শিশু ছামিয়ার কান্না : আঁচল নেই, আছে শুধু কবরের মাটি
ড. মো. আনোয়ার হোসেন
প্রকাশ : ০৩ এপ্রিল ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে জননী শব্দটির সমার্থক হলো নিঃস্বার্থ ভালোবাসা। কুমিল্লার লালমাই উপজেলায় ১২ বছর বয়সি ছামিয়া আক্তারের করুণ আর্তনাদ আমাদের সভ্যসমাজের খোলসটা আবারও উন্মোচিত করে দিয়েছে। যখন একটি শিশু তার আপন জন্মদাত্রীকে হারিয়ে সৎ মায়ের নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়, তখন তার কাছে পৃথিবীর বিশাল আকাশটাও সংকীর্ণ হয়ে আসে। কবরের মাটি আঁকড়ে ধরে তার সেই আকুতি- ‘আমারে কেন আপনার সঙ্গে নিয়ে গেলেন না’ এটি শুধু একটি শিশুর কান্না নয়, বরং মানবিকতার চরম পরাজয়ের এক আর্তচিৎকার। ছামিয়ার এই হাহাকার প্রমাণ করে যে, স্নেহের আঁচল যখন ছিঁড়ে যায়, তখন শীতল মাটিই হয় অবুঝ শৈশবের একমাত্র সান্ত¡না।
মনস্তাত্ত্বিক বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে, একটি শিশুর বিকাশের জন্য মাতৃস্নেহ হলো প্রধান অনুঘটক। আলবার্ট আইনস্টাইন বলেছিলেন, ‘জগতে মা-ই একমাত্র ব্যক্তি যিনি নিজেকে বিলিয়ে দিয়ে অন্যকে পূর্ণতা দেন।’ ছামিয়ার ক্ষেত্রে আমরা দেখি ‘ম্যাটারনাল ডেপ্রাইভেশন’ বা মাতৃকুলের সংস্পর্শহীনতার এক চরম পর্যায়। চিকিৎসা বিজ্ঞান বলে, দীর্ঘস্থায়ী শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন শিশুর মস্তিষ্কের ‘হিপোক্যাম্পাস’ অংশকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, যা তার আবেগ ও স্মৃতিশক্তিকে বিপর্যস্ত করে দেয়।
সমাজবিজ্ঞানের প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আমাদের পারিবারিক কাঠামোতে ‘সৎ মা’ শব্দটিকে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নেতিবাচক ছাঁচে বন্দি করে রাখা হয়েছে। যদিও সকল সৎ মা নিষ্ঠুর নন, তবুও আয়েশা আক্তারের মতো ব্যক্তিদের আচরণ সমাজ-মানসে সেই প্রাচীন কুসংস্কারকেই পুষ্ট করে। সমাজবিজ্ঞানী আগস্ট কোঁতের মতে, পরিবার হলো সমাজের আদি একক, যেখানে সহমর্মিতা থাকবে মূলভিত্তি। কিন্তু যখন কোনো পরিবারে ক্ষমতার অসম বণ্টন ঘটে এবং অসহায় শিশুটি অনিরাপদ হয়ে পড়ে, তখন সেই সমাজ কাঠামোর নৈতিক পতন ঘটে।
জীববিজ্ঞান ও ডিএনএ বিজ্ঞানের তত্ত্বে মাতৃত্বের এক অনন্য রসায়ন বিদ্যমান। মায়ের শরীরের প্রতিটি কোষে যে মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএ থাকে, তা শুধু সন্তানের শরীরেই সঞ্চালিত হয়। এই জেনেটিক বন্ধনই জন্ম দেয় এক অবিচ্ছেদ্য মমত্ববোধের। রসায়ন বিজ্ঞানের ভাষায় বলতে গেলে, মা ও সন্তানের সম্পর্কের মাঝে ‘অক্সিটোসিন’ নামক হরমোনের যে নিঃসরণ ঘটে, তা কোনো কৃত্রিম বন্ধনে পাওয়া সম্ভব নয়। ছামিয়ার সৎ মা আয়েশা আক্তারের হৃদয়ে সেই মমতার রসায়ন ছিল অনুপস্থিত, যার ফলে তিনি হয়তো একটি ১২ বছরের শিশুর কান্নায় বিচলিত না হয়ে বরং পৈশাচিকতায় মেতে উঠেছিলেন।
ধর্মীয় বিজ্ঞানের আলোকে বিচার করলে দেখা যায়, প্রতিটি ধর্মই এতিম ও অসহায় শিশুর প্রতি সদয় হওয়ার কঠোর নির্দেশ দিয়েছে। ইসলাম ধর্মে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আমি এবং এতিম পালনকারী জান্নাতে এভাবে থাকব,’ বলে তিনি দুই আঙুল একত্রিত করে দেখিয়েছেন। অথচ ধর্মের এই সুমহান আদর্শকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ছামিয়ার ওপর চালানো হয়েছে স্টিম রোলার। নৈতিকতা বা এথিক্সের মানদণ্ডে বিচার করলে, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের দ্বারা অবুঝ শিশুর ওপর অত্যাচার হলো পৃথিবীর নিকৃষ্টতম অপরাধ। ছামিয়ার বাবা নিজের সন্তানের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে যে উদাসীনতা দেখিয়েছেন, তা নৈতিক বিচারে চরম বিশ্বাসঘাতকতা।