প্রযুক্তির অগ্রগতি : সুবিধা ও সংকট

মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর ইসলাম

প্রকাশ : ৩১ মার্চ ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মানবসভ্যতার অগ্রযাত্রার ইতিহাস মূলত উন্নয়নের ইতিহাস। আর সেই উন্নয়নের সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার হলো প্রযুক্তি। প্রাগৈতিহাসিক যুগে আগুনের আবিষ্কার থেকে শুরু করে বর্তমান সময়ের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবটিক্স এবং মহাকাশ প্রযুক্তি সবকিছুই আমাদের জীবনকে বদলে দিয়েছে। সাহায্য করছে বিকশিত করতে আমাদের জ্ঞান, সহজতর করছে দৈনন্দিন কাজ-কর্ম। প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে সহজ করার সঙ্গে সঙ্গে উৎপাদনশীলতা বাড়িয়েছে এবং বিশ্বকে আগের চেয়ে অনেক বেশি সংযুক্ত করেছে। তবে একই সঙ্গে প্রযুক্তি নিয়ে বিতর্কও কম নয়। অনেকেই মনে করেন প্রযুক্তি মানুষের জন্য আশীর্বাদ। আবার কেউ কেউ মনে করেন এটি ধীরে ধীরে মানবজাতির জন্য অভিশাপে পরিণত হচ্ছে। বাস্তবতা হলো প্রযুক্তি নিজে ভালো বা মন্দ নয়। এর ব্যবহারই নির্ধারণ করে এটি মানুষের জন্য আশীর্বাদ হবে নাকি অভিশাপ।

প্রযুক্তির ইতিবাচক প্রভাব নিয়ে আলোচনা করলে প্রথমেই চিকিৎসা ক্ষেত্রের কথা বলতে হয়। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে প্রযুক্তির অবদান অপরিসীম। একসময় যে রোগগুলোকে মরণব্যাধি হিসেবে ধরা হতো, আজ উন্নত প্রযুক্তির কারণে সেগুলোর চিকিৎসা সম্ভব হচ্ছে। বিভিন্ন উন্নত ডায়াগনস্টিক যন্ত্র যেমন এমআরআই, সিটি স্ক্যান, আল্ট্রাসাউন্ড কিংবা ল্যাবরেটরি পরীক্ষার আধুনিক পদ্ধতি রোগ নির্ণয়কে করেছে দ্রুত ও নির্ভুল। বিধায় চিকিৎসা ব্যবস্থার দক্ষতা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং মানুষের গড় আয়ু বেড়েছে।

টেলিমেডিসিনের মাধ্যমে দূরবর্তী এলাকার মানুষও এখন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ পেতে পারছেন, যা স্বাস্থ্যসেবাকে আরও সহজলভ্য করে তুলেছে। যোগাযোগব্যবস্থায় প্রযুক্তির বিপ্লব মানুষের জীবনকে আমূল পরিবর্তন করেছে। একসময় দূরের মানুষের সাথে যোগাযোগ করতে সপ্তাহ বা মাস লেগে যেত। নির্ভর করতে হতো চিঠি বা টেলিগ্রামের ওপর। কিন্তু বর্তমানে ইন্টারনেট ও স্মার্টফোনের মাধ্যমে মুহূর্তের মধ্যেই পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যোগাযোগ করা সম্ভব হচ্ছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তথ্য আদান-প্রদানকে করেছে দ্রুত ও সহজ। ফলে পৃথিবী যেন একটি গ্লোবাল ভিলেজে পরিণত হয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা এবং ব্যক্তিগত যোগাযোগ- সব ক্ষেত্রেই প্রযুক্তি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। শিক্ষা ক্ষেত্রেও প্রযুক্তির অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ডিজিটাল প্রযুক্তির কারণে শিক্ষার পরিধি অনেক বিস্তৃত হয়েছে। অনলাইন ক্লাস, ই-বুক, ডিজিটাল লাইব্রেরি এবং বিভিন্ন শিক্ষামূলক প্ল্যাটফর্ম শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করেছে। এখন গ্রামের একজন শিক্ষার্থী ঘরে বসেই বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকচার দেখতে পারে। করোনাকালীন অনলাইন শিক্ষাব্যবস্থা প্রমাণ করেছে যে, প্রযুক্তি শিক্ষাব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে কতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রেও প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। আধুনিক প্রযুক্তির কারণে শিল্প ও কৃষি উভয় ক্ষেত্রেই উৎপাদন বেড়েছে।

