অনলাইন ক্লাসের সিদ্ধান্ত যেন সীমাবদ্ধতার বাস্তবতা
নায়িমা আখতার
প্রকাশ : ০২ এপ্রিল ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশ বর্তমানে জ্বালানি সংকটের এক জটিল বাস্তবতার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। বৈশ্বিক বাজারে তেলের মূল্যবৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট এবং অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা মিলিয়ে দেশের জ্বালানি খাত এক অনিশ্চিত অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে। এই সংকট মোকাবিলায় সরকার বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, যার মধ্যে অন্যতম হলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সপ্তাহে তিন দিন অনলাইন এবং তিন দিন অফলাইন ক্লাস চালু করা। তবে এখানে প্রশ্ন থেকে যায় সরকারের এই সিদ্ধান্ত সংকট মোকাবিলায় ঠিক কতটা কার্যকর। এই সিদ্ধান্তের ফলে শিক্ষার্থীদের যে ক্ষতি হবে সেটা কি অবহেলা যোগ্য? প্রতিটি সংকটে কেন শিক্ষার্থীরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়?
প্রথমত, অনলাইন শিক্ষাব্যবস্থা বাংলাদেশে এখনও পরিপূর্ণভাবে কার্যকর বা সমতাভিত্তিক নয়। শহরের কিছু উন্নত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং উচ্চবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীরা হয়তো অনলাইন ক্লাসের সুবিধা নিতে পারে, কিন্তু দেশের বিশাল অংশের শিক্ষার্থী এখনও ইন্টারনেট সুবিধা, স্মার্ট ডিভাইস এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ থেকে বঞ্চিত। গ্রামাঞ্চলে নেটওয়ার্ক সমস্যা, বিদ্যুৎ বিভ্রাট এবং প্রযুক্তিগত অজ্ঞতা এসব মিলিয়ে অনলাইন ক্লাস একটি অকার্যকর পদ্ধতি। ফলে এই সিদ্ধান্ত শিক্ষাক্ষেত্রে বৈষম্য আরও বাড়িয়ে দেয়। একজন শহুরে শিক্ষার্থী যেখানে অনলাইন ক্লাসে অংশ নিতে পারছে, সেখানে একজন গ্রামের শিক্ষার্থী সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এতে করে শিক্ষার্থীদের মধ্যে এক ধরনের অদৃশ্য বিভাজন তৈরি হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক বৈষম্যকেও প্রভাবিত করবে।
দ্বিতীয়ত, অনলাইন ক্লাসের মান নিয়ে বড় প্রশ্ন রয়েছে। অনলাইন ক্লাসে দেখা যায় বেশিরভাগ শিক্ষার্থী ক্লাস ওপেন করে অন্যান্য কাজ করছে। সরাসরি ক্লাসের যে মনোযোগ সেই মনোযোগ অনলাইন ক্লাসে নিয়ে আসা কখনোই সম্ভব নয়। কোভিড-১৯ মহামারির সময় আমরা দেখেছি, অধিকাংশ অনলাইন ক্লাসই ছিল একমুখী। শিক্ষক কথা বলছেন, শিক্ষার্থীরা শুনছে বা অনেক সময় শুনছেও না। শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ, মনোযোগ এবং মূল্যায়ন প্রক্রিয়া সবই ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। এই বাস্তবতা থাকা সত্ত্বেও আবার সেই একই পদ্ধতিতে ফিরে যাওয়া কতটা যৌক্তিক?
তৃতীয়ত, শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। বারবার শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তন, অনিশ্চয়তা এবং চাপ তাদের মধ্যে হতাশা, উদ্বেগ এবং অনুপ্রেরণার অভাব সৃষ্টি করছে। একজন শিক্ষার্থী যখন বুঝতে পারে যে তার পড়াশোনা নিয়মিতভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে, তখন তার মধ্যে ভবিষ্যৎ নিয়ে এক ধরনের অনিশ্চয়তা জন্ম নেয়। এই অনিশ্চয়তা ধীরে ধীরে তাকে পড়াশোনা থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। বিশেষ করে ছোট বাচ্চাদের ক্ষেত্রে অনলাইন ক্লাস প্রায় সম্পূর্ণ অকার্যকর। প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের শিক্ষা মূলত হাতে-কলমে শেখানোর ওপর নির্ভরশীল যেখানে শিক্ষক সরাসরি দেখিয়ে দেন, বোঝান এবং শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেন। যেমন লেখা শেখা, আঁকা, বা গণনার প্রাথমিক ধারণা, এসব কিছুই সরাসরি তত্ত্বাবধান ছাড়া কার্যকরভাবে শেখানো সম্ভব নয়। একটি ছোট শিশুকে দীর্ঘ সময় স্ক্রিনের সামনে বসিয়ে রাখা সহজ নয়।
তাছাড়া, এই ধরনের সিদ্ধান্ত শিক্ষার্থীদের আর্থিক চাপও বাড়ায়। অনলাইন ক্লাস করার জন্য অতিরিক্ত ইন্টারনেট খরচ, ডিভাইস কেনা বা মেরামত করা এসবই অনেক পরিবারের জন্য একটি বড় বোঝা। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীরা এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই সিদ্ধান্তের পেছনে পরিকল্পনার ঘাটতি স্পষ্ট। কোনো দীর্ঘমেয়াদি রোডম্যাপ ছাড়াই হঠাৎ করে এমন একটি সিদ্ধান্ত শিক্ষার্থীদের উপর চাপিয়ে দেওয়া কতটা যুক্তিযুক্ত?
আজকের শিক্ষার্থীরাই আগামী দিনের নাগরিক, নেতৃত্ব এবং রাষ্ট্রের চালিকাশক্তি। তাদের শিক্ষা, মানসিক স্বাস্থ্য এবং দক্ষতা যদি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে তার প্রভাব পুরো জাতির ওপর পড়বে। বারবার নীতির পরিবর্তন শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করে। তাই যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিবেচনা করা উচিত। শিক্ষা একটি জাতির ভিত্তি। সেই ভিত্তিকে দুর্বল করে কোনো সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। সুতরাং শিক্ষা খাত নয় সংকট মোকাবিলায় অন্যান্য খাত থেকে জ্বালানির খরচ কমিয়ে নিয়ে আসা উচিত।
নায়িমা আখতার
আইন বিভাগ, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
