বাস্তব দক্ষতা ছাড়া শিক্ষা কতটা কার্যকর

তৌসিফ রেজা আশরাফী

প্রকাশ : ০৫ এপ্রিল ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

শিক্ষা কোনো কাগজে নম্বর তোলার প্রতিযোগিতা নয়। শিক্ষা মানুষের চিন্তা, বোধ, বিচারক্ষমতা ও বাস্তব জীবনে সমস্যার সমাধান করার সামর্থ্য গড়ে তোলে। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার বড় একটি অংশ এখনও মুখস্থনির্ভরতার মধ্যে আটকে আছে। শিক্ষার্থীরা কী শিখছে তার চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে তারা কত নম্বর পাচ্ছে। ফলে শিক্ষা হয়ে উঠছে পরীক্ষাকেন্দ্রিক (এক্সামণ্ডসেন্ট্রিক), জীবনের সঙ্গে যার যোগ খুবই দুর্বল।

এর প্রতিফলন আমরা পরিসংখ্যানে স্পষ্টভাবে দেখতে পাই। জাতীয় পর্যায়ের বিভিন্ন মূল্যায়নে (অ্যাসেসমেন্ট) দেখা গেছে, প্রাথমিক স্তরে পড়াশোনা করেও অধিকাংশ শিক্ষার্থী কাঙ্ক্ষিত দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না। পঞ্চম শ্রেণিতে বাংলায় প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করেছে মাত্র ২৫ শতাংশ শিক্ষার্থী, অর্থাৎ ৭৫ শতাংশ শিক্ষার্থী এই স্তরেও ভাষাগত সক্ষমতায় পিছিয়ে রয়েছে। গণিতের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক, যেখানে মাত্র ৩৩ শতাংশ শিক্ষার্থী কাঙ্ক্ষিত দক্ষতায় পৌঁছাতে পেরেছে।

বর্তমান সময়ে পৃথিবী দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে। প্রযুক্তি (টেকনোলজি), অর্থনীতি (ইকোনমি), কর্মক্ষেত্র (ওয়ার্কপ্লেস) ও সামাজিক কাঠামো সবকিছুই রূপ বদলাচ্ছে। এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় শুধু মুখস্থ বিদ্যা দিয়ে টিকে থাকা প্রায় অসম্ভব। প্রয়োজন বিশ্লেষণক্ষমতা (অ্যানালিটিক্যাল স্কিল), যোগাযোগ দক্ষতা (কমিউনিকেশন স্কিল), সৃজনশীলতা (ক্রিয়েটিভিটি), সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা (ডিসিশন-মেকিং অ্যাবিলিটি) ও বাস্তব সমস্যা সমাধানের দক্ষতা (প্রবলেমণ্ডসলভিং স্কিল)। অথচ বাস্তবতা হলো, শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ এই দক্ষতাগুলো অর্জন না করেই এক শ্রেণি থেকে আরেক শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হচ্ছে।

মুখস্থনির্ভর শিক্ষা হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের পরীক্ষাকেন্দ্রিক মূল্যায়ন পদ্ধতি (এক্সামণ্ডভিত্তিক অ্যাসেসমেন্ট সিস্টেম)। প্রশ্নপত্র এমনভাবে তৈরি হয়, যেখানে বইয়ের নির্দিষ্ট লাইন হুবহু লিখতে পারলেই বেশি নম্বর পাওয়া যায়। ফলে শিক্ষার্থী শেখে কীভাবে মুখস্থ করতে হয়, কেন বা কীভাবে বিষয়টি কাজ করে তা বোঝার প্রয়োজন পড়ে না। এর ফল হিসেবে দেখা যাচ্ছে, তৃতীয় শ্রেণিতেই প্রায় ৬১ শতাংশ শিক্ষার্থী গণিতে শ্রেণি-উপযোগী দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না। অর্থাৎ শিক্ষাজীবনের একেবারে শুরুতেই শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ পিছিয়ে পড়ছে, যা পরবর্তী ধাপে আরও প্রকট আকার ধারণ করে। শিক্ষকরাও অনেক সময় এই ব্যবস্থার বন্দি। নির্দিষ্ট সিলেবাস (পাঠ্যসূচি) শেষ করার চাপ, বড় ক্লাসরুম, সময়ের স্বল্পতার কারণে আলোচনা, ব্যবহারিক কাজ বা প্রকল্পভিত্তিক শিক্ষা (প্রজেক্ট-বেইজড লার্নিং) দেওয়ার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে। ফলে শিক্ষক নিজেও বইনির্ভর লেকচারেই আটকে থাকেন।

পরীক্ষা খারাপ কিছু নয়। সমস্যা হলো, যখন পরীক্ষাই শিক্ষার একমাত্র মানদণ্ড হয়ে দাঁড়ায়। আমাদের দেশে অধিকাংশ ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীর মেধা, দক্ষতা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নির্ধারিত হয় কয়েক ঘণ্টার লিখিত পরীক্ষার মাধ্যমে। এতে শিক্ষার্থীর বাস্তব দক্ষতা, দলগত কাজের ক্ষমতা (টিমওয়ার্ক) কিংবা সৃজনশীল চিন্তার মূল্যায়ন হয় না। এর বাস্তব প্রমাণ পাওয়া যায় মৌলিক পড়া ও লেখার দক্ষতায়। বিভিন্ন জরিপে (সার্ভে) দেখা গেছে, প্রাথমিক স্তরের প্রায় ৩৩ শতাংশ শিক্ষার্থী তৃতীয় শ্রেণিতে এসেও সহজ বাক্য ঠিকভাবে পড়তে পারে না। অথচ একই শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় পাশ করছে, শ্রেণি পরিবর্তন করছে, এবং কাগজে-কলমে ‘সফল’ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

মুখস্থনির্ভর শিক্ষার সবচেয়ে বড় ক্ষতি হলো বাস্তব দক্ষতার অভাব। অনেক শিক্ষার্থী উচ্চ ডিগ্রি (হায়ার এডুকেশন ডিগ্রি) অর্জন করেও বাস্তব জীবনের সাধারণ সমস্যা সমাধানে হিমশিম খায়। চাকরির বাজারে (জব মার্কেট) গিয়ে তারা দেখে, পড়াশোনার সঙ্গে কাজের চাহিদার বড় ফাঁক। এর প্রতিফলন দেখা যায় বেকারত্বের পরিসংখ্যানে। দেশে মোট বেকারের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ, প্রায় ১২ শতাংশ, উচ্চশিক্ষিত হলেও বেকার। অর্থাৎ ডিগ্রি থাকা সত্ত্বেও বাস্তব কর্মদক্ষতার অভাবে তারা কর্মসংস্থানে প্রবেশ করতে পারছে না। এটি প্রমাণ করে যে মুখস্থভিত্তিক শিক্ষা ডিগ্রি দিলেও দক্ষতা তৈরি করতে ব্যর্থ হচ্ছে। এই পরিস্থিতি শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাসে আঘাত করে। তারা নিজের সামর্থ্য নিয়ে সন্দিহান হয়ে পড়ে, যা দীর্ঘমেয়াদে মানসিক স্বাস্থ্যের (মেন্টাল হেলথ) ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

