জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় অনলাইন ক্লাস নয়, চাই পরিবেশবান্ধব সমাধান
নুসরাত সুলতানা
প্রকাশ : ০৪ এপ্রিল ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
ইরান ও ইসরায়েলের যুদ্ধ ও মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতাকে কেন্দ্র করে বিশ্বজুড়ে তেলের সংকট দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশ যাদের আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থা তাদের জ্বালানি সংকটে পড়তে হচ্ছে। এমন সংকটাপন্ন পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সাপ্তাহে ৩ দিন অনলাইন ক্লাস নেওয়ার সিদ্ধান্তে উপনীত হয়। কিন্তু অনলাইন ক্লাস প্রকৃতপক্ষে জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় স্থায়ী সমাধান নয়।
অনলাইন ক্লাস অনুষ্ঠিত হলে পরিবহনে চাপ কমবে, স্কুল-কলেজগুলোয় বৈদ্যুতিক ব্যবহার হ্রাস পাওয়াসহ বেশ কিছু দিক বিবেচনায় জ্বালানি সাশ্রয় হবে। তবে বিগত বছরের অভিজ্ঞতা থেকে বলা যায়, বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার প্রেক্ষিতে অনলাইন ক্লাস খুব বেশি উপকারী নয়। করোনাকালীন সময়ে অনলাইনে ক্লাস চালু হলে আমাদের কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা আরও স্পষ্ট হয়। কারণ অনলাইন ক্লাসের জন্য দেশের সকল প্রান্তে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সংযোগ ও দ্রুতগতির নেটওয়ার্ক সুবিধা নিশ্চিত করা সম্ভব হয় নি। শহরাঞ্চলের শিশুরা অনলাইন ক্লাসের জন্য ডিভাইস, নেটওয়ার্ক সুবিধা পেলেও দেশের প্রান্তিক অঞ্চলের অধিকাংশ শিশুরা এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়। আবার প্রান্তিক অঞ্চলের অভিভাবকদের মধ্যে অনলাইন ক্লাস নিয়ে পর্যাপ্ত ধারণা না থাকায় তারা সন্তানদের শিক্ষাঙ্গন থেকে বিচ্ছিন্ন করে কর্মক্ষেত্রে যুক্ত করে কিংবা মেয়ে হলে বিয়ে দিয়ে দেওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধি পায়।
অন্যদিকে, শুধু ডিভাইস কিংবা নেটওয়ার্কের অসুবিধা নয়, অনলাইন ক্লাসে দেখা যায় ছেলেমেয়েরা পড়াশোনা কিংবা ক্লাস করার বদলে ফোনে আসক্ত হয়ে পড়ে। এতে শিক্ষার্থীদের মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের অবনতি হয়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাব মতে, করোনাকালীন সময়ে অনলাইনে ক্লাস নেওয়া হলে আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়ে যায় ৪৪.৩৬ শতাংশ। আত্মহত্যাকারীর মধ্যে ৫-১৯ বছর বয়সী ৩৯ শতাংশ এবং ২০-৩৫ বছর বয়সি রয়েছে ৪৯ শতাংশ, অর্থাৎ আত্মহত্যাকরী অধিকাংশ তরুণ।
অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে অনলাইন ক্লাসের সঙ্গে আত্নহত্যার প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়ার সম্পর্ক কী? প্রকৃপক্ষে, যখন সামাজিকভাবে একে অপরের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখে, মেলামেশা করে তখন মানসিক স্বস্তি লাভ করে যেটা অনলাইন দুনিয়ায় পাওয়া যায় না। বরং অনলাইন ভিত্তিক যোগাযোগব্যবস্থা আমাদের মানসিক চাপ ও দুঃশ্চিন্তা বৃদ্ধি করে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সহপাঠী কিংবা শিক্ষকদের সাথে সরাসরি পারস্পরিক সম্পর্ক মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য কিছুটা হলেও ভালো।
অন্যদিকে, করোনায় অনলাইন ক্লাস চালু হওয়ায় কিছু শিক্ষক প্রশিক্ষিত হয়েছে; কিন্তু তা পর্যাপ্ত নয়। আবার অনেক শিক্ষক অনলাইন ক্লাসের সুযোগ নিয়ে শিক্ষার্থী পড়ানোয় ফাঁকি দেওয়ারও মনোভাব দেখা যায়। সবকিছু মিলিয়ে অনলাইন ক্লাসের অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। যদিও ঘরে বসে ক্লাস করে সময় ও শ্রম সাশ্রয় হবে তাও এটার অপকারিতা কম নয়। জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় অনলাইন ক্লাসের এত এত সীমাবদ্ধতার মাঝে আমাদের খ্ুঁজতে হবে পরিবেশবান্ধব সমাধান। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, স্কুল কলেজপড়ুয়া বেশিরভাগ শিক্ষার্থী তার বাড়ির পাশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অধ্যয়ন করে কিংবা কেউ শহরে পড়াশোনা করলেও স্কুলের পাশে বাড়িভাড়া নেওয়ার চেষ্টা করে। সেক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের জন্য সাইকেল, প্যাডেলচালিত রিকশা কিংবা প্যাডেল চালিত ভ্যানগাড়ির প্রচলন শুরু করা যেতে পারে। জ্বালানি সংকট রোধে উচ্চপর্যায় থেকে নিম্ন পর্যায় পর্যন্ত ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার পরিহার করে গণপরিবহন ব্যবহারের নির্দেশনা দেওয়া এতে জ্বালানি সাশ্রয় হবে। শপিংমলগুলোতে অপ্রয়োজনীয় আলোকসজ্জা করে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা।
নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য ও ওষুধের দোকান ছাড়া পোশাক, বিলাসবহুল দ্রব্য, রেস্টুরেন্টগুলো খোলা রাখার সময়সীমা কমিয়ে আনা। শহরের রাস্তায় বড় বড় ইলেকট্রনিক বোর্ডে বিভিন্ন পণ্যের বিজ্ঞান দেওয়া বন্ধ করতে হবে। পরিবারের সদস্য সংখ্যার উপরনির্ভর করে বিদ্যুৎ ব্যবহারের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া, আর কেউ অতিরিক্ত বিদুৎ ব্যবহার করলে জরিমানা করা। একটি পরিবারে একাধিক সদস্যের ব্যক্তিগত গাড়ি ক্রয়ের উপর বিধিনিষেধ আরোপ করা এবং কাজ অনুসারে গাড়ির জন্য মাথাপিছু তেলের পরিমাণ নির্ধারণ করে দেওয়া। অবৈধভাবে তেল মজুমদারের কঠোর শাস্তির আওতায় আনা। জ্বালানি সাশ্রয়ে প্রযুক্তির ব্যবহার করা, যেমন আমার অনেকে বৈদ্যুতিক লাইট- ফ্যান বন্ধ করতে ভুলে যাই সেক্ষেত্রে মানুষের উপস্থিতি ও অনুপস্থিতর উপর ভিত্তি করে লাইট- ফ্যান বন্ধ ও চালু হবে এমন ব্যবস্থার কথা চিন্তা করা যায়। প্রযুক্তির উন্নয়ন করে জ্বালানি সাশ্রয় করা যেহেতু আমাদের দেশের জন্য সময় সাপেক্ষ, তাই আমাদের মাঝে সচেতনতা বাড়াতে হবে। নিজ দায়িত্বে রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষায় কাজ করতে হবে, নিজে সচেতন হতে হবে অন্যকে সচেতন করতে হবে। আমাদের সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা জ্বালানি সংকট মুক্ত ও পরিবেশবান্ধব সুন্দর সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখবে।
নুসরাত সুলতানা
শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
