবারও বিশ্বকে নাড়া দিয়েছে। প্রযুক্তির উন্নতির ফলে এই সংঘাতের চিত্র এখন মুহূর্তেই বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ছে, যা জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
তবে প্রশ্ন হচ্ছে এই দীর্ঘ সংঘাতের সমাধান কোথায়? দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান বহুদিন ধরে আলোচিত হলেও বাস্তবায়ন এখনও অনিশ্চিত। অবিশ্বাস, রাজনৈতিক স্বার্থ এবং ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা এই প্রক্রিয়াকে জটিল করে তুলেছে। ইতিহাস আমাদের শিখিয়েছে, একতরফা সিদ্ধান্ত এবং জনগণের মতামত উপেক্ষা করে টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠা করা যায় না। বেলফোর ঘোষণা সেই বাস্তবতার একটি জ্বলন্ত উদাহরণ। একটি ঘোষণার মাধ্যমে যে সংঘাতের সূচনা হয়েছিল, তার প্রভাব আজও লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবনে বিরাজমান। তাই প্রয়োজন একটি ন্যায়ভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাধান, যেখানে উভয় পক্ষের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়েরও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে শুধু কূটনৈতিক বিবৃতি নয়, বরং কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে শান্তি প্রতিষ্ঠায় অবদান রাখা জরুরি।
সবশেষে বলা যায়, ‘বেলফোর থেকে বর্তমান’ শুধু একটি ঐতিহাসিক ধারাবিবরণী নয়; এটি মানবতার একটি পরীক্ষা। আমরা কি অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে একটি ন্যায়সঙ্গত ও শান্তিপূর্ণ ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে পারব? নাকি ইতিহাসের এই রক্তাক্ত অধ্যায় আরও দীর্ঘায়িত হবে? উত্তরটি আমাদের সম্মিলিত সিদ্ধান্তের ওপরই নির্ভর করছে।
সাদিয়া সুলতানা রিমি
শিক্ষার্থী, গণিত বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
