চলমান সংকটে সাধারণ মানুষের হাহাকার
সাফিয়া ইসলাম দিশা
প্রকাশ : ৩১ মার্চ ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
মুসলিম বিশ্বের প্রত্যেক মুসলমানের জন্য রমজান মাস অত্যন্ত পবিত্র ও গুরুত্বপূর্ণ। মুসলিম উম্মাহ দীর্ঘ ১ মাস সাওম পালন করেন। রমজান শুধু পানাহার থেকে বিরত থাকা নয়, এটি আমাদের সংযমের শিক্ষা দেয়। রমজান আমাদের নফসের বিরুদ্ধে লড়াই করে আমাদের আল্লাহর সান্নিধ্য পাওয়ার সুযোগ করে দেয়। পবিত্র রমজান মাস সংযমের শিক্ষা দিলেও আমাদের দেশে বাস্তবে দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। এই মাসকে কেন্দ্র করে অসাধু ব্যবসায়ী, সিন্ডিকেট নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বাড়ানোর জন্য তৎপর থাকে।
পবিত্র রমজান মাসকে ঘিরে সাধারণ মানুষের অনেক প্রস্তুতি থাকে, বিশেষত নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ক্রয়ের। কিন্তু অন্যান্য অমুসলিম দেশ যখন রমজান উপলক্ষে পণ্যে মূল্য ছাড় দেয় তখন বাংলাদেশে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী, সিন্ডিকেট নিত্যপণ্যের হঠাৎ সংকট দেখিয়ে মূল্য বৃদ্ধি করে। পণ্যের সংকট না থাকা সত্ত্বেও সংকট তৈরি করে। যেমন এবার রমজানের শুরুতে লেবু, শসা, বেগুন, ফলের অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধি হয়ে যায়, যা সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে চলে যায়। ফলে জনগণকে এসব পণ্য চড়া মূল্যে ক্রয় করতে হয়েছে। এমনকি সাধারণ জনগণের এসব পণ্য ক্রয়ের চাহিদা থাকা সত্ত্বেও চড়া মূল্যের কারণে ক্রয় করতে পারেনি। যেখানে এই পবিত্র মাসকে ঘিরে পারস্পরিক সহমর্মিতা থাকার কথা সেখানে দ্রব্যমূল্যে দাম বাড়িয়ে মানুষকে বিপদে ফেলা হয়।
পৃথিবীতে যখন মাহে রমজানের সুঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়েছে তখন বাংলাদেশে বেড়েছে হত্যা ও ধর্ষণের ঘটনা। রমজানের এই পবিত্র সময়েও থেমে নেই হত্যা ও ধর্ষণ। অন্যায়ের প্রতিবাদ করলেই বা ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে অসময়ে ঝড়ে যাচ্ছে অসংখ্য প্রাণ। দেশে ধর্ষণ বেড়েই চলেছে যার শিকার হচ্ছে ৪ বছরের শিশু থেকে শুরু করে যেকোনো বয়সের নারী। সম্প্রতি নরসিংদী, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, ঈশ্বরদীর ধর্ষণের বিভৎস ঘটনাগুলো নারীদের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে। এ দেশ যেন এক মৃত্যুপুরী! অকালে শেষ হয়ে যাচ্ছে সম্ভবনাময় অসংখ্য তরুণীর জীবন। কিন্তু রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এর কোনো প্রতিকারের প্রচেষ্টা দেখা যাচ্ছে না।
বাংলাদেশে যখন রমজান মাসের শুরু থেকে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি ও আইনশৃঙ্খলার অবনতিতে বিপর্যস্ত তখনই পৃথিবীতে দেখা দিয়েছে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের পূর্বাভাস। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানকে আক্রমণ করেছে। ইরানও পাল্টা হামলা হিসেবে ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন সামরিক ঘাটিগুলোতে আক্রমণ চালাচ্ছে। ফলে বেজে উঠেছে যুদ্ধের দামামা। