ফের বাড়ল এলপিজির দাম সাধারণের নাভিশ্বাস
প্রকাশ : ০৪ এপ্রিল ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এই বাজারে সাধারণ মানুষের পিঠ যখন দেওয়ালে ঠেকে গেছে, ঠিক তখনই এলপি গ্যাসের (লিকুইফাইড পেট্রোলিয়াম গ্যাস) মূল্যবৃদ্ধি যেন ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) প্রতি মাসেই আন্তর্জাতিক বাজারের দোহাই দিয়ে এলপিজির দাম সমন্বয় করছে, যার চিত্র গত কয়েক মাস ধরে কেবল ঊর্ধ্বমুখী। রান্নার কাজে অপরিহার্য এই জ্বালানির লাগামহীন দাম বৃদ্ধি শুধু নিম্নবিত্ত বা মধ্যবিত্তের রান্নাঘরের হিসাব ওলটপালট করছে না, বরং সামগ্রিক জীবনযাত্রার ব্যয় এবং দেশের জ্বালানি ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাকেও নগ্নভাবে ফুটিয়ে তুলছে।
সাশ্রয়ী মূল্যে জ্বালানি পাওয়া নাগরিক অধিকারের পর্যায়ে পড়ে। কিন্তু বর্তমানে সিলিন্ডার প্রতি যে হারে দাম বাড়ছে, তাতে অনেক পরিবার বিকল্প হিসেবে ফের অস্বাস্থ্যকর এবং পরিবেশবিরোধী কাঠ-কয়লার চুলার দিকে ঝুঁকতে বাধ্য হচ্ছে। এলপিজির দাম বাড়লে তার প্রভাব কেবল সরাসরি ব্যবহারকারীর ওপর পড়ে না; বরং হোটেল-রেস্তোরাঁ থেকে শুরু করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্পের ওপরও এর বিরূপ প্রভাব পড়ে। ফলশ্রুতিতে খাবারের দাম বাড়ে, যা পরোক্ষভাবে প্রতিটি মানুষের পকেটে টান ফেলে। মধ্যবিত্তের সঞ্চয় আজ শূন্যের কোঠায়, আর নিম্নবিত্তের জন্য এই বাড়তি ব্যয় মেটানো এক প্রকার অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিইআরসি সাধারণত সৌদি আরামকোর প্রপেন ও বিউটেনের দামের ভিত্তিতে দেশে এলপিজির দাম নির্ধারণ করে। আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের দাম বাড়লে দেশে দাম বাড়বে—তর্কসাপেক্ষে এটি একটি যুক্তি হতে পারে। তবে প্রশ্ন ওঠে তখনই, যখন বিশ্ববাজারে দাম কমলেও স্থানীয় বাজারে তার প্রতিফলন দেখা যায় না কিংবা দেখা গেলেও তা হয় অত্যন্ত সামান্য। এছাড়া ডলার সংকটের কারণে এলসি খুলতে না পারা এবং আমদানিকারকদের বাড়তি প্রিমিয়াম দেওয়ার অজুহাত তো রয়েছেই। এই চক্রে পড়ে সাধারণ গ্রাহক সবসময় বলির পাঁঠা হচ্ছেন। সবচেয়ে বড় সংকট হলো বিইআরসি নির্ধারিত দাম এবং খুচরা বাজারের দামের মধ্যে বিস্তর ফারাক।
কমিশন একটি দাম ঘোষণা করে দায় সারলেও, মাঠপর্যায়ে সেই দামে গ্যাস পাওয়া প্রায় অসম্ভব। এলাকাভেদে সিলিন্ডার প্রতি ১০০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি নেওয়ার অভিযোগ নিত্যনৈমিত্তিক। ডিলার, পাইকারি বিক্রেতা এবং খুচরা পর্যায়ের এই সিন্ডিকেট ভাঙার কোনো কার্যকরী পদক্ষেপ দৃশ্যমান নয়। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অভিযান মাঝেসাঝে দেখা গেলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। নিয়ন্ত্রণ সংস্থার বেঁধে দেওয়া দাম যদি বাজারেই কার্যকর না হয়, তবে সেই দাম ঘোষণার সার্থকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
দেশের এলপিজি চাহিদার সিংহভাগই এখন বেসরকারি খাতের দখলে। সরকারি কোম্পানি ওমেরা বা এলপিজিএল-এর সরবরাহ অত্যন্ত নগণ্য। সরকারি এলপিজির দাম বেসরকারি গ্যাসের তুলনায় অনেক কম হলেও সাধারণ গ্রাহকের নাগালের বাইরে তা। সরকারি সরবরাহ ব্যবস্থা শক্তিশালী হলে বাজারে একটি ভারসাম্য বজায় থাকত এবং বেসরকারি কোম্পানিগুলো ইচ্ছেমতো দাম বাড়ানোর সুযোগ পেত না। অথচ বছরের পর বছর ধরে সরকারি প্ল্যান্টগুলোর সক্ষমতা বাড়ানোর কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। দীর্ঘমেয়াদে এলপিজির ওপর এই অতিনির্ভরশীলতা এবং আমদানিনির্ভরতা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ। আমাদের প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুত কমছে, ফলে পাইপলাইনের গ্যাস সংযোগ নতুন করে দেওয়া বন্ধ রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে এলপিজিই একমাত্র ভরসা। কিন্তু এই ভরসার জায়গাটি যদি পুরোপুরি আমদানিনির্ভর এবং সিন্ডিকেট-বান্ধব হয়, তবে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ শেষ হবে না। সরকারকে অবশ্যই এলপিজি আমদানিতে শুল্ক ছাড়ের বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করতে হবে এবং টিসিবির মাধ্যমে সাশ্রয়ী মূল্যে সিলিন্ডার সরবরাহের পরিধি বাড়াতে হবে।
একটি কল্যাণকামী রাষ্ট্রে জ্বালানির মতো মৌলিক চাহিদার দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাওয়া কোনোভাবেই কাম্য নয়। শুধু আন্তর্জাতিক বাজারের অজুহাত দিয়ে এলপিজির দাম দফায় দফায় বাড়ানো কোনো টেকসই সমাধান হতে পারে না। এলপিজির বাজার নিয়ন্ত্রণে কঠোর মনিটরিং, সিন্ডিকেট নির্মূল এবং সরকারি সরবরাহ বৃদ্ধি এখন সময়ের দাবি। অন্যথায়, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান আরও নিচে নেমে যাবে এবং জ্বালানি সংকটের এই প্রভাব দেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত তৈরি করবে। নীতিনির্ধারকদের মনে রাখতে হবে, উন্নয়ন তখনই সার্থক হয়, যখন সাধারণ মানুষের রান্নাঘরের চুলাটি নিশ্চিন্তে জ্বলে।