মুখস্থনির্ভর শিক্ষা শুধু জ্ঞানগত ক্ষতি করে না, মানসিক বিকাশেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। শিক্ষার্থীরা প্রশ্ন করতে ভয় পায়, ভিন্নভাবে চিন্তা করতে দ্বিধা করে। কারণ তারা শিখেছে নির্দিষ্ট উত্তরই সঠিক, তার বাইরে কিছু ভাবা ঝুঁকিপূর্ণ। এই মানসিকতা তৈরি হওয়ার ফলেই দেখা যায়, শ্রেণিকক্ষে অনেক শিক্ষার্থী জানে না কেন একটি উত্তর ঠিক বা ভুল, শুধু জানে পরীক্ষায় কোন উত্তর লিখলে নম্বর পাওয়া যাবে। এতে সৃজনশীলতা কমে যায় এবং নতুন ধারণা তৈরির প্রবণতা ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়। এই সমস্যার দায় শুধু শিক্ষাব্যবস্থার নয়। পরিবার ও সমাজও মুখস্থনির্ভরতাকে উৎসাহ দেয়। অনেক অভিভাবক সন্তানের প্রকৃত শেখার চেয়ে পরীক্ষার ফলাফলকে বেশি গুরুত্ব দেন। ভালো নম্বর না পেলে শিশুকে তুলনা করা হয় অন্যদের সঙ্গে, যা চাপ ও ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করে। সমাজে এখনও একটি প্রচলিত ধারণা রয়েছে যে বেশি নম্বর মানেই বেশি মেধা। অথচ বাস্তবতা হলো, উচ্চ নম্বর পাওয়া অনেক শিক্ষার্থীই বাস্তব জীবনের সাধারণ দক্ষতায় পিছিয়ে থাকে।

এই প্রেক্ষাপটে আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থায় মুখস্থের জায়গা সীমিত হওয়া জরুরি। ধারণা বোঝা, প্রয়োগ শেখা ও বাস্তব অভিজ্ঞতার মাধ্যমে শিক্ষা অর্জনই হতে হবে মূল লক্ষ্য। প্রকল্পভিত্তিক শিক্ষা (প্রজেক্ট-বেইজড লার্নিং), দলগত কাজ (টিমওয়ার্ক) ও সমস্যা সমাধানমূলক কার্যক্রম শিক্ষার্থীদের শেখার প্রতি আগ্রহ বাড়ায় এবং শেখাকে করে গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী। এই পরিবর্তনের জন্য শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ (টিচার ট্রেনিং) অত্যন্ত জরুরি। শিক্ষককে শুধু পাঠ্যবই পড়ানো ব্যক্তি না হয়ে শেখার পথপ্রদর্শক (ফ্যাসিলিটেটর) হতে হবে। একই সঙ্গে পাঠ্যক্রম (কারিকুলাম) ও মূল্যায়ন পদ্ধতিতেও পরিবর্তন আনতে হবে। লিখিত পরীক্ষার পাশাপাশি ব্যবহারিক কাজ, প্রকল্প, উপস্থাপনা (প্রেজেন্টেশন) ও ধারাবাহিক মূল্যায়নের ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন। প্রযুক্তি সঠিকভাবে ব্যবহার করলে মুখস্থনির্ভরতা কমাতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। অনলাইন রিসোর্স (অনলাইন উপকরণ), ইন্টারঅ্যাকটিভ কনটেন্ট (আন্তঃক্রিয়ামূলক বিষয়বস্তু) ও ভার্চুয়াল ল্যাব (ভার্চুয়াল পরীক্ষাগার) শেখাকে আরও বাস্তবমুখী করতে পারে। তবে প্রযুক্তি যেন শুধু ডিজিটাল মুখস্থের নতুন রূপ না হয়, সে বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে।

শিক্ষাব্যবস্থায় মুখস্থনির্ভরতা ও বাস্তব দক্ষতার অভাব একটি গভীর ও বহুমাত্রিক সমস্যা। পরিসংখ্যানগুলো স্পষ্টভাবে দেখায় যে ভালো পাসের হার থাকা সত্ত্বেও বড় একটি অংশের শিক্ষার্থী মৌলিক দক্ষতা অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছে। পরিবর্তন সহজ নয়, কিন্তু অসম্ভবও নয়। যদি আমরা নম্বরের চেয়ে শেখাকে গুরুত্ব দিই এবং বাস্তব দক্ষতাকে শিক্ষার কেন্দ্রবিন্দুতে আনি, তাহলে শিক্ষা আর বোঝা থাকবে না। শিক্ষা হবে জীবনের জন্য প্রস্তুতির সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার।

তৌসিফ রেজা আশরাফী

লেখক ও শিক্ষার্থী, দিনাজপুর আইন কলেজ