সহানুভূতি না সৌন্দর্য, আমাদের মানবিকতার আসল পরীক্ষা
সেঁজুতি মুমু
প্রকাশ : ০৮ এপ্রিল ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
বাংলাদেশে পথশিশুদের জীবন খুবই কষ্টকর। অনেক মানুষ আছেন যারা অনেক পথশিশুদের দায়িত্ব নেন। এটা সত্যিই প্রশংসনীয় উদ্যোগ। কয়েকদিন আগে একজন ফুল বিক্রেতা মেয়ে বাচ্চা তথা একজন পথশিশুর ভিডিও খুব ভাইরাল হয়েছে। তার সুন্দর চেহারা, মায়াবী হাসি সবার মন কেড়েছে। একজন সুহৃদ ব্যক্তি তার সারা জীবনের দায়িত্ব নিয়েছেন। নিঃসন্দেহে তিনি প্রশংসনীয় কাজ করেছেন। কিন্তু এখন আসা যাক একটা নির্মম বাস্তবতার আলোচনায়।
ঔপনিবেশিক যুগে ব্রিটিশরা আমাদের মস্তিষ্কে একটি ধারণা ঢুকিয়ে দিয়েছিল যে, ‘তারা শ্বেতাঙ্গর জন্যই সুন্দর আর ঔপনিবেশিক জাতি কৃষ্ণাঙ্গ তাই অসুন্দর!’ এই ধারণা যুগে যুগে আমাদের মস্তিষ্কে গেঁথে রয়েছে। আমরা যতই বর্ণবাদের বিরুদ্ধে কথা বলি, মূলত আমরা বর্ণবাদকেই সাপোর্ট করি। এর প্রমাণ পেতে বাহিরের দেশে যেতে হবে না, আমাদের সমাজের দিকে তাকিয়ে দেখুন। সবাই বলে শারীরিক সৌন্দর্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়, আসল সৌন্দর্য হলো মনের সৌন্দর্য। কিন্তু এটা সান্ত¡নামূলক বাণীমাত্র।
আসলে আমরা সবাই রেসিস্ট। আমি অন্যদের কথা বাদ দেই। নিজেকে দিয়েই বলি। একজন ফর্সা নারীকে দেখলে আমার যতটা ভালো লাগে, একজন কালো নারীকে দেখলে আমার তেমন ভালোলাগা কাজ করে না। অন্যান্য বাঙালির মতো আমিও রেসিস্ট হয়ে গেছি। আমি চাইলেই এই মানসিকতা বদলাতে পারছি না। কারণ এই চিন্তা ছোটবেলা থেকে আমার মাথায় ঢুকিয়েছে এই সমাজ। আমার গাত্রবর্ণ কালো নয় আবার ফর্সাও নয়। তবুও আমি নিজেকে ফর্সা করার জন্য বিভিন্ন উপায় অবলম্বন করি। কারণ আমাদের ছোটবেলা থেকে শেখানো হয়েছে, সাদা মানেই সুন্দর! তেমনি এই পথশিশুর বিষয়ে দেখুন।
এই একজন পথশিশু নয় যে ভাইরাল হয়েছে। বাংলাদেশে পথশিশুর সঠিক সংখ্যা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন মত থাকলেও, ২০২৪ সালের গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৩৪ লাখের বেশি পথশিশু রয়েছে। সবাই ওই বাচ্চাটার মতো সুন্দর দেখতে নয়। অনেকেই আছে কালো যাকে আমরা বলি অসুন্দর চেহারা। তারাও দুর্বিষহ জীবন যাপন করে। তারাও ফুল বিক্রি করে, ফুটপাতে ঘুমায়। এসব ভিডিও প্রায় দিনই দেখা যায় সোশ্যাল মিডিয়ায়। কিন্তু আমরা ওই শিশুদের নিয়ে এরকম মাতামাতি করি না কেন? ওদের দায়িত্ব কেউ নেয় না কেন? কারণ হলো ওরা ফর্সা নয়, আমাদের চোখে তারা সুন্দর নয়। যে সুন্দর শিশুটির দায়িত্ব নেওয়া হয়েছে, আমি মোটেও তার বিরুদ্ধে কথা বলছি না। অবশ্যই নেওয়া উচিত। আমি বলছি আমাদের ঘৃণ্য মানসিকতার কথা। ৩৪ লাখ পথশিশু! কি অবহেলায় না তাদের জীবন কাটছে। অথচ তাদের দায়িত্ব কেউ নেয় না! আমরা যে কি পরিমাণে রেসিস্ট তার একটা মাত্র দৃষ্টান্ত এটা।
কিন্তু হাজার হাজার দৃষ্টান্ত আমাদের সামনেই রয়েছে। একজন নারী যদি কালো বা শ্যামা হন তাকে সমাজে কি চোখে দেখা হয়, তা পরের আলোচনার বিষয়। কিন্তু সে নিজ বাড়িতেই কি মানসিক অত্যাচারের শিকার হয়, তা আমরা ধারণাও করতে পারব না। কালো মেয়ে জন্ম নিলে মা-বাবার মুখে হাসি থাকে না। তাদের ভাবনা, ‘কে বিয়ে করবে একে?’ একটু বড় হতে না হতেই এই প্রোডাক্ট ওই প্রোডাক্ট মাখানো হয় তাকে ফর্সা বানানোর জন্য, এটা আমাদের তথাকথিত সৌন্দর্য। এতে যে সেই মেয়েটি মানসিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয় সেদিকে কারো দৃষ্টি নেই। সবাই বলে, ‘মেয়েরা এত মেকাপ কেন করে? এত কৃত্রিমতা কেনো অবলম্বন করে? প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মূল্য কেনো বোঝে না?’ এর একটাই উত্তর তা হলো আমাদের সমাজ। আমাদের সমাজ ছোটবেলা থেকে মেয়েদের মাথায় ঢুকিয়ে দেয় তথাকথিত সুন্দর মানে ফর্সা না হলে, তার কোনো মূল্য নেই। আর এই মানসিকতার কারণেই আজ আমাদের এই অবস্থা। আমরা চাইলেও এই মানসিকতা থেকে বেরোতে পারছি না। কারণ সেই ঔপনিবেশিক আমল থেকে আমাদের মাথায় রেসিজম ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। যার শিকার হচ্ছি আমরা প্রতিনিয়ত। এখনও সময় আছে সৌন্দর্যের আসল অর্থ বুঝুন। শেষে না বললেই নয়, ‘কালো যদি মন্দ হয়, তবে কেশ পাকিলে কাঁদো কেন?’ সৌন্দর্যের প্রচলিত ধারণাকে বদলাতে হলে পরিবার থেকে, বিদ্যালয় থেকে চিন্তার বিপ্লব ঘটাতে হবে। তবেই তথাকথিত সুন্দরের এই কুৎসিত ধারণার বদল ঘটবে।
সেঁজুতি মুমু
শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়
