‘ফুয়েল পাস’ অ্যাপ ও আগামীর প্রত্যাশা
প্রকাশ : ১০ এপ্রিল ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

দেশের জ্বালানি খাতে আধুনিকায়ন ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে কিউআর কোডভিত্তিক ‘ফুয়েল পাস’ অ্যাপের পরীক্ষামূলক যাত্রা শুরু হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানানো এই উদ্যোগটি বর্তমান ডিজিটাল বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একটি সময়োপযোগী ও সাহসী পদক্ষেপ। রাজধানীর দুটি ফিলিং স্টেশনে প্রাথমিকভাবে মোটরসাইকেলের মাধ্যমে এই পাইলটিং কার্যক্রম শুরু হলেও, এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব পুরো জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে বদলে দেওয়ার সক্ষমতা রাখে।
দীর্ঘদিন ধরেই দেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় নানা অব্যবস্থাপনা ও স্বচ্ছতার অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছিল। পর্যাপ্ত মজুত থাকা সত্ত্বেও অনেক সময় ফিলিং স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ যানজট এবং কৃত্রিম সংকটের খবর আমাদের গণমাধ্যমগুলোতে উঠে আসে। এর একটি বড় কারণ হলো ম্যানুয়াল বা সনাতন পদ্ধতি, যেখানে জ্বালানি বিতরণের কোনো রিয়েল-টাইম ট্র্যাকিং ব্যবস্থা ছিল না। ফলে একই ব্যক্তি বা যানবাহন বারবার লাইনে দাঁড়িয়ে প্রয়োজনের অতিরিক্ত জ্বালানি সংগ্রহ করে কালোবাজারে বিক্রি বা মজুত করার সুযোগ পেত।
‘ফুয়েল পাস’ অ্যাপটি এই সনাতন পদ্ধতির ত্রুটিগুলো দূর করতে একটি বৈপ্লবিক হাতিয়ার হতে পারে। যখন প্রতিটি যানবাহনের জ্বালানি গ্রহণ বিআরটিএ-এর কেন্দ্রীয় ডেটাবেসের সঙ্গে সংযুক্ত থাকবে, তখন বরাদ্দকৃত জ্বালানির অতিরিক্ত সংগ্রহের সুযোগ বন্ধ হয়ে যাবে। এটি কেবল স্বচ্ছতাই আনবে না, বরং রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় রোধে কার্যকর ভূমিকা পালন করবে।
এই নতুন ব্যবস্থার সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হলো এর কেন্দ্রীয় ড্যাশবোর্ড ও অটোমেশন। রিয়েল-টাইম মনিটরিংয়ের মাধ্যমে নীতিনির্ধারকরা জানতে পারবেন কোনো অঞ্চলে কী পরিমাণ জ্বালানি সরবরাহ হচ্ছে এবং কোথায় চাহিদা কেমন। ফিলিং স্টেশন মালিকরা যখন ডিজিটাল মাধ্যমে জ্বালানির বরাদ্দ এন্ট্রি দেবেন, