ঢাকার প্রাণ বুড়িগঙ্গা আজ মৃত্যুর মুখে
ফাহিমা আক্তার
প্রকাশ : ০৪ এপ্রিল ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
নদীমাতৃক দেশ বাংলাদেশ। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের অধিকাংশ বড় শহরই নদীর তীরে গড়ে উঠেছে। এসব নদীর মধ্যে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলো বুড়িগঙ্গা নদী, যা ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ জেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত। এই নদীকে বলা হয় ঢাকার ‘প্রাণ’। কারণ ইতিহাস, অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও নগরজীবনের সঙ্গে বুড়িগঙ্গার সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) অনুযায়ী, বুড়িগঙ্গা নদীর পরিচিতি নম্বর ৪৭। রাজধানী ঢাকা এই নদীর তীরে অবস্থিত এবং প্রায় ৪০০ বছর পূর্বে এই নদীর তীরেই গড়ে উঠেছিল প্রসিদ্ধ এই শহরটি। কাল পরিক্রমায় ঢাকা জনবহুল, যানজটপূর্ণ এবং দূষিত বায়ুর শহরের মর্যাদা লাভ করেছে। ঐতিহাসিক বিবরণ অনুযায়ী, বুড়িগঙ্গা ব্রহ্মপুত্র ও শীতলক্ষ্যার পানির সংমিশ্রণে সৃষ্টি হয়েছিল। তবে বর্তমানে এটি ধলেশ্বরীর একটি শাখা নদী। কথিত আছে, প্রাচীনকালে গঙ্গার একটি শাখা ধলেশ্বরীর মাধ্যমে দক্ষিণের বঙ্গোপসাগরে মিলিত হতো। ফলস্বরূপ প্রাচীন গঙ্গা প্রবাহের স্মৃতি বুকে ধারণ করে এই নদীর নামকরণ করা হয়েছে বুড়িগঙ্গা। মূলত ধলেশ্বরী থেকে বুড়িগঙ্গার উৎপত্তি হলেও, আজকের কলাতিয়ার উৎপত্তিস্থল ভরাট হওয়ায় প্রাচীন চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যায় না।
মোগলদের যুগে বুড়িগঙ্গা মাথা তুলে দাঁড়ায়। নদীটি বাংলার জীবন-জীবিকা, চলাচল, পরিবহন, কৃষ্টি-কালচার, শিল্প-সভ্যতা ও অর্থনৈতিক জীবনের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। বুড়িগঙ্গার জলে ভেসে চলত ঢাকার ঐতিহ্যবাহী মসলিন, নীল ও পাট। একসময়কার বিশাল, গভীর ও প্রাণবন্ত নদীটি ঝাঁকে ঝাঁকে রূপালি ইলিশের খেলা দেখাত, পালতোলা নৌকা ছুটে চলত। দূর-দূরান্ত থেকে বণিকরা বিশাল বিশাল জাহাজে করে ব্যবসা করতে আসত এবং এভাবেই নদীর তীরে গড়ে উঠেছিল বাণিজ্যিক প্রাণকেন্দ্র। এরই ধারাবাহিকতায় ঢাকা হয়ে ওঠে প্রাচ্যের অন্যতম ব্যবসায়িক কেন্দ্রস্থল।
কিন্তু আজ বুড়িগঙ্গা আগের মতো প্রাণবন্ত নেই। এক সময়ের স্বচ্ছ জল ও কলকল শব্দ এখন হারিয়ে গেছে। নদীর প্রাচুর্যতা কালো, দুর্গন্ধময় দূষিত পানিতে বদলে গেছে। স্বচ্ছ পানির কলকল ধারা হারিয়ে গেছে, হারিয়ে গেছে সেই জীবন্ত ঢেউয়ের ছন্দ। তার জায়গা দখল করে নিয়েছে কালো, দুর্গন্ধময়, দূষিত পানির নিথর স্তর। প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী এই নদীটি আজ নিঃশব্দ, ক্লান্ত ও মৃতপ্রায়। এই নদীতেই প্রতিদিন জলযান ও গৃহস্থালি থেকে প্রায় ২১,৬০০ ঘনমিটার কঠিন বর্জ্য ফেলা হচ্ছে।
শুধু তাই নয়; ট্যানারি, জলযান ও গৃহস্থালির বর্জ্যরে পাশাপাশি নদীর তীরজুড়ে গড়ে ওঠা ছোট-বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান থেকে নির্গত রাসায়নিক পদার্থ, রং ও বিষাক্ত দ্রব্য বুড়িগঙ্গার পানিকে করে তুলেছে জলজ প্রাণীর বসবাসের জন্য সম্পূর্ণ অনুপযোগী।
বুড়িগঙ্গার পাড় ঘিরে যেখানে হাঁটাও এখন কঠিন হয়ে পড়েছে, সেখানে কোনো প্রাণীর বেঁচে থাকা কতটা সম্ভব, প্রশ্নটা স্বাভাবিকভাবেই উঠে আসে। বিভিন্ন স্থানের পানির নমুনা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে, আর বেড়েছে বিষাক্ত পদার্থের উপস্থিতি। পানির গুণাগুণ নির্ণয়ের প্রায় সব সূচকই আজ বিপদের সংকেত দিচ্ছে।
এই বিপুল দূষণ আর ভারী ধাতুর আক্রমণের মধ্যে কোনো জলজ প্রাণীর টিকে থাকা প্রায় অসম্ভব। মাছ তো দূরের কথা, সাধারণ জলজ প্রাণীর অস্তিত্বও এখন চোখে পড়ে না।
একসময় বুড়িগঙ্গা নদীতে জাল ফেললেই জেলেদের মুখে হাসি ফুটত। নদী ছিল জীবিকার ভরসা, আশার উৎস। বর্ষা এলে সেই চিত্র আরও প্রাণবন্ত হয়ে উঠত। শিং, মাগুরসহ নানা দেশীয় মাছ ধরা পড়ত জালে। এখনও মধ্যে মধ্যে বৃষ্টির সময় কিছু মাছ পাওয়া গেলেও, সেই প্রাচুর্য এখন আর নেই। সময়ের পালাক্রমে বদলে গেছে নদীর চেহারা, আর সেই পরিবর্তন যেন এক ভয়ংকর বাস্তবতার গল্প বলে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, নদীর দুর্গন্ধ এখন অসহনীয় হয়ে উঠেছে। আগে যেখানে নদীর পাড়ে গিয়ে প্রাণভরে নিঃশ্বাস নেওয়া যেত, এখন সেখানে দাঁড়ানোই কষ্টসাধ্য। অনেকেই বলেন,‘নদীর পানি এখন কালচে, মধ্যে মধ্যে এমন গন্ধ আসে যে নাক চেপে রাখতে হয়।’
দূর-দূরান্ত থেকে আসা দর্শনার্থীরা জানান, ইতিহাস আর ঐতিহ্যের টানে তারা বুড়িগঙ্গার পাড়ে আসেন। কিন্তু নদীর বর্তমান অবস্থা দেখে অনেকেই হতাশ হন। একসময় যে নদী ঢাকার প্রাণ হিসেবে পরিচিত ছিল, সেটিকে এখন কালচে পানি, দুর্গন্ধ আর ভাসমান বর্জ্যে ভরা অবস্থায় দেখে অনেকে বিস্মিত হয়ে পড়েন।তাদের মতে, এমন একটি ঐতিহাসিক নদীর এমন ভঙ্গুর অবস্থা দেশের ভাবমূর্তির জন্যও নেতিবাচক। পর্যটকদের আকৃষ্ট করার মতো পরিবেশ এখানে নেই বললেই চলে। তাই তারা মনে করেন, দ্রুত নদী সংস্কার, দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবেশ রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি, যাতে ভবিষ্যতে আবারও বুড়িগঙ্গা হয়ে উঠতে পারে ঢাকার গর্ব ও আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু।
ফাহিমা আক্তার
শিক্ষার্থী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ
