হাম ও নিউমোনিয়ার দ্বিমুখী থাবা জনস্বাস্থ্যের জন্য এক অশনিসংকেত

প্রকাশ : ০১ এপ্রিল ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বর্তমান সময়ে জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে যে কয়েকটি চ্যালেঞ্জ আমাদের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, তার মধ্যে হাম ও নিউমোনিয়ার প্রাদুর্ভাব অন্যতম। চিকিৎসা বিজ্ঞানের অভাবনীয় উন্নতি এবং টিকাদান কর্মসূচির ব্যাপক প্রসার সত্ত্বেও, এই দুটি রোগ শিশুদের জন্য এখনও প্রাণঘাতী হয়ে দেখা দিচ্ছে। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে পুষ্টিহীনতা, অসচেতনতা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে হাম ও নিউমোনিয়া এক ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। সময় এসেছে এই নিরব ঘাতকদের বিরুদ্ধে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সচেতনতা নতুন করে ঝালিয়ে নেওয়ার।

অনেকেই মনে করেন হাম শিশুদের একটি সাধারণ রোগ যা সময়ের সঙ্গে সেরে যায়। কিন্তু বাস্তবতা এর উল্টো। হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা মূলত শ্বাসতন্ত্রের মাধ্যমে ছড়ায়। এর ভয়াবহতা এখানেই যে, এটি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে সাময়িকভাবে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেয়। ফলে শিশুটি অন্যান্য জটিল রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে। হামের পরবর্তী জটিলতা হিসেবে অন্ধত্ব, মস্তিষ্কের প্রদাহ (এনসেফালাইটিস) এবং মারাত্মক ডায়রিয়া হতে পারে। তবে হামের সবচেয়ে বড় ও ভয়ংকর সঙ্গী হলো নিউমোনিয়া। পরিসংখ্যান বলছে, হামে আক্রান্ত শিশুদের মৃত্যুর একটি বড় অংশের কারণ হলো পরবর্তী ধাপে হওয়া নিউমোনিয়া।

নিউমোনিয়া মূলত ফুসফুসের একটি সংক্রমণ যা ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া বা ছত্রাকের কারণে হতে পারে। এটি শিশুদের মৃত্যুর একক বৃহত্তম কারণ হিসেবে বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত। যখন একটি শিশুর হাম হয়, তখন তার ফুসফুস দুর্বল হয়ে পড়ে এবং খুব সহজেই নিউমোনিয়ার জীবাণু সেখানে বাসা বাঁধে। শ্বাসকষ্ট, বুকের খাঁচা দেবে যাওয়া এবং দ্রুত শ্বাস নেওয়া- এগুলো নিউমোনিয়ার লক্ষণ হলেও অনেক ক্ষেত্রে অভিভাবকরা একে সাধারণ সর্দি-কাশি ভেবে ভুল করেন। এই বিলম্বিত সিদ্ধান্তই অনেক সময় শিশুর জীবনের শেষ মুহূর্ত ডেকে আনে।

কোভিড-১৯ পরবর্তী সময়ে বিশ্বের অনেক দেশেই রুটিন টিকাদান কর্মসূচিতে এক ধরনের স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। অনেক অভিভাবক গুজবে কান দিয়ে বা অবহেলা করে শিশুকে হামের টিকা (MR Vaccine) দিচ্ছেন না। ভিটামিন ‘এ’-র অভাব হামের জটিলতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের শরীর এই ভাইরাসের আক্রমণ সইতে পারে না। বায়ুদূষণ সরাসরি শিশুদের ফুসফুসকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, যা নিউমোনিয়ার ঝুঁকি বাড়ায়। শহর অঞ্চলের বস্তি বা ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় একজনের হাম হলে তা দ্রুত মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ে। এই ভয়াবহতা রোধে শুধু চিকিৎসা নয়, প্রয়োজন একটি সমন্বিত প্রতিরোধ ব্যবস্থা।

হাম প্রতিরোধের একমাত্র কার্যকর উপায় হলো টিকা। সরকারের ইপিআই (EPI) কর্মসূচির আওতায় প্রতিটি শিশুকে নির্দিষ্ট সময়ে টিকার ডোজ সম্পন্ন করতে হবে। কোনো শিশু যেন বাদ না পড়ে, সেজন্য বাড়ি বাড়ি গিয়ে তদারকি জোরদার করা প্রয়োজন। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, ধর্মীয় নেতা এবং শিক্ষকদের মাধ্যমে সচেতনতামূলক প্রচারণা চালাতে হবে। হাম হলে শিশুকে বিচ্ছিন্ন রাখা, প্রচুর পরিমাণে তরল খাবার দেওয়া এবং ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানোর গুরুত্ব সাধারণ মানুষকে বোঝাতে হবে। নিউমোনিয়ার লক্ষণ দেখা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যেন গ্রাম পর্যায়ের মানুষও দ্রুত অক্সিজেন সাপোর্ট ও অ্যান্টিবায়োটিক চিকিৎসা পায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে পর্যাপ্ত নেবুলাইজার ও অক্সিজেন সিলিন্ডারের ব্যবস্থা থাকা জরুরি। জন্মের পর প্রথম ছয় মাস শিশুকে শুধু বুকের দুধ খাওয়ানো নিউমোনিয়া প্রতিরোধে শক্তিশালী ঢাল হিসেবে কাজ করে। এছাড়া ছয় মাস পর থেকে সুষম খাবার নিশ্চিত করলে শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে।

হাম ও নিউমোনিয়া কোনোটিই অপরাজেয় নয়। সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ নিলে এই দুটি রোগ থেকেই শিশুদের রক্ষা করা সম্ভব। আমাদের মনে রাখতে হবে, আজকের শিশুরাই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। তাদের একটি সুস্থ ও নিরাপদ শৈশব উপহার দেওয়া আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থা, গণমাধ্যম এবং সর্বস্তরের জনগণকে এই লড়াইয়ে শামিল হতে হবে। টিকাদান কেন্দ্রগুলোতে ভিড় বাড়ানো আর সচেতনতার আলো ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যমেই আমরা হাম ও নিউমোনিয়ামুক্ত একটি সুন্দর সমাজ গড়তে পারি। অবহেলা নয়, সচেতনতাই হোক আমাদের প্রধান হাতিয়ার।