উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স : প্রতিশ্রুতি বনাম বাস্তবতা

বাপ্পাদিত্য চৌধুরী প্রবাল

প্রকাশ : ০৮ এপ্রিল ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হলো দেশের প্রতিটি নাগরিকের জন্য মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা। এই লক্ষ্যেই দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে গড়ে তোলা হয়েছে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলো। ধারণাগতভাবে এগুলো এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যেখানে গ্রাম থেকে শুরু করে উপজেলা পর্যায়ের মানুষ সহজে, স্বল্প খরচে প্রাথমিক ও জরুরি চিকিৎসা সেবা পাবে। কাগজে-কলমে এই ব্যবস্থাকে অত্যন্ত মানবিক ও প্রয়োজনীয় বলে মনে হলেও বাস্তবতার চিত্র অনেক ক্ষেত্রেই ভিন্ন। প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার এই ব্যবধান এখন একটি বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

দেশের প্রায় প্রতিটি উপজেলায় স্বাস্থ্য-কমপ্লেক্স থাকলেও সেবার মান নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। কোথাও ৫০ শয্যার হাসপাতাল, কোথাও আবার সম্প্রসারণের উদ্যোগ দেখা গেলেও কার্যকর সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। এর প্রধান কারণ জনবল সংকট। অধিকাংশ হাসপাতালে মঞ্জুরিকৃত পদের বড় অংশই দীর্ঘদিন ধরে শূন্য পড়ে থাকে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাবে অপারেশন থিয়েটার প্রায় অচল হয়ে পড়ে। ফলে রোগীরা সংকটময় পরিস্থিতিতে পড়ে বাধ্য হয়ে জেলা বা বিভাগীয় হাসপাতালের দিকে ছুটে যান, কিংবা প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানের শরণাপন্ন হন। এতে সময় ও অর্থ- উভয় ক্ষেত্রেই তাদের বড় ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়।

শুধু চিকিৎসকই নয়- নার্স, টেকনিশিয়ান ও সহায়ক কর্মচারীর ঘাটতিও সেবার মানকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে। অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি থাকলেও সেগুলো পরিচালনার জন্য দক্ষ জনবল না থাকায় সেগুলো ব্যবহার করা সম্ভব হয় না। ফলে পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে পড়ে, যা সাধারণ মানুষের জন্য চরম হতাশাজনক। নারী স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও জটিল। অধিকাংশ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পূর্ণকালীন গাইনি বিশেষজ্ঞের অভাব রয়েছে। অনেক জায়গায় পদ থাকলেও বাস্তবে তা পূরণ হয় না বা নিয়মিত সেবা পাওয়া যায় না। এর ফলে গর্ভবতী নারী ও অন্যান্য নারী রোগীরা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হন। প্রসবকালীন জটিলতা দেখা দিলে তাৎক্ষণিক চিকিৎসা না পেয়ে রোগীকে দ্রুত অন্যত্র রেফার করতে হয়, যা সময়ক্ষেপণের কারণে মা ও নবজাতকের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করে।

জরুরি সিজারিয়ান অপারেশনের জন্য প্রয়োজনীয় গাইনি বিশেষজ্ঞ, অ্যানেস্থেটিস্ট এবং প্রশিক্ষিত নার্সের অভাবে অনেক অপারেশন থিয়েটার কার্যত বন্ধ হয়ে থাকে। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে স্বাভাবিক ডেলিভারিও নিরাপদভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হয় না। গ্রামীণ নারীরা বিশেষ করে এই সংকটের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী, কারণ তাদের পক্ষে দূরের শহরে গিয়ে চিকিৎসা নেওয়া সবসময় সম্ভব হয় না। নারীস্বাস্থ্য সেবা শক্তিশালী না হলে একটি দেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা কখনোই উন্নত হতে পারে না- এই সত্যটি বারবার উপেক্ষিত হচ্ছে। চিকিৎসকদের অনিয়মিত উপস্থিতি এবং দায়িত্বহীনতাও একটি বড় সমস্যা। অনেক সময় রোগীরা হাসপাতালে গিয়ে প্রয়োজনীয় চিকিৎসককে খুঁজে পান না। এতে তারা হতাশ হয়ে পড়েন এবং বিকল্প পথ খুঁজতে বাধ্য হন। পাশাপাশি ঔষধ ব্যবস্থাপনাও দুর্বল। সরকারি হাসপাতালে প্রয়োজনীয় ওষুধ প্রায়ই পর্যাপ্ত মজুত থাকে না, ফলে রোগীদের বাইরে থেকে ওষুধ কিনতে হয়।

