বিসিএস : তরুণ শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ
নুশরাত জাহান অনন্যা
প্রকাশ : ০৯ এপ্রিল ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বর্তমান সময়ে তরুণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে এক ধরনের অদৃশ্য মানসিক চাপ কাজ করছে। যার শেষ নেই স্পষ্ট ভাষাও নেই।
এই চাপ কখনও এতটাই অসহনীয় হয়ে ওঠে যে তা বলা যায় না, আবার সহ্য করাও কঠিন। বাইরে থেকে সবকিছু স্বাভাবিক মনে হলেও অনেকেই এক নীরব সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। আজকের অনেক তরুণ তাই হাসে, কথা বলে, স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করে কিন্তু ভেতরে ভেতরে তারা একা লড়ে যাচ্ছে। এই লড়াইটা চোখে পড়ে না, কিন্তু অনুভব করা যায় যদি একটু মন দিয়ে শোনা যায়। মানসিক চাপ নিয়ে অনেক বিজ্ঞানী অনেক সংজ্ঞা দাঁড় করিয়েছেন। অন্যতম বিখ্যাত সংজ্ঞাটি দিয়েছিলেন হাঙ্গেরিও ও কানাডীয় বিজ্ঞানী Hans selye যিনি স্ট্রেসের জনক হিসেবেও পরিচিত।
তার মতে স্ট্রেস বা মানসিক চাপ হলো শরীরের এমন একটি অনির্দিষ্ট প্রতিক্রিয়া, যা কোনো ধরনের পরিবর্তন বা চাহিদার প্রতি সারা হিসেবে সৃষ্টি হয়। তরুণ সমাজে এই পরিবর্তন বা চাহিদা হলো অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয়। বয়স বাড়ে, দায়িত্ব বাড়ে, মা-বাবার পরিবারের আকাঙ্ক্ষাও বাড়ে। আরও কঠিন বাস্তবতা হলো অনেক শিক্ষার্থীরই পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার মতো আর্থিক সামর্থ্য থাকে না। তবু তারা হাল ছাড়ে না। টিউশন করে, ধার করে, কষ্ট করে কোনোভাবে নিজেদের পড়াশোনা চালিয়ে যায়। তাদের মাথায় সবসময় ঘুরতে থাকে- কীভাবে এই খরচ সামলাব, ভবিষ্যতে কীভাবে একটা ভালো চাকরি পাব। এই চাপ তখন আরও গভীর হয়, যখন যথেষ্ট পরিশ্রম করার পরও দেশ তাদের মূল্যায়ন করতে ব্যর্থ হয়।
বর্তমানে তরুণ শিক্ষার্থীদের কাছে বিসিএস নামক পরীক্ষার ব্যস্ততা বেশি। বিসিএস বাংলাদেশের অসংখ্য তরুণের কাছে শুধু একটি চাকরি পরীক্ষা নয় বরং স্বপ্ন, সম্মান এবং নিরাপত্তার প্রতীক। সবাই যেন একই পথে ছুটছে, সবার চিন্তা একই। কেউ ভিন্ন চিন্তা করতে পারে না। পারবে বা কিভাবে এর অনেক শতাংশ দোষ দেশের পরিচালনার ব্যবস্থার। একটি দেশের পরিচালনা ব্যবস্থা তরুণ শিক্ষার্থীদের চিন্তাশক্তি কেড়ে নেয়। বাংলাদেশে সামগ্রিকভাবে কর্মসংস্থানের হার তুলনামূলকভাবে ভালো মনে হলেও আসল সমস্যা হচ্ছে উপযুক্ত চাকরি পাওয়া। মোট কর্মসংস্থান হার প্রায় ৯৫ শতাংশ এর অধিক। মানে মানুষ কিছু না কিছু কাজ করছে। কিন্তু এর মধ্যে অনেকেই আন্ডার এমপ্লয়েড, আবার নিজ যোগ্যতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ কাজ করছে।
বিশ্ববিদ্যালয় গ্রাজুয়েটদের মধ্যে বেকারত্ব আনুমানিক ১০ শতাংশ থেকে ১৫ শতাংশ অধিক। নতুন গ্রাজুয়েটদের মধ্যে এটা আরও বেশি হতে পারে আনুমানিক ১৫ থেকে ২০ শতাংশ। অর্থাৎ ডিগ্রি থাকলেই চাকরি এটা বাস্তবে সত্য না। বাংলাদেশে বর্তমানে সবচেয়ে বড় চাকরির ক্ষেত্র হলো বেসরকারি খাত যেমন- গার্মেন্টস ও টেক্সটাইল, ব্যাংকিং ও ফিনান্স, আইটি ও ফ্রিল্যান্সিং, এনজিও ইত্যাদি। কিন্তু এইসব ক্ষেত্রেও জব সিকিউরিটি কম, স্যালারি শুরুতে কম এবং কাজের চাপ বেশি। অন্যদিকে বাংলাদেশ গবেষণার সুযোগ তুলনামূলকভাবে সীমিত।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কিছু সুযোগ আছে কিন্তু ফান্ডিং কম, আধুনিক ল্যাব সুবিধা কম। GDP এর মাত্র ০.৩-০.৫ শতাংম এর মতো গবেষণায় ব্যয় হয়। তাই গবেষণা পেশা হিসেবে জনপ্রিয় না। গবেষকরা ভালো বেতন পান না অতঃপর ব্রেন ড্রেইন হয়। ফলে অনেকে মনে করে বিসিএস দেওয়া একমাত্র পথ। কিন্তু বাস্তবতা একটু ভিন্ন। বাংলাদেশে বিসিএস পরীক্ষায় একটি চাকরির জন্য প্রতিযোগিতা কতটা তীব্র এটা বুঝতে হলে একটু সংখ্যা দেখা দরকার। সাধারণত প্রতি বিসিএস এ আবেদন করে তিন থেকে পাঁচ লাখ প্রার্থী। চূড়ান্তভাবে ক্যাডার পদে নিয়োগ হয় প্রায় ২০০০-৩৫০০ জন। তাহলে হিসাবটা কী দাঁড়ায়? একটি ক্যাডার পদের জন্য লড়াই করে প্রায় ১০০ থেকে ২০০ জন বা তারও বেশি প্রার্থী। এই সংখ্যাগুলো শুধু প্রতিযোগিতা না, একটা মানসিক চাপও বোঝায়। এর মধ্যে দলীয় রাজনীতি, প্রভাবশালীদের প্রভাব, আর্থিক দুর্নীতির ঘটনাও ঘটতে দেখা যায়। যারা এই প্রতিযোগিতা থেকে পিছিয়ে পড়ে তাদের শেষ অবস্থান কোথায়? তারা কি দেশের বোঝা হয়ে থাকবে?
দেশ পরিচালনা ব্যবস্থায় এই এককেন্দ্রিক চাকরির ব্যবস্থার বাইরে চিন্তা করা জরুরি। বেকারত্ব, মানসিক চাপ, তরুণদের ঝরে পড়া ইত্যাদি সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য প্রথমেই প্রয়োজন একটি বাস্তবমুখী ও মানবিক শিক্ষা ব্যবস্থা। সিজিপির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে শিক্ষার্থীদের দক্ষতা, সৃজনশীলতা এবং ব্যবহারিক জ্ঞানকে গুরুত্ব দিতে হবে। চাকরির সুযোগ বৃদ্ধি করা অত্যন্ত জরুরি। সরকারি এবং বেসরকারি খাতকে একসঙ্গে কাজ করে নতুন কর্মসংস্থানের জন্য উপযোগী খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। এতে শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী হতে পারবে এবং তাদের মানসিক চাপ কমবে। উদ্যোক্তা তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ সমাধান হতে পারে। সব শিক্ষার্থী যে চাকরি করবে এই ধারণা পরিবর্তন করতে হবে।
শিক্ষার্থীদের উদ্যোক্তা হতে উৎসাহিত করতে হবে। এজন্য সহজ শর্তে ঋণ, প্রশিক্ষণ এবং পরামর্শ প্রদান করা যেতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের উদ্যোক্তা শিক্ষা চালু করা উচিত। যাতে শিক্ষার্থীরা নিজেদের উদ্যোগে কিছু করতে আগ্রহী হয়। গবেষণার সুযোগ বাড়াতে হবে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পর্যাপ্ত গবেষণা তহবিল প্রদান, আধুনিক ল্যাবরেটরি স্থাপন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানো প্রয়োজন। দলীয় রাজনীতির নেতিবাচক প্রভাব কমিয়ে শিক্ষার পরিবেশকে শান্তিপূর্ণ নিরাপদ করতে হবে। পরিশেষে এটাই বলা যায় দেশ ও জাতি তখনই উন্নত হবে যখন বিভিন্ন ধরনের চিন্তার সঠিক বাস্তবায়ন ও মূল্যায়ন হবে। এজন্য প্রয়োজন অধিক বিনিয়োগ ও প্রয়োগকৃত খাত।
নুশরাত জাহান অনন্যা
শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
