ইতিহাসের শিক্ষাই কি ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নেওয়া

মোজাহিদ হোসেন

প্রকাশ : ০৯ এপ্রিল ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

জার্মান দার্শনিক হেগেল বলেছিলেন, ‘ইতিহাসের বড় শিক্ষা হলো ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা নেয় না’। বিশ্বের ও দেশের ইতিহাসের বাস্তবতার নিরিখে এটাই যেন ধ্রুব সত্যতে পরিণত হয়েছে। নেপোলিয়ন রাশিয়া আক্রমণ করে ব্যর্থ হয়েছিলেন, তারপরও একশ’ বছর পর হিটলার একই ভুল করেছিলেন। ফলাফল একই, পরিণতি একই । রোম থেকে শুরু করে আধুনিক যুগ পর্যন্ত, ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন বারবার পতন ডেকে এনেছে, তবু নেতারা সেই পথই বেঁছে নিয়েছে বারবার। ফরাসি বিপ্লব, রুশ বিপ্লব, এবং আধুনিক গণআন্দোলন, সবই চরম বৈষম্যের ফল। তবু শাসকরা বৈষম্য তৈরি করতেই থাকেন বারংবার। ভিয়েতনাম থেকে ইরাক, প্রতিবারই মিথ্যা বা অতিরঞ্জিত কারণ দেখিয়ে যুদ্ধ শুরু হয়েছে। বাংলাদেশের দিকে খেয়াল করলে একই ফলাফল দেখা যায়, ১৯৭৫ এর মুজিবসহ সপরিবারে হত্যা, ১৯৯০ এর গণঅভ্যুত্থান এবং সর্বশেষ ২০২৪ এর ছাত্রজনতার গণঅভ্যুত্থান। দেশ ও বিশ্বের বড় বড় গণহত্যা ও যুদ্ধ এই কারণেই সংঘটিত হয়েছে। ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিলে বিশ্বে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ হতো না। যদিও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে এখনো বিশ্বে বড় যুদ্ধ হয়নি। তবে এখন বিশ্ব সেই দিকেই চলছে। মনে হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরেও সেই শিক্ষা হয়নি। তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিকেই বিশ্ব। আবার দেশের ইতিহাসের পাতা থেকে শিক্ষা নিলে ৭৫ এর মুজিবসহ সপরিবারে হত্যা হতো না, ১৯৯০ এবং ২০২৪ এ গণঅভ্যুত্থান হতো না। বারবার এতো গণহত্যার সংঘটিত হতো না।

আমরা বারবার বলি ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়া উচিত। ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়াই বুদ্ধিমানের বুদ্ধিবৃত্তিক পরিচয়। যেই শিক্ষা নিয়েছে এবং বাস্তবতার প্রেক্ষিতে দায়িত্ব পালন করেছে, তাকেই সফলতার দারপ্রান্তে দেখা গিয়েছে। কিন্তু এই সংখ্যাটা খুবই কম। বরং এর চেয়ে বেশি সংখ্যা রয়েছে, যারা ইতিহাস সৃষ্টি করে এসেও সেই ইতিহাসই ভুলে যায়। ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়া যে শুধু রাজনৈতিক ক্ষেত্রে প্রযোজ্য তা কিন্তু নয়, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং পারিবারিক জীবনে সব ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। কিন্তু এর প্রয়োগের অনেকটা দেখা যায় রাজনৈতিক ক্ষেত্রে।

বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক দেশ। বলা হয়ে থাকে গণতান্ত্রিক দেশে সব ক্ষমতার মালিক জনগণ। আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন গণতন্ত্রের সংজ্ঞায় বলতেছিলেন : ‘এড়াবৎহসবহঃ ড়ভ ঃযব ঢ়বড়ঢ়ষব, নু ঃযব ঢ়বড়ঢ়ষব, ভড়ৎ ঃযব ঢ়বড়ঢ়ষব’অর্থাৎ, গণতন্ত্র হলো জনগণের সরকার, জনগণের দ্বারা সরকার এবং জনগণের জন্য সরকার। গণতান্ত্রিক দেশের প্রধান বিষয় রাজনৈতিক দল থাকা এবং প্রত্যেক রাজনৈতিক দলের নিজস্ব লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য থাকা। জনগণ যা দেখে দেশের সরকার নির্ধারণ করবে। বাস্তবতায় পরিপ্রেক্ষিতে দেখা যায়- দলগুলোর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সবই আছে কিন্তু বাস্তবায়নে শূন্য। যার জন্য পরবর্তীতে ক্ষমতায় আসার জন্য বিভিন্ন অনৈতিক উপায় বেঁচে নিতে হচ্ছে।

বাংলাদেশ স্বাধীনতার আজ ৫৫ বছর পেরিয়ে গেছে। অনেক সরকার আসছে, গেছে। কেউ পুরো সময় থাকতে পেরেছে, কেউ পারেনি। আবার কেউ অনৈতিক উপায়ে অনেক দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুর মধ্যে ছিল। এক সরকারের পর আরেক সরকার আসে কিন্তু পূর্বের সরকারের ভুল কেউ সংশোধন করতে চায় না। কেউ একই ভুল করে, কেউ নতুন নতুন ভুলের দিকে এগোতে থাকে। এ জন্য বলতেই হয় ইতিহাসের বড় শিক্ষা ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা নেয় না।

বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করে ১৯৭১ সাথে। এর আগে ১৯৬৯ সালে গণঅভ্যুত্থান হয়। আইয়ুব খান ১৯৫৮ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত পাকিস্তানের ক্ষমতায় ছিলেন। এরপর গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যম ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। এর অন্যতম কারণ অর্থনৈতিক বৈষম্য, মৌলিক গণতন্ত্রের নামে প্রহসন, বিরোধী দলের উপর নিপীড়নসহ অনেক কারণে ছাত্র জনতার তীব্র আন্দোলনে পদত্যাগ করেন। এই আন্দোলনের নেতৃত্ব ছিল সাধারণ জনগণের সঙ্গে আওয়ামী লীগের ভূমিকা ছিল অনেক। পরবর্তীতে স্বাধীনতার পর শেখ মুজিবের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকারই দেশের ক্ষমতায় আসে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক যে, তিনি গণঅভ্যুত্থানের কথা ভুলে গিয়েছিলেন। যার ফলে শেখ মুজিব হয়ে উঠেন স্বাধীন দেশের স্বৈরাচারী শাসক। ক্ষমতা কুক্ষিগত করেন, বাকশাল প্রতিষ্ঠা করেন, সম্পদ লুট করেন, যার ফলে দেশে ১৯৭৪ সালে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। রফিক আজাদ লিখেছিলেন, ‘ভাত দে হারামজাদা নইলে মানচিত্র চিবিয়ে খাব’। শেখ মুজিব পূর্বের গণঅভ্যুত্থান থেকে শিক্ষা না নিয়ে পুনরায় ক্ষমতার অপব্যবহার করেন। ফলে তাকেসহ পরিবারের সবাইকে হত্যা করা হয় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট । এরপর আওয়ামী লীগ অনেক বছর মাথা উঠিয়ে দাঁড়াতে পারেনি।

এরপর ১৯৯০-এ আবার ছাত্রজনতার গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত হয়। দেশে সামরিক শাসক জারি করে এরশাদ ক্ষমতায় আসে। কিন্তু তিনিও ইতিহাসের কথা ভুলে গেলেন। হয়ে উঠলেন স্বৈরাচারী শাসক। যার ফলাফল গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে পতন।