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে, প্রতিটি শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। বাংলাদেশের সংবিধান ও শিশু আইন অনুযায়ী, ছামিয়ার ওপর ঘটা এই নির্যাতন সরাসরি মানবাধিকারের লঙ্ঘন। রাষ্ট্র যখন তার নাগরিকদের, বিশেষ করে শিশুদের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়, তখন নাগরিক সমাজ প্রশ্নবিদ্ধ হয়। আইন ও বিচারব্যবস্থার কঠোর প্রয়োগ না থাকায় আয়েশা আক্তারের মতো মানুষরা আস্কারা পায়। অপরাধ বিজ্ঞানের ভাষায়, ঘরোয়া সহিংসতা যখন শৈশবকে গ্রাস করে, তখন সেই শিশুটি রাষ্ট্রের এক বিষণ্ণ সম্পদে পরিণত হয়।
অর্থনীতি বিজ্ঞানের একটি শাখা ‘হিউম্যান ক্যাপিটাল’ বা মানবসম্পদ উন্নয়ন নিয়ে কথা বলে। আজকের শিশুরাই আগামী দিনের অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি। কিন্তু নির্যাতনের শিকার হয়ে ছামিয়ার মতো শিশুরা যখন মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে, তখন দীর্ঘমেয়াদে দেশ এক দক্ষ ও সুস্থ নাগরিক হারায়। দারিদ্র?্য বা পারিবারিক কলহ যখন শিশুর পথ রুদ্ধ করে দেয়, তখন তা সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য এক বিরাট ক্ষতি।
মানববিজ্ঞানের ছাত্ররা জানেন যে, মানুষ পরিবেশের দাস। কিন্তু ছামিয়া যে পরিবেশে বড় হ”িছল, তা ছিল বিষাক্ত। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায়, ‘বনের পাখি বনে সুন্দর, কিন্তু খাঁচার পাখি তার গান হারায়।’ ছামিয়া ছিল সেই খাঁচার পাখি, যার ডানা ভেঙে দেওয়া হয়েছিল আঘাতে। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, বহু মনীষী সৎ মায়ের কাছে বড় হয়েও সফল হয়েছেন, কিন্তু তারা পেয়েছেন স্নেহের পরশ। কিসবতু যখন স্নেহ বদলে যায় জিঘাংসায়, তখন ইতিহাসও লজ্জিত হয়।
সাধারণ বিজ্ঞানের নিয়মে ক্রিয়ার সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া থাকে। কিন্তু ছামিয়ার ক্ষেত্রে তার বিনয় ও নিরবতার বিপরীতে এসেছে নিষ্ঠুরতা। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ‘পিটিএসডি’ বা পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার এখন ছামিয়ার নিত্যসঙ্গী। ঘুমের ঘোরে চমকে ওঠা কিংবা একা একা বিড়বিড় করে মায়ের সঙ্গে কথা বলা- এগুলো গভীর মানসিক ক্ষতের লক্ষণ। ডিএনএ বিজ্ঞানের জটিল সমীকরণে যে রক্ত ছামিয়ার ধমনীতে বইছে, সেই একই রক্ত হয়তো তার বাবারও, অথচ রক্তের সেই টান ছামিয়াকে রক্ষা করতে পারেনি সৎ মায়ের হাত থেকে।
শিক্ষা ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য হলো সহমর্মিতা শেখানো। আয়েশা আক্তারের মতো মানুষেরা শিক্ষিত হলেও সুশিক্ষিত নন। কারণ সুশিক্ষা মানুষকে অন্যের বেদনা অনুভব করতে শেখায়। ছামিয়ার স্কুলের সহপাঠীরা যখন খেলার মাঠে দৌড়ায়, ছামিয়া তখন ঘরের কোণে শিকলে বাঁধা পড়ে থাকে- এটি আমাদের আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার মুখে এক চপেটাঘাত।
মনীষী লুসি ওলাকোট বলেছিলেন, ‘ঘর হলো হৃদয়ের আবাস।’ কিন্তু ছামিয়ার জন্য সেই ঘর ছিল এক জীবন্ত নরক। মায়ের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে তার কথাগুলো শুনলে পাথরও গলে যায়। সে জানে, এই পৃথিবীতে তার আপন বলতে কেউ নেই, শুধু ওই সাড়ে তিন হাত মাটির নিচের মানুষটি ছাড়া।
