আবারও তেল নিয়ে তেলেসমাতি

বাজার সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি সাধারণ মানুষ

প্রকাশ : ০৯ এপ্রিল ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশে সাধারণ মানুষের নিত্যপণ্যের তালিকায় ভোজ্যতেল একটি অপরিহার্য উপাদান। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে এই পণ্যটি নিয়ে যে ‘তেলেসমাতি’ বা কারসাজি চলছে, তা শুধু উদ্বেগজনক নয় বরং সাধারণ ভোক্তাদের পিঠ দেওয়ালে ঠেকিয়ে দেওয়ার শামিল। আন্তর্জাতিক বাজারে দামের সামান্য ওঠানামাকে অজুহাত করে দেশের বাজারে যখন দফায় দফায় দাম বাড়ানো হয়, তখন প্রশ্ন ওঠে- বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে কারা? সরকার নাকি অদৃশ্য কোনো সিন্ডিকেট?

সম্প্রতি আবারও ভোজ্যতেলের বাজার অস্থির হয়ে উঠেছে। সরকার নির্ধারিত দামের তোয়াক্কা না করে খুচরা বাজারে বেশি দামে তেল বিক্রি হচ্ছে। অথচ সরকারি তথ্যমতে, দেশে চাহিদার বিপরীতে তেলের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। তাহলে এই সংকট কেন? উত্তরটা খুব চেনা- কৃত্রিম সংকট। বড় বড় আমদানিকারক ও মিল মালিকরা যখন পণ্য সরবরাহ কমিয়ে দেন বা ডিলার পর্যায়ে তেল আটকে রাখেন, তখনই বাজারে সরবরাহ ঘাটতি দেখা দেয়। আর এই সুযোগে খুচরা বিক্রেতারা ইচ্ছেমতো দাম হাঁকান।

ব্যবসায়ীরা সবসময় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ার দোহাই দেন। কিন্তু মজার বিষয় হলো, যখন বিশ্ববাজারে দাম কমে, তখন দেশের বাজারে তার প্রতিফলন দেখা যায়, অতি সামান্য বা অনেক দেরিতে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে সেটা মুহূর্তের মধ্যে খুচরা বাজারে কার্যকর হয়, অথচ দাম কমলে বলা হয় ‘আগের কেনা স্টক শেষ হয়নি’। এই দ্বিচারিতা ব্যবসায়িক নৈতিকতার চরম অবক্ষয় প্রকাশ করে। সাধারণ মানুষের পকেট কেটে মুনাফার পাহাড় গড়ার এই সংস্কৃতি এখন ডালভাত হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাজার নিয়ন্ত্রণের জন্য সরকারের একাধিক সংস্থা কাজ করছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং স্থানীয় প্রশাসন প্রায়ই বাজারে অভিযান চালায়। কিন্তু এই অভিযানগুলো যেন অনেকটা ‘মশা তাড়াতে কামান দাগানো’র মতো। খুচরা বিক্রেতাকে দুই-চার হাজার টাকা জরিমানা করেই অভিযান শেষ হয়। অথচ যারা এই সংকটের মূল হোতা- সেই শীর্ষস্থানীয় আমদানিকারক বা মিল মালিকদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কোনো দৃষ্টান্ত দেখা যায় না। ফলে সিন্ডিকেট ভাঙার পরিবর্তে তা দিন দিন আরও শক্তিশালী হচ্ছে। ‘বাজার তদারকি শুধু খুচরা দোকানে সীমাবদ্ধ থাকলে মূল সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। উৎসস্থলে আঘাত না হানলে তেলের এই তেলেসমাতি চলতেই থাকবে।’

নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত মানুষের আয়ের একটি বড় অংশ চলে যাচ্ছে খাদ্য ক্রয়ে। চাল, ডাল, সবজির সঙ্গে ভোজ্যতেলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি জনজীবনে নাভিশ্বাস তুলেছে। অনেকে তেলের ব্যবহার কমিয়ে দিয়েছেন, অনেকে আবার বাধ্য হয়ে নিম্নমানের খোলা তেল ব্যবহার করছেন, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি। পুষ্টির সঙ্গে আপস করতে করতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান আজ তলানিতে ঠেকেছে। একটি স্বাধীন দেশে নিত্যপণ্যের দাম নিয়ে এমন অরাজকতা কোনোভাবেই কাম্য নয়। ভোজ্যতেলের বাজারকে স্থিতিশীল করতে হলে শুধু অভিযান নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত পরিকল্পনা। অল্প কয়েকজন আমদানিকারকের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে প্রতিযোগিতামূলক বাজার তৈরি করতে হবে। ছোট আমদানিকারকদেরও সুযোগ দিতে হবে। শুধু সয়াবিন বা পাম তেলের ওপর নির্ভর না করে দেশে সরিষা, সূর্যমুখী ও ধানের কুঁড়ার তেল (রাইস ব্র্যান অয়েল) উৎপাদন বৃদ্ধিতে কৃষকদের প্রণোদনা দিতে হবে। মজুতদারদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনে জেল ও বড় অংকের জরিমানা নিশ্চিত করতে হবে। লাইসেন্স বাতিলের মতো কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে সরকার যেন দ্বিধা না করে। দেশে প্রতি মাসে প্রকৃত চাহিদা কত এবং কার কাছে কতটুকু মজুত আছে, তার একটি ডিজিটাল ডাটাবেজ থাকতে হবে। এতে কৃত্রিম সংকট তৈরির পথ বন্ধ হবে।

ভোজ্যতেল নিয়ে বছরের পর বছর যে টালবাহানা চলছে, তার অবসান হওয়া জরুরি। আমরা একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের কথা বলি, যেখানে মানুষের মৌলিক চাহিদাগুলো সাশ্রয়ী মূল্যে পাওয়ার কথা।

কিন্তু বাজার সিন্ডিকেটের এই ‘তেলেসমাতি’ রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থার দুর্বলতাকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। সরকার যদি এখনই শক্ত হাতে বাজার নিয়ন্ত্রণ না করে, তবে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। সাধারণ মানুষের আস্থায় ফিরতে হলে সিন্ডিকেটের শক্তির চেয়ে জনস্বার্থকে বড় করে দেখতে হবে। তেলের তেলেসমাতি বন্ধ হোক, জনজীবনে শান্তি ফিরে আসুক- এটাই এখন সময়ের দাবি।