পথশিশুদের চোখে রাষ্ট্রের দায় একটি মানবিক আহ্বান

নায়িমা আখতার

প্রকাশ : ০৭ এপ্রিল ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

শহরের উচ্চ দালানকোঠায় যখন মা হাতে এক গ্লাস দুধ আর এক প্লেট ফলমূল নিয়ে বকাঝকা করছেন তার সন্তান খেতে চাইছে না বলে! শহরের অন্যদিকে একই সময় ছোট্ট নিষ্পাপ শিশু বালতি ভর্তি ফুল নিয়ে শহরের রাস্তার ভিড়ের মধ্যে ফুল বিলিয়ে বেড়াচ্ছে এক মুঠো খাবারের আশায়। শহরের ব্যস্ত সড়কের পাশে ফুল হাতে যে ফুলেরা দাঁড়িয়ে থাকে, ফুটপাথের ধুলোয় প্রকৃতির সঙ্গে যে নিষ্পাপ মুখগুলো খেলা করে, কিংবা রেলস্টেশনের কোণে কোণে যে ছোট ছোট মুখগুলো প্রতিদিন বেঁচে থাকার সংগ্রামে নেমে পড়ে- তাদের আমরা পথশিশু বলি। কিন্তু এই শব্দটি যেন তাদের জীবনের গভীর বেদনা ও বঞ্চনার পূর্ণ প্রতিচ্ছবি নয়। এই পথশিশুরা শুধু পথের নয়, তারা রাষ্ট্রেরও সন্তান, যাদের প্রতি আমাদের সম্মিলিত দায়িত্ব রয়েছে, যা আমরা অনেকাংশেই এড়িয়ে যাই।

এই ফুলগুলো পরিস্থিতির নির্মম শিকার। পরিবার হারানো, দারিদ্র্যের চরম রূপ, পারিবারিক সহিংসতা, দুর্ঘটনা কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগ তাদের ঠেলে দেয় রাস্তায়। সেখানে তাদের জীবন মানে অনিশ্চয়তা, ক্ষুধা, ভয় এবং বেঁচে থাকার এক অবিরাম লড়াই। একটি শিশুর যে বয়সে স্কুলের বেঞ্চে বসে রঙিন স্বপ্ন বোনার কথা, সেই বয়সেই তারা শিখে যায় কীভাবে প্রতিদিনের খাবার জোগাড় করতে হয়।

এই কঠিন বাস্তবতায় পথশিশুরা জড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন ধরনের শিশুশ্রমে। কেউ হকারি করে, কেউ ফুল বিক্রি করে, কেউ গাড়ির কাঁচ মুছে, কেউ খাবার হোটেলে কাজ করে, কেউ আবার ভিক্ষাবৃত্তিতে বাধ্য হয়, আবার কেউ কেউ ঝুঁকিপূর্ণ কাজেও নিযুক্ত হয় যেমন আবর্জনা সংগ্রহ, কারখানায় কাজ বা অপরাধমূলক চক্রের সঙ্গে যুক্ত হওয়া। এ যেন শৈশবের নিষ্পাপতা হারিয়ে বেঁচে থাকার নির্মম যুদ্ধের গল্প।

কিন্তু প্রশ্ন হলো এই শিশুশ্রম কি আইনি দৃষ্টিতে সঠিক? বাংলাদেশের প্রচলিত আইন, বিশেষ করে শ্রম আইন এবং শিশু অধিকার সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চুক্তি অনুযায়ী, শিশুশ্রম সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং দণ্ডনীয় অপরাধ। রাষ্ট্র শিশুদের জন্য একটি নিরাপদ ও সুরক্ষিত পরিবেশ নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আইন থাকা সত্ত্বেও তার কার্যকর প্রয়োগ অনেক ক্ষেত্রেই অনুপস্থিত।

১৯৮৯ সালে গৃহীত জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদ (UNCRC) এর ৩২ নং ধারায় শিশুশ্রমের বিরুদ্ধে সুরক্ষা প্রদান করা হয়েছে। বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬ অনুযায়ী ১৪ বছরের কম বয়সী শিশুদের যেকোনো প্রতিষ্ঠানে শ্রমিক হিসেবে নিয়োগ করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং শিশুশ্রম দণ্ডনীয় অপরাধ। ১৪-১৮ বছর বয়সী শিশুরা শর্তসাপেক্ষে নিরাপদ কাজ করতে পারবে, যা তাদের শিক্ষায় স্বাস্থ্যে বা মানসিক বিকাশে ব্যাঘাত ঘটায় না। কিন্তু ক্ষতিকর এবং ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করতে পারবে না।

এসব আইন থাকা সত্ত্বেও পথশিশুদের মধ্যে শিশুশ্রমের প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। এর পেছনে রয়েছে বহুমাত্রিক কারণ। প্রথমত, দারিদ্র্য একটি প্রধান কারণ। যখন পরিবারের আয় নেই বা খুবই কম, তখন শিশুরাও উপার্জনের দায়িত্ব নিতে বাধ্য হয়। দ্বিতীয়ত, শিক্ষা ব্যবস্থার অপ্রাপ্যতা বা অপ্রতুলতা। সংবিধানের ১৭ অনুচ্ছেদে শিশুদের বাধ্যতামূলক ও অবৈতনিক শিক্ষার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশে পথ শিশুরা কি এই অধিকার পাচ্ছে? অনেক পথশিশুর জন্য বিদ্যালয়ে যাওয়া বিলাসিতার মতো, কারণ তাদের কাছে প্রতিদিনের খাবারই বড় চ্যালেঞ্জ। তৃতীয়ত, সামাজিক অবহেলা ও রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের ঘাটতি এই সমস্যাকে আরও জটিল করে তোলে। এই সমস্যার সমাধানে রাষ্ট্রের করণীয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, পথশিশুদের জন্য নিরাপদ আবাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। আশ্রয়হীন শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত সংখ্যক পুনর্বাসন কেন্দ্র স্থাপন করা জরুরি, যেখানে তারা নিরাপদ পরিবেশে থাকতে পারবে। দ্বিতীয়ত, বিনামূল্যে ও বাধ্যতামূলক শিক্ষার কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। শুধু বিদ্যালয় স্থাপন করলেই হবে না, বরং পথশিশুদের উপযোগী নমনীয় শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা কাজের চাপের মধ্যেও শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে। তৃতীয়ত, চিকিৎসা সেবা সহজলভ্য করতে হবে। পথশিশুরা প্রায়ই অপুষ্টি, রোগব্যাধি ও মানসিক সমস্যায় ভোগে। তাদের জন্য বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা ও মানসিক সহায়তা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। চতুর্থত, নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে যাতে তারা শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, পাচার ও অপরাধমূলক কার্যক্রম থেকে সুরক্ষিত থাকে। শুধু আইন প্রণয়ন করলেই হবে না, বরং তার যথাযথ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। রাষ্ট্র, সমাজ এবং আমাদের সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায়ই সম্ভব পথশিশুদের জীবনে পরিবর্তন আনা। কারণ প্রতিটি শিশুরই অধিকার আছে একটি সুন্দর শৈশব, নিরাপদ জীবন এবং স্বপ্ন দেখার স্বাধীনতা পাওয়ার। সেই অধিকার নিশ্চিত করার মানবিক আহ্বান জানাই।

নায়িমা আখতার

আইন বিভাগ, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়