দরিদ্র মানুষের জন্য এটি একটি বড় বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। পরীক্ষা-নিরীক্ষার ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যায়। রিপোর্ট পেতে দেরি হওয়ায় রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা শুরুতে বিলম্ব ঘটে। বিশেষ করে এক্স-রে ও প্যাথলজি পরীক্ষার ক্ষেত্রে যন্ত্রপাতি থাকলেও দক্ষ অপারেটরের অভাবে সেগুলো ব্যবহার করা যায় না। ফলে রোগীদের বাইরের ডায়াগনস্টিক সেন্টারে যেতে হয়, যেখানে অতিরিক্ত খরচ বহন করতে হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কিছু অসাধু দালাল চক্র, যারা রোগীদের বিভ্রান্ত করে নির্দিষ্ট ক্লিনিক বা পরীক্ষাকেন্দ্রে নিয়ে যায় এবং অপ্রয়োজনীয় খরচ চাপিয়ে দেয়। জরুরি পরিবহন ব্যবস্থাও পর্যাপ্ত নয়। সরকারি এম্বুলেন্সের সংখ্যা রোগীর তুলনায় কম এবং অনেক সময় তা অকেজো অবস্থায় পড়ে থাকে। অন্যদিকে বেসরকারি এম্বুলেন্স থাকলেও সেগুলোর ভাড়া সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। জরুরি মুহূর্তে এই সংকট রোগীর জীবনকে আরও ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেয়।

রাতের সেবার অবস্থা আরও দুর্বল। অনেক সময় চিকিৎসকরা হাসপাতালে অবস্থান করেন না, ফলে জরুরি রোগীরা যথাযথ সেবা থেকে বঞ্চিত হন। তখন হাসপাতাল নির্ভর করে সীমিত দক্ষতার ডিউটি ডাক্তার বা ইন্টার্নদের ওপর, যা সব ক্ষেত্রে কার্যকর সমাধান নয়। অন্যদিকে হাসপাতালের অবকাঠামোগত দুর্বলতা ও অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ রোগীদের জন্য নতুন করে ঝুঁকি তৈরি করে। কোটি টাকা ব্যয়ে কেনা যন্ত্রপাতি ব্যবহারহীন পড়ে থাকে, ওয়ার্ড ও শৌচাগারের অস্বাস্থ্যকর অবস্থা রোগীর সুস্থতা অর্জনকে আরও কঠিন করে তোলে। প্রশাসনিক জটিলতা ও বিভিন্ন অদৃশ্য প্রভাবের কারণে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব ঘটে, যা সামগ্রিক সেবার মানকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

ফলস্বরূপ, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলো অনেক সময় কার্যকর চিকিৎসা কেন্দ্রের বদলে ‘রেফারেন্স সেন্টার’-এ পরিণত হয়। রোগীকে প্রাথমিকভাবে দেখে দ্রুত অন্যত্র পাঠিয়ে দেওয়া হয়, যা এই প্রতিষ্ঠানগুলোর মূল উদ্দেশ্যকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের পথ একেবারেই অজানা নয়। প্রয়োজন দক্ষ ও পর্যাপ্ত জনবল নিয়োগ, বিশেষ করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নিশ্চিত করা, কঠোর মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করা, চিকিৎসকদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা। পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে জবাবদিহিতা বাড়ানো এবং সেবার মান উন্নয়নে বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। স্বাস্থ্যসেবা কোনো বিলাসিতা নয়; এটি প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স যদি সেই অধিকার নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তবে দেশের সামগ্রিক উন্নয়নই প্রশ্নের মুখে পড়ে। তাই সময় এসেছে প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার এই ব্যবধান দূর করার। অন্যথায় ‘সেবার প্রতিশ্রুতি’ শুধুই একটি শূন্য শব্দবন্ধ হয়ে থাকবে, যার কোনো বাস্তব মূল্য থাকবে না।

বাপ্পাদিত্য চৌধুরী প্রবাল

শিক্ষার্থী, উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ, মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