কৃষিক্ষেত্রে উন্নত যন্ত্রপাতি, উন্নত বীজ এবং তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার কৃষকদের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করেছে। একইভাবে শিল্পক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয় মেশিন উৎপাদনকে দ্রুত ও কার্যকর করেছে। ফলে উৎপাদন খরচ কমেছে এবং পণ্যের মান উন্নত হয়েছে। আজ বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রযুক্তি একটি প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে। নতুন নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগও সৃষ্টি করছে। যেমন- তথ্যপ্রযুক্তি খাত, ফ্রিল্যান্সিং, ই-কমার্স ইত্যাদি। তবে প্রযুক্তির ইতিবাচক দিকের পাশাপাশি কিছু নেতিবাচক প্রভাবও রয়েছে, যা সমাজের জন্য উদ্বেগজনক। প্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহার মানুষের সামাজিক ও পারিবারিক সম্পর্ককে দুর্বল করে দিচ্ছে। বর্তমানে অনেক মানুষ বাস্তব জীবনের চেয়ে ভার্চুয়াল জগতে বেশি সময় কাটাচ্ছেন। পরিবারে বসেও অনেকেই মোবাইল ফোনে ব্যস্ত থাকেন। ফলে দিনদিন পারস্পরিক যোগাযোগ কমে যাচ্ছে।

এটি সমাজে এক ধরনের সামাজিক বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি করছে। কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও প্রযুক্তি একটি বড় পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। আধুনিক প্রযুক্তির কারণে অনেক কাজ এখন স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র দ্বারা সম্পন্ন হচ্ছে। শিল্পকারখানায় রোবট এবং স্বয়ংক্রিয় মেশিন ব্যবহারের ফলে মানুষের শ্রমের প্রয়োজন কমে যাচ্ছে। ফল স্বরূপ অনেক ক্ষেত্রে বেকারত্বের আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। যদিও প্রযুক্তি নতুন ধরনের কাজের সুযোগ সৃষ্টি করে। তবুও অনেক মানুষ সেই নতুন দক্ষতা অর্জন করতে পারছেন না। প্রযুক্তির অপব্যবহার সমাজে বিভিন্ন সমস্যার জন্ম দিচ্ছে। সাইবার অপরাধ বর্তমানে একটি বড় উদ্বেগের বিষয়। অনলাইন প্রতারণা, তথ্য চুরি, হ্যাকিং এবং ভুয়া খবর ছড়ানোর মতো ঘটনা দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ছড়িয়ে কখনও কখনও সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি হয়। এছাড়া তরুণদের মধ্যে প্রযুক্তি আসক্তি একটি বড় সমস্যা হয়ে উঠছে। অতিরিক্ত মোবাইল বা ইন্টারনেট ব্যবহারের কারণে তাদের পড়াশোনা, শারীরিক স্বাস্থ্য এবং মানসিক ভারসাম্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। পরিবেশগত দিক থেকেও প্রযুক্তির কিছু নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে। শিল্পায়ন ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নের ফলে পরিবেশ, বায়ু, পানি ও মাটির দূষণ বেড়েছে। ইলেকট্রনিক যন্ত্রের ব্যবহার বাড়ার ফলে ই-ওয়েস্ট বা ইলেকট্রনিক বর্জ্যরে পরিমাণও দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি। প্রযুক্তির কারণে জ্বালানির চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে। যা জলবায়ু পরিবর্তনের সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলছে। তবে এসব সমস্যার জন্য প্রযুক্তি নিজে দায়ী নয়। মূলত মানুষের অসচেতন ব্যবহারই এর জন্য দায়ী। সঠিক পরিকল্পনা ও নীতিমালার মাধ্যমে প্রযুক্তির নেতিবাচক প্রভাব অনেকটাই কমানো সম্ভব। সাইবার নিরাপত্তা জোরদার করা, প্রযুক্তি ব্যবহারে নৈতিক শিক্ষা প্রদান এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি উদ্ভাবনের মাধ্যমে এই সমস্যাগুলো মোকাবিলা করা যায়।

শিক্ষাব্যবস্থায় প্রযুক্তি ব্যবহারের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার সম্পর্কে সচেতন করা জরুরি। একই সঙ্গে সরকার ও সমাজকে প্রযুক্তির সুফলকে সর্বোচ্চভাবে কাজে লাগাতে হবে এবং এর অপব্যবহার রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে সুশাসন, নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ এবং সচেতনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বলাবাহুল্য প্রযুক্তি নিজে আশীর্বাদ বা অভিশাপ নয়। এটি মানুষের হাতে একটি শক্তিশালী হাতিয়ার মাত্র।

এটি মানুষের জীবনকে সহজ করতে পারে। আবার ভুল ব্যবহারের ফলে বড় ধরনের সমস্যার কারণও হতে পারে। সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারলে মানবসভ্যতার উন্নয়নের পথকে আরও সুগম করবে এবং আমাদের জীবনকে করবে আরও সমৃদ্ধ। প্রযুক্তিকে আশীর্বাদ হিসেবে পেতে হলে আমাদের সচেতন ও দায়িত্বশীলভাবে এটি ব্যবহার করতে হবে। সঠিক নীতি, শিক্ষা এবং সচেতনতার মাধ্যমে প্রযুক্তিকে মানবকল্যাণের পথে পরিচালিত করা সম্ভব। শুধু তখনই প্রযুক্তি সত্যিকার অর্থে মানবসভ্যতার জন্য আশীর্বাদ হয়ে উঠবে, অভিশাপ নয়।

মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর ইসলাম

শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়