ফ্যামিলি কার্ড : সামাজিক সুরক্ষায় বাংলাদেশের নতুন দিগন্ত

প্রকাশ : ৩০ মার্চ ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশে এক সময় সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী ছিল শুধু নির্দিষ্ট কিছু গোষ্ঠীর জন্য সীমিত। কিন্তু সম্প্রতি ‘ফ্যামিলি কার্ড’ বা পারিবারিক কার্ড প্রবর্তন দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর খাদ্য নিরাপত্তা ও সামাজিক সুরক্ষায় এক যুগান্তকারী অধ্যায়ের সূচনা করেছে। ক্রমবর্ধমান বিশ্ববাজারের অস্থিরতা এবং মুদ্রাস্ফীতির চাপে যখন নিম্নআয়ের মানুষের নাভিশ্বাস উঠছে, তখন এই ফ্যামিলি কার্ড হয়ে উঠেছে সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার অন্যতম প্রধান অবলম্বন।

ফ্যামিলি কার্ড ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হলো দেশের এক কোটি নিম্নআয়ের পরিবারকে স্বল্পমূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পৌঁছে দেওয়া। আগে টিসিবির (ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ) পণ্য বিক্রির ক্ষেত্রে ট্রাকের পেছনে দীর্ঘ লাইন এবং বিশৃঙ্খলার যে চিত্র দেখা যেত, ফ্যামিলি কার্ড তা আমূল বদলে দিয়েছে। এখন কার্ডধারী পরিবারগুলো সুশৃঙ্খলভাবে তাদের জন্য নির্ধারিত পণ্য- যেমন চাল, ডাল, তেল ও চিনি সাশ্রয়ী মূল্যে সংগ্রহ করতে পারছে। এটি শুধু একটি কার্ড নয়, বরং রাষ্ট্র কর্তৃক নাগরিকের মৌলিক চাহিদা পূরণের একটি আনুষ্ঠানিক অঙ্গীকার।

ফ্যামিলি কার্ডের সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো এর ডিজিটালাইজেশন। অতীতে ত্রাণ বা ভর্তুকিযুক্ত পণ্য বিতরণে নাম তালিকাভুক্তিতে অনিয়ম বা দ্বৈততার (একই ব্যক্তির একাধিক সুবিধা গ্রহণ) অভিযোগ ছিল নিত্যনৈমিত্তিক। কিন্তু স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ড প্রবর্তনের ফলে সুবিধাভোগীদের তথ্য এখন জাতীয় পরিচয়পত্রের (NID) সঙ্গে সমন্বিত। এর ফলে প্রকৃত দুস্থ পরিবারগুলো চিহ্নিত করা সহজ হয়েছে। মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য এবং ভুয়া কার্ডের ব্যবহার প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। ডাটাবেজ থাকার ফলে সরকার বুঝতে পারছে কোন অঞ্চলে কতটুকু চাহিদা রয়েছে, যা লজিস্টিক ব্যবস্থাপনা আরও উন্নত করেছে।

যখন খোলা বাজারে নিত্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যায়, তখন ফ্যামিলি কার্ড একটি ‘বাফার’ বা সুরক্ষা দেয়াল হিসেবে কাজ করে। এক কোটি কার্ডের অর্থ হলো প্রায় পাঁচ কোটি মানুষ (যদি প্রতি পরিবারে গড়ে ৫ জন সদস্য ধরা হয়) সরাসরি সরকারের এই ভর্তুকির সুবিধা পাচ্ছে। এতে করে খোলা বাজারের ওপর চাপ কমছে, যা পরোক্ষভাবে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকারকে সহায়তা করছে। নিম্নবিত্তের মানুষের পকেটে যখন কিছু টাকা সাশ্রয় হয়, তখন তারা সেই অর্থ শিক্ষা বা স্বাস্থ্যের মতো অন্যান্য মৌলিক খাতে ব্যয় করার সুযোগ পায়।

যেকোনো বৃহৎ প্রকল্পের মতো ফ্যামিলি কার্ড ব্যবস্থারও কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। দেশের জনসংখ্যা ও অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এক কোটি কার্ড হয়তো যথেষ্ট নয়। অনেক মধ্যবিত্ত পরিবার যারা বর্তমানে অর্থনৈতিক চাপে পিষ্ট, তারা এই সুবিধার আওতায় নেই। এছাড়া পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় মাঝেমধ্যে ঘাটতি এবং বিতরণের সময়সূচি নিয়ে তৃণমূল পর্যায়ে কিছু সমন্বয়হীনতা দেখা যায়।

এই ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর এই পদক্ষেপগুলো বিবেচনা করা যেতে পারে- বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় কার্ডের সংখ্যা ধাপে ধাপে বাড়ানো প্রয়োজন। শুধু তেল, ডাল বা চাল নয়, পুষ্টিমান নিশ্চিত করতে কার্ডের মাধ্যমে অন্যান্য নিত্যপণ্যও সরবরাহ করা যেতে পারে। কার্ডের মাধ্যমে পণ্যের পাশাপাশি সরাসরি নগদ অর্থ সহায়তা (Cash Transfer) প্রদান করলে তা আরও ফলপ্রসূ হবে।

‘ফ্যামিলি কার্ড’ শুধু একটি প্লাস্টিকের টুকরো বা কিছু পণ্যের ছাড়পত্র নয়; এটি বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। আমাদের স্বপ্নের সোনার বাংলায় কেউ না খেয়ে থাকবে না- এই দর্শনের বাস্তব প্রতিফলন আমরা দেখি এই সুরক্ষা কার্ডের মাধ্যমে। এটি সামাজিক বৈষম্য দূর করতে এবং প্রান্তিক মানুষের আত্মমর্যাদা রক্ষায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। প্রশাসনিক তদারকি আর সদিচ্ছা বজায় থাকলে এই প্রকল্প বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের সামাজিক নিরাপত্তার এক অনন্য মডেল হিসেবে স্বীকৃতি পাবে।