মাটির শীতলতা হয়তো তার সৎ মায়ের নির্যাতনের জ্বালা কিছুটা কমিয়ে দেয়। কিশোরী ছামিয়ার এই আর্তনাদ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর জনমনে যে সহানুভূতি তৈরি হয়েছে, তা যদি শুধু লাইক আর কমেন্টেই সীমাবদ্ধ থাকে, তবে ছামিয়ারা কোনোদিন মুক্তি পাবে না। সমাজ বিজ্ঞানের ভাষায়, একে বলা হয় ‘কালেক্টিভ এম্প্যাথি’ বা সমষ্টিগত সহানুভূতি। এই সহানুভূতিকে যখন আমরা প্রতিবাদে রূপান্তর করতে পারব। ছামিয়ার বাবাও এই অপরাধের দায় এড়াতে পারেন না, কারণ অভিভাবক হিসেবে শিশুর সুরক্ষা প্রদান ছিল তার প্রাথমিক দায়িত্ব।
এথিক্স বা নীতিবিদ্যার পাঠ্যবইয়ে আমরা দয়া, ক্ষমা ও মহত্ত্বের কথা পড়ি। কিন্তু বাস্তবে ছামিয়া যা দেখেছে, তা হলো ঘৃণা ও জিঘাংসা। তার সৎ মা যদি তাকে নিজের সন্তানের মতো বুকে টেনে নিতেন, তবে আজ ছামিয়া তার জন্য প্রাণ দিতেও দ্বিধা করত না। কৃতজ্ঞতা একটি অনন্য মানবিক গুণ, কিন্তু তা অর্জনের জন্য পরিবেশ প্রয়োজন। ছামিয়াকে সেই সুযোগ না দিয়ে বরং তাকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে অন্ধকারের অতলে। কবরের মাটিই এখন তার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ বিছানা।
মহাকবি কায়কোবাদ লিখেছিলেন, ‘মা জননী চোখের মণি, হারায় যদি রতন খনি।’ ছামিয়া তার জীবনের শ্রেষ্ঠ রতন হারিয়ে আজ অসহায়। তার এই আর্তনাদ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মাতৃস্নেহহীন পৃথিবীটা কত রুক্ষ হতে পারে। বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, মায়ের কণ্ঠস্বর শিশুর স্নায়বিক উত্তেজনা প্রশমন করে। ছামিয়া যখন কবরের পাশে গিয়ে ‘মা’ বলে ডাকছে, সে আসলে সেই হৃত প্রশান্তিটুকু খুঁজছে যা সে বাস্তবে কোথাও খুঁজে পায়নি।
আমরা দেখেছি কীভাবে একটি নিষ্পাপ শিশু সমাজের নিষ্ঠুরতার বলি হয়। ছামিয়ার আর্তনাদ যেন প্রতিধ্বনিত হয় প্রতিটি সংবেদনশীল হৃদয়ে। আসুন, আমরা শপথ নিই, কোনো শিশুর শৈশব যেন এভাবে নষ্ট না হয়। সৎ মায়ের নিষ্ঠুরতা নয়, বরং মানবতার জয়গান গাওয়াই হোক আমাদের লক্ষ্য। ছামিয়ার কান্না যেন বিফলে না যায়, বরং তা যেন হয়ে ওঠে পরিবর্তনের এক শক্তিশালী হাতিয়ার। যে সমাজে শিশু নিরাপদ নয়, সে সমাজ কখনো সভ্য হতে পারে না।
শৈশবের এই ক্ষত মুছে ফেলা সহজ নয়, তবে ভালোবাসা আর সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে ছামিয়াকে আবারও সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে আনা সম্ভব। সমাজকে এগিয়ে আসতে হবে এই এতিম মেয়েটির পাশে দাঁড়াতে। তার চোখের জল মুছে দিয়ে তাকে দিতে হবে সুন্দর আগামীর প্রতিশ্রুতি। ছামিয়া যেন আর কখনো না বলে- ‘আমারে কেন নিয়ে গেলেন না’। বরং সে যেন মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে বলতে পারে, ‘মা, আমি ভালো আছি’। মানবতার এই জয়গানই হোক আমাদের আজকের দিনের মূল প্রতিপাদ্য।
পরিশেষে বলা যায়, ছামিয়ার এই ঘটনা কেবল কুমিল্লার লালমাই উপজেলার একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রকাঠামোর গভীর ক্ষতের প্রতিচ্ছবি।
মানবিকতা, বিজ্ঞান, ধর্ম এবং এথিক্স- সব কিছুর ঊর্ধ্বে ছামিয়া একটি জীবন্ত মানুষ, যার একটি সুন্দর শৈশব পাওয়ার অধিকার ছিল। কবরের মাটি নয়, ছামিয়ার প্রয়োজন ছিল মমতাময় এক জোড়া হাত এবং নিরাপত্তার আশ্বাস। আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা ও আইনের কঠোর শাসনই পারে ভবিষ্যতে আর কোনো ছামিয়াকে এভাবে কবরের মাটি আঁকড়ে কাঁদতে না দেখার নিশ্চয়তা দিতে।
ড. মো. আনোয়ার হোসেন
প্রাবন্ধিক, কথা সাহিত্যিক ও প্রেসিডেন্ট আন্তর্জাতিক মাদকবিরোধী সংগঠন ফ্রিডম ইন্টারন্যাশনাল এন্টি অ্যালকোহল
