মধ্যপ্রাচ্যের আগুনের লেলিহান শিখা বাংলার ভাতের হাঁড়িতে

প্রজ্ঞা দাস

প্রকাশ : ০৫ এপ্রিল ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বর্তমান একবিংশ শতাব্দীর প্রেক্ষাপটে জ্বালানি তেল শুধু একটি খনিজ সম্পদ নয়, এটি আধুনিক সভ্যতার রক্তস্রোত। কৃষি, শিল্প, বিদ্যুৎ, পরিবহন, খাদ্য সরবরাহ, চিকিৎসা, নির্মাণসহ কোনো সেক্টরই তেল ছাড়া সচল থাকা সম্ভব নয়। আর সেই তেলের যখন সংকট দেখা দেয় তখন তা আর শুধুমাত্র সংকট থাকে না, তা হয়ে ওঠে অর্থনীতির ধমনীতে রক্ত চলাচলের ব্যাঘাত। বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে সংবেদনশীল জলপথ হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে ইরান ও আমেরিকার যে ছায়াযুদ্ধ আজ সরাসরি সংঘাতে রূপ নিয়েছে, তার ফলে শুধু তেলের জাহাজ চলাচল আটকে যায়নি, আটকে গেছে বাংলাদেশের মানুষের জীবনযাত্রার স্বাভাবিক গতি।

পারস্য উপসাগরের সেই তপ্ত বালুর উত্তাপ এবং যুদ্ধের রোশানল আজ ছড়িয়ে পড়ছে বাংলার প্রতিটি সাধারণ মানুষের ভাতের হাঁড়িতে, যা শুধু সাধারণ সংকটের নামান্তর নয়, বরং এটি আসন্ন দুর্ভিক্ষের পদধ্বনি। জিরো কার্বন অ্যানালিটিক্সের (ZCA) সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ বলছে, মধ্যপ্রাচ্যের এই সংকটে বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানি ব্যয় বেড়ে যাবে ৪৮০ কোটি ডলার, যা ২০২৫ সালের তুলনায় ৪০ শতাংশ বেশি। এই অতিরিক্ত ব্যয় দেশের জিডিপির ১.১ শতাংশ। কিন্তু সংখ্যাটা খুব সহজ স্বাভাবিক মনে হলেও, বাস্তবে এই সংখ্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে চিন্তার থেকেও আরও ভয়াবহ। যার ফলাফল পেট্রল পাম্পে ৫/৭ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার পরেও তেল না পাওয়া, সেচের অভাবে কৃষকের ফসল বুনতে না পারা, কারখানার বন্ধ মেশিন আর খেটে খাওয়া মানুষের রাতের অন্ধকারে কান্না।

হরমুজ প্রণালী বন্ধ হওয়ার পর থেকে বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট চরমে পৌঁছেছে। কেননা দেশের ৯৫ শতাংশ জ্বালানি আমদানিনির্ভর। পাশাপাশি সবচেয়ে বড় বিষয় বাংলাদেশে কখনোই উন্নত দেশগুলোর মত ব্যাপক পরিমাণে তেল সংরক্ষণের ব্যবস্থা ছিল না। তাই আমদানি করে দিন এনে দিন খাওয়ার মতই চলছিল তেলের ব্যবহার। সেই প্রেক্ষাপটেই এখন হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাংলাদেশে তেলের সংকটের ভয়াবহতা এতটা তীব্রতর হয়েছে। বিদ্যুৎ খাত তো একেবারে ধ্বংসের মুখে। বাংলাদেশ পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ডের তথ্য অনুসারে, ২৩ শতাংশ বিদ্যুৎ কেন্দ্র গ্যাসের অভাবে বন্ধ। পিক ডিমান্ড ১৮,৫০০ মেগাওয়াট, কিন্তু উৎপাদন ১৬,০০০-এর নিচে নেমে গেছে।

শিল্প ক্ষেত্রেও অবস্থা খুবই ভয়াবহ। এখনই যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে তাতে দেশের প্রধান প্রধান শিল্পাঞ্চলগুলোতে গ্যাস ও তেলের অভাবে উৎপাদন অর্ধেকের নিচে নেমে এসেছে। অনেক বড় বড় রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠান বাধ্য হয়ে তাদের কর্মঘণ্টা কমিয়ে দিচ্ছে, এমনকি লোকসান কমাতে অনেক কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধের উপক্রম হয়েছে। তেল সংকট শুধু কলকারখানায় সীমাবদ্ধ নেই , তা পৌঁছে গেছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্লাসরুমেও।

জ্বালানি সাশ্রয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কর্মঘণ্টা কমিয়ে এবং অনলাইন ক্লাসের মতো বিকল্পে ফেরার উপক্রম হয়েছে। করোনা মহামারীর ইতিহাস থেকে আমরা দেখেছি অনলাইন ক্লাস তেমন কোনো সুফল বয়ে আনেনি বরং একটি প্রজন্মের মেধা বিকাশের পথকে রুদ্ধ করেছে । আবার সেই রাস্তাতেই হাঁটতে বাধ্য হওয়া সত্যিই দুঃখজনক। কিন্তু সবচেয়ে ভয়ঙ্কর প্রভাবটি পড়ছে দেশের কৃষি খাতে।

বাংলাদেশের সেচ ব্যবস্থার একটি বড় অংশ ডিজেল চালিত পাম্পের ওপর নির্ভরশীল। ফলে সেচের অভাবে ফসলও গুনতে পারছেন না, সারের উৎপাদনও ব্যাহত হচ্ছে এবং কৃষি পণ্যের পরিবহন খরচ আকাশচুম্বী হচ্ছে। ফলশ্রুতিতে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের আগুন দাউ দাউ করে জ্বলছে সাধারণ খেটে খাওয়া কৃষকের পান্তা ভাতের থালায়। মূলত বর্তমান শতাব্দীতে তেল হলো এমন একটি শক্তি, যা ছাড়া যেকোন দেশ অচল। তেলের সংকটে পরিবহন খাত স্থবির হয়ে পড়লে সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পরে, আর সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পরার চূড়ান্ত পরিণতিই হলো দুর্ভিক্ষ। আজ আমরা যে হাহাকার দেখছি, তা যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে খাদ্য সংকট শুধু আশঙ্কা নয়, এক রূঢ় সত্য হিসেবে আবির্ভূত হবে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের অস্থিরতার অজুহাতে দেশের ভেতরে যে মুদ্রাস্ফীতি তৈরি হয়েছে, তা এরইমধ্যে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তের পিঠে ছুরি মারছে।

আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের রণহুঙ্কার আর ক্ষমতার মহড়া হয়তো বিশ্ব নেতাদের কাছে শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের মাধ্যম হতে পারে, কিন্তু বাংলার সাধারণ মানুষের কাছে এটি বেঁচে থাকার অধিকার হরণের নামান্তর। যদি যুদ্ধ বন্ধ না হয় এবং তেলের এই সংকট দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে খাদ্য উৎপাদন কমবে, কর্মসংস্থান কমবে, দারিদ্র্য বাড়বে। আর দারিদ্র্য বাড়লে সমাজে অস্থিরতা আসবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমানের তেল সংকট ১৯৭০এর দশকের তেল সংকটের থেকে ভয়াবহ হতে চলেছে। কারণ এবার শুধু দাম বাড়েনি, সরবরাহই বন্ধ হয়ে গেছে। এই অবস্থা থেকে উত্তরণে শুধু কূটনৈতিক বিবৃতিই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন যুগোপযুক্ত ব্যবস্থা।

রাষ্ট্রীয় আমদানিকারক সংস্থা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের অধীনে কৌশলগত মজুত দ্রুত বাড়ানোর ব্যবস্থা করতে হবে। যাতে অন্ততপক্ষে কয়েক মাসের চাহিদা রিজার্ভ রাখা যায়। একই সঙ্গে একক অঞ্চল নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প সরবরাহ উৎস ও রুট নিশ্চিত করাও জরুরি।বিদ্যুৎ ও কৃষিখাতে তেল নির্ভরতা কমিয়ে সৌর, বায়ু ও এলএনজি ভিত্তিক পদ্ধতিতে রূপান্তর করতে হবে। গণপরিবহনে জ্বালানি দক্ষতা বাড়ানো এবং অপচয় রোধে কঠোর নীতি নিতে হবে। পাশাপাশি নাগরিক পর্যায়ে জ্বালানি সাশ্রয়কে অভ্যাসে পরিণত করার জন্য অনুপ্রেরণামূলক উপহার ব্যবস্থার প্রবর্তন করা যেতে পারে। বৃহৎ শক্তিগুলোর সামরিক উত্তেজনা যদি বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল ভেঙে দেয়, এবং তার ফলে কোনো দেশে দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতি দেখা দেয়, তাহলে সেই ক্ষতির দায় সেই যুদ্ধরত দেশগুলোরও বটে।

কিন্তু বাস্তবতা হলো কেউই দায় নিতে চায় না। কিন্তু কষ্ট পাচ্ছে বাংলার সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষেরা। তাই এই মুহূর্তেই দূরদর্শী সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিকল্প নেই। অন্যথায় এই আগুন রাষ্ট্রব্যবস্থার ভেতর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়বে। যার ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে অর্থনীতি, প্রশাসন এবং সমাজ ব্যবস্থা। তাই এখনই এই তেল সংকট নিরসনে সরকার, প্রশাসন ও সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে সম্মিলিতভাবে প্রচেষ্টা চালাতে হবে। তবেই দেশ এই সংকট পার করে নতুন বাংলাদেশের যাত্রা শুরু করতে পারবে।

প্রজ্ঞা দাস

শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ, ইডেন মহিলা কলেজ