বাড়ছে ই-বর্জ্য, বাড়ছে ঝুঁকি
মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর ইসলাম
প্রকাশ : ০১ এপ্রিল ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
প্রযুক্তির দ্রুতগতির এই যুগে আমরা এগোচ্ছি সামনে; কিন্তু পেছনে ফেলে যাচ্ছি বিষাক্ত ইলেকট্রনিক আবর্জনার স্তূপ। সময়ের সঙ্গে আমাদের চাহিদা মিটাতে স্মার্টফোন, ল্যাপটপ, টেলিভিশন, ফ্রিজ, এয়ারকন্ডিশনার, রাউটার, প্রিন্টার- এমন অসংখ্য ইলেকট্রনিক পণ্যের ব্যবহার দ্রুত বেড়েছে। অনলাইন শিক্ষা, ফ্রিল্যান্সিং, মোবাইল ব্যাংকিং, ই-কমার্স- সবকিছুই আজ প্রযুক্তিনির্ভর। প্রযুক্তির এই দ্রুত বিস্তারের আড়ালে জমছে এক নীরব সংকট- ই-বর্জ্য বা ইলেকট্রনিক বর্জ্য। ব্যবহার শেষে অচল, পুরোনো বা ভাঙা ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশই ই-বর্জ্য। সঠিক ব্যবস্থাপনা না থাকায় এই বর্জ্য পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য ভয়াবহ ঝুঁকি তৈরি করছে। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে প্রযুক্তি ব্যবহারের বিস্তার ও দ্রুত ডিভাইস পরিবর্তনের প্রবণতা ই-বর্জ্য সমস্যাকে জটিল করে তুলেছে।
বিশ্বব্যাপী ই-বর্জ্যরে পরিমাণ প্রতি বছর লাগামহীন ঘোড়ার মতো বেড়েই চলেছে। শিল্পায়ন, স্বল্পস্থায়ী ডিভাইস নকশা এবং নতুন মডেলের প্রতি ভোক্তাদের আকর্ষণ, মেরামতের উচ্চ খরচের কারণে মানুষ দ্রুত ডিভাইস বদলাতে বাধ্য হচ্ছেন। বিধায় ডিভাইসের জীবনচক্র ছোট হয়ে যাচ্ছে। নতুন মডেল বাজারে এলেই পুরোনো ডিভাইস অচল হয়ে পড়ছে। ব্যবহৃত মোবাইল, কম্পিউটার, ফ্রিজ, এসি দ্রুতই বর্জ্যে পরিণত হচ্ছে।
এসব পণ্যে সোনা, রুপা, তামা, নিকেল, লিথিয়াম ও প্যালাডিয়ামসহ মূল্যবান ধাতু রয়েছে। পাশাপাশি সীসা, পারদ, ক্যাডমিয়াম, ক্রোমিয়াম, ব্রোমিনেটেড ফ্লেম রিটার্ডেন্টের মতো বিষাক্ত রাসায়নিক উপাদানও থাকে। সঠিকভাবে পুনর্ব্যবহার না হওয়ায় একদিকে মূল্যবান সম্পদের অপচয়। অন্যদিকে পরিবেশ ও স্বাস্থ্যের মারাত্মক ক্ষতিসাধন করছে। দেশব্যাপী স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। শহর-গ্রাম সর্বত্র ডিজিটাল ডিভাইসের বিস্তার ঘটেছে। কিন্তু ই-বর্জ্য সংগ্রহ, পৃথকীকরণ, রিসাইক্লিং ও নিরাপদ নিষ্পত্তির জন্য সমন্বিত অবকাঠামো এখনও সীমিত। অধিকাংশ ই-বর্জ্য অনানুষ্ঠানিক খাতে স্ক্র্যাপ ডিলার ও ছোট ওয়ার্কশপে ভাঙা-চোরা করে মূল্যবান অংশ আলাদা করা হয়।
এই প্রক্রিয়ায় অ্যাসিড ব্যবহার, খোলা জায়গায় পোড়ানো, অরক্ষিত হাতে তার ছেড়ে তামা বের করে। এসবের মাধ্যমে শ্রমিকরা সরাসরি বিষাক্ত ধোঁয়া ও রাসায়নিকের সংস্পর্শে আসে। শ্রমিকরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই গ্লাভস, মাস্ক বা সুরক্ষা পোশাক ছাড়াই কাজ করে থাকেন।
শিশু ও কিশোর শ্রমের উপস্থিতি পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলছে। এতে শ্রমিকদের স্বাস্থ্য ঝুঁকি যেমন বাড়ছে, তেমনি আশপাশের পরিবেশও মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে। ই-বর্জ্যরে বিষাক্ত উপাদান মানবদেহে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি করে। সীসা স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতি এবং শিশুদের মেধা বিকাশে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। পারদের মতো ধাতুর সংস্পর্শে থাকলে মস্তিষ্ক ও কিডনির ক্ষতি হওয়া স্বাভাবিক। ক্যাডমিয়াম কিডনি বিকলতা ও হাড় ক্ষয়ের জন্য দ্বায়ী। ব্রোমিনেটেড যৌগ পোড়ালে ডাইঅক্সিন-ফিউরানের মতো বিষাক্ত গ্যাস তৈরি হয়, যা ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়। খোলা জায়গায় তার পোড়ানোর সময় কালো ধোঁয়া তৈরি হয়। যা স্থানীয় বাসিন্দাদের শ্বাসকষ্ট, ত্বক রোগ ও দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।
বিশেষ করে শিশু ও গর্ভবতী নারীরা বেশি ঝুঁকিতে থাকে। ই-বর্জ্য খোলা জায়গায় ফেলে রাখলে বৃষ্টির পানিতে বিষাক্ত ধাতু মিশে মাটিতে ও ভূগর্ভস্থ পানিতে ছড়িয়ে পড়ে। এতে কৃষিজমির উর্বরতা কমে যায়। নদী বা জলাশয়ের কাছে বর্জ্য জমা হলে মাছ ও জলজ প্রাণীর ক্ষতি হয়। প্লাস্টিক পোড়ালে বায়ুতে বিষাক্ত গ্যাস ছড়ায়, যা জলবায়ু পরিবর্তন ও স্থানীয় বায়ুদূষণকে ত্বরান্বিত করে। ফলে স্থানীয় ইকোসিস্টেমের ভারসাম্য নষ্ট হয়। দীর্ঘমেয়াদে খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে এসব বিষাক্ত উপাদান মানুষের শরীরে ফিরে আসে। যা একটি নীরব জনস্বাস্থ্য সংকট তৈরি করে। সঠিক প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনায় ই-বর্জ্য হতে পারে অর্থনৈতিক সম্পদ। এক টন মোবাইল ফোন বা সার্কিট বোর্ড থেকে খনি থেকে উত্তোলনের তুলনায় বেশি পরিমাণ মূল্যবান ধাতু পাওয়া যায়। যদি আধুনিক রিসাইক্লিং শিল্প গড়ে তোলা যায়। তবে দেশে কাঁচামালের জোগান বাড়বে, আমদানিনির্ভরতা কমবে, নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে এবং বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে। সার্কুলার ইকোনমি বা বৃত্তাকার অর্থনীতির ধারণা অনুসরণ করা যেতে পারে। পণ্য এমনভাবে তৈরি করতে হবে যাতে তা সহজে মেরামতযোগ্য, পুনর্ব্যবহারযোগ্য ও পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করা যায়।
এতে করে সম্পদের অপচয় কমবে। ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কার্যকর আইন, প্রয়োগ ও নজরদারি জরুরি। দেশে পরিবেশ সংরক্ষণ আইন থাকলেও ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কার্যকর প্রয়োগ ও নজরদারি এখনও দুর্বল। জরুরিভিত্তিতে উৎপাদকদের জন্য Extended Producer Responsibility চালু করা প্রয়োজন।
আমদানিকারকদের বাধ্যতামূলক সংগ্রহ ও রিসাইক্লিং লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ। লাইসেন্সপ্রাপ্ত রিসাইক্লিং প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা। আমদানিকৃত ইলেকট্রনিক পণ্যের ক্ষেত্রে পরিবেশবান্ধব নকশা ও পুনর্ব্যবহারযোগ্যতা নিশ্চিত করার মানদণ্ড প্রয়োজন। অবৈধ আমদানি ও খোলা পোড়ানো বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা। আইন প্রণয়ন যতটা জরুরি, তার চেয়ে বেশি জরুরি কার্যকর প্রয়োগ। বর্তমানে অনানুষ্ঠানিক খাত ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বড় অংশ সামলাচ্ছে। তাদের বাদ দিয়ে সমাধান সম্ভব নয়। প্রশিক্ষণ, নিরাপত্তা সরঞ্জাম, সহজ ঋণ ও নিবন্ধনের মাধ্যমে তাদের আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এতে পরিবেশ সুরক্ষা ও শ্রমিকদের স্বাস্থ্য—দুই-ই রক্ষা পাবে। ভোক্তা হিসেবে আমাদেরও কিছু দায়িত্ব আছে। যেমন অপ্রয়োজনীয় ডিভাইস কেনা কমানো, মেরামতযোগ্য পণ্য বেছে নেওয়া, পুরোনো ডিভাইস নির্দিষ্ট সংগ্রহ কেন্দ্রে জমা দেওয়া এবং রিফারবিশড বা পুনঃব্যবহৃত পণ্য ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সচেতনতা প্রচার জরুরি। কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে ই-বর্জ্য সংগ্রহ কর্মসূচি নিতে পারে। দেশব্যাপী ই-বর্জ্য সংগ্রহ কেন্দ্র স্থাপন, আলাদা ডাস্টবিন ও টেক-ব্যাক প্রোগ্রাম চালু করা জরুরি। সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভাগুলো নিয়মিত সংগ্রহ- পৃথকীকরণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারে।
আধুনিক রিসাইক্লিং প্ল্যান্টে মেকানিক্যাল শেডিং, হাইড্রোমেটালার্জি বা পাইরোমেটালার্জির মতো প্রযুক্তি ব্যবহার করে মূল্যবান ধাতু নিরাপদে পুনরুদ্ধার সম্ভব। পাশাপাশি ডেটা সুরক্ষার জন্য হার্ডড্রাইভ ধ্বংস বা ডেটা ওয়াইপিংয়ের মানসম্মত ব্যবস্থা থাকতে হবে, যাতে ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁসের ঝুঁকি না থাকে। জাতীয় পর্যায়ে ই-বর্জ্যরে সঠিক পরিসংখ্যান সংগ্রহ। প্রতিটি সিটি কর্পোরেশনে পৃথক ই-বর্জ্য সংগ্রহ কেন্দ্র স্থাপন করতে হবে। উৎপাদক-আমদানিকারকদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। কঠোর নজরদারি ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ। ই-বর্জ্য একটি আন্তঃসীমান্ত সমস্যা। উন্নত দেশ থেকে অবৈধভাবে ই-বর্জ্য উন্নয়নশীল দেশে প্রবেশের ঝুঁকি বাড়ছে। আন্তর্জাতিক কনভেনশন ও আঞ্চলিক সহযোগিতার মাধ্যমে অবৈধ আমদানি রোধ, প্রযুক্তি স্থানান্তর ও সক্ষমতা বৃদ্ধি প্রয়োজন। বৈশ্বিক মানদণ্ড অনুসরণ করলে রিসাইক্লিং খাত আন্তর্জাতিক বাজারেও প্রতিযোগিতামূলক হতে পারে।
ই-বর্জ্য আমাদের সময়ের অন্যতম বড় পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ। এটি শুধু বর্জ্য নয়—একটি নীরব মহামারি। কিন্তু সঠিক পরিকল্পনা ও উদ্যোগ নিলে এই সংকটকে সম্পদে রূপান্তর করা সম্ভব। এখনই সময় সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার। সরকার, শিল্প খাত, নাগরিক সমাজ ও ভোক্তা- সবার অংশগ্রহণে একটি নিরাপদ, টেকসই ও বৃত্তাকার অর্থনীতি গড়ে তুলতে হবে। প্রযুক্তিনির্ভর উন্নয়নের পাশাপাশি যদি দায়িত্বশীল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা যায়। তবে আমরা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ ও টেকসই দেশ গড়ে তুলতে পারব। ডিজিটাল অগ্রগতির সঙ্গে পরিবেশ সুরক্ষার সমন্বয়ই হতে পারে আগামী দিনের টেকসই উন্নয়নের চাবিকাঠি।
মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর ইসলাম
শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