২০০৮ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসেও ইতিহাস থেকে শেখ হাসিনা শিক্ষা নিতে পারেননি। হয়ে উঠলেন স্বৈরাচার শাসক হিসেবে। ক্ষমতা কুক্ষিগত করে খুন, গুম, ক্রসফায়ার, হত্যা, ফাঁসি, দুর্নীতি, অন্যায়, অবিচারসহ সব কিছু নিজের মতো করে নিজের আয়ত্তে নিয়ে আসে। যার ফলাফল ২০২৪-এর ছাত্রজনতার জুলাই গণঅভ্যুত্থান। পতন ঘটে ১৬ বছরের স্বৈরাচারী হাসিনা সরকারের। পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিল।

দেশের বর্তমান সরকারের উচিত ২০২৪ এর জুলাই গণঅভ্যুত্থানের কথা স্মরণ করে পদক্ষেপ নেওয়া। কেননা জুলাইয়ের প্রায় দেড় হাজার শহিদদের রক্তের মাধ্যমেই দেশ থেকে স্বৈরাচার সরকারের পতন হয়েছে এবং নতুন সরকার গঠন হয়েছে। জুলাইকে ধারণ করে দেশের জনগণের ভাষা বুঝে রাজনীতিতে এগোলে পরবর্তীতে আলোকোজ্জ্বল ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে।

দেশের রাজনীতিতে একেক সময় একেক ধরনের পরিবর্তন দেখা যায়। স্বাধীনতার পর দেশে এখন পর্যন্ত ১৩টি সংসদ নির্বাচন হয়েছে। এসব নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ছয় বার, বিএনপি চার বার ও জাতীয় পার্টি দুবার জয়ী হয়ে সরকার গঠন করে। বিতর্কিত নির্বাচনে ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ। এভাবে একেক নির্বাচনের ফলাফল একেকরকম। কোনো নির্বাচনে বিএনপি জয়লাভ করে আবার কোনো নির্বাচনে আওয়ামী লীগ। এখান থেকেও শিক্ষা নেওয়া যায়, কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। বাংলাদেশের নির্বাচনের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়- কোনো দলই জনগণের ভোটে টানা দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসতে পারেনি। দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসতে করতে হয়েছে ভোট চুরি বা ইঞ্জিনিয়ারিং এর মাধ্যমে। একটা দল একবার ক্ষমতায় আসলে দ্বিতীয়বার কেন নির্বাচিত হচ্ছে না? পরেরবার অন্য দল জয়লাভ করতেছে কেন? এই প্রশ্ন থেকেই যায়। যদি দলগুলো একটু ভিন্ন ভাবে চিন্তা করতো যেমন- পূর্বের দল যা ভুল করেছে তা সংশোধন করা, নিজেদের দলের মধ্যে কারা অন্যায় বা অবিচারের দিকে ধাবিত হচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ গ্রহণ করা। কে দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত হচ্ছে, কে ক্ষমতার অপব্যবহার করতেছে, কে অন্যায়কারীকে প্রশ্রয় দিচ্ছে, কে সরকারি সম্পত্তি লুট করতেছে ইত্যাদি বিষয়ের দিকে লক্ষ্য রেখে পদক্ষেপ নেওয়া, তাহলেই মনে হয় পরবর্তীতে ক্ষমতায় আসতে ভোট চুরি বা ভোট ইঞ্জিনিয়ারিং করার প্রয়োজন পড়বে না। এক্ষেত্রে বড় ইঞ্জিনিয়ারিং হতে পারে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করে আয়ত্তে নিয়ে আসা।

রাজনীতিতে ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নেওয়া একটি কাঠামোগত সমস্যা। এর জন্য যেমন রাজনৈতিক দল দায়ী, তেমনি দায়ী জনগণ। তবে প্রত্যেক নেতা ও রাজনৈতিক দলের উচিত ইতিহাসকে না ভুলা। কেননা ইতিহাসের শিক্ষাই অনেক কিছু শিখিয়ে দেয়, অনেক কিছু উপলব্ধি করতে শেখায়। দেশে যে দলেরই সরকার আসুক না কেন, তাদের উচিত ইতিহাসকে সামনে রেখে দেশের মানুষের ম্যান্ডেট বুঝে দায়িত্ব পালন করা।

মোজাহিদ হোসেন

শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া