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আক্রমণে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যু হলে এই যুদ্ধ তীব্র আকার ধারণ করে। যুদ্ধরত দেশগুলোতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানি ঘটছে। ইরানের মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে আক্রমণের ফলে বাংলাদেশের সঙ্গে বহু মধ্যপ্রাচ্যগামী ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। এতে দুর্ভোগে পড়েছে বহু প্রবাসী বাংলাদেশি। এছাড়াও মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত অনেক প্রবাসী বাংলাদেশি হামলায় আহত ও নিহত হয়েছে। আয়াতুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর ইরান হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ায় বিশ্ববাজারে তৈরি হয়েছে তেলের সংকটের আশঙ্কা। যুদ্ধের শুরু থেকেই বাংলাদেশে তেল নিয়ে তৈরি হয়েছে কৃত্রিম সংকট।
তেল পাওয়া যাবে না সন্দেহে অসংখ্য মানুষ ফিলিং স্টেশনগুলোতে ভিড় জমিয়েছে। মানুষের চাহিদা অনুযায়ী তেল সরবরাহ করতে হিমশিম খাচ্ছে ফিলিং স্টেশনগুলো। ফলে দীর্ঘ হচ্ছে লাইন। এরইমধ্যে অনেক ফিলিং স্টেশন বন্ধ হয়ে গেছে। এরই মধ্যে কিছু অসাধু চক্র তেল মজুত করার চেষ্টা করছে অতিরিক্ত মূল্যে তেল বিক্রির উদ্দেশ্যে। তেলের এই ব্যাপক চাহিদার ফলে ঈদে বাড়ি ফেরা নিয়ে তৈরি হয়েছে শঙ্কা। জনসাধারণ আশঙ্কা করছে ঈদের ছুটি ঘিরে তেলের সংকট দেখিয়ে বাস মালিকরা অতিরিক্ত ভাড়া দাবি করতে পারে। যা এদেশের স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য ভীতির। সাধারণ মানুষের হাহাকার যখন সর্বত্র, তেল নিয়ে তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা। এর আগ থেকেই দেশে এলপিজি গ্যাসের সংকট তৈরি হয়েছে। এলপিজি গ্যাসের সংকটের ফলে এরইমধ্যে কয়েকটি সারকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এলপিজি সিলিন্ডারের অভাবে বাসাবাড়িতে রান্নায় তৈরি হচ্ছে অনিশ্চয়তা। গ্যাসের অভাব বিদ্যুৎ সংকটেরও চিন্তা বাড়িয়েছে।
এতো বিপর্যয়ের মধ্যেও স্বস্তি খুঁজতে ঈদকে ঘিরে জমে উঠেছে ঈদের কেনাকাটা। সবাই ঈদকে ঘিরে কেনাকাটা করছে নতুন পোশাক। কিন্তু এখানেও সাধারণ মানুষ অবহেলিত। পোশাকের অতিরিক্ত মূল্যের ফলে ঈদের কেনাকাটা সাধারণ মানুষের সাধ্যের বাইরে চলে যাচ্ছে। এই রমজান আর ঈদ যেন ধনী আর প্রভাবশালী মানুষেরই। প্রভাবশালীরা যুদ্ধ ঘোষণা করছে কিন্তু প্রাণ যাচ্ছে সৈনিক ও সাধারণ মানুষের। ব্যবসায়ীরা অতিরিক্ত মুনাফার জন্য মূল্য বৃদ্ধি করছে, সাধারণ মানুষের এখন পণ্য দেখে ফিরে আসা ছাড়া কোনো উপায় নেই। প্রভাবশালীরা আরও প্রভাবশালী হচ্ছে, ধনীরা আরও ধনী হচ্ছে। আর যাঁতাকলে পৃষ্ঠ হচ্ছে সাধারণ মানুষ। রমজানে মাসে যেখানে ইবাদত বন্দেগিতে কাটানোর কথা সেখানে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষ সমস্যায় জর্জড়িত।
রমজান ও ঈদ সকলের জন্য অত্যন্ত আনন্দের। ভালো থাকার অধিকার সকলের রয়েছে। এ পৃথিবী সবার। জনসাধারণের জন্য বিশ্বে ও দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। যুদ্ধ, হানাহানি, হত্যা, ধর্ষণ, মূল্যবৃদ্ধি রোধ করতে হবে। সকলের সহযোগিতায় একটি সুন্দর পৃথিবী গড়ে উঠুক ।
সাফিয়া ইসলাম দিশা
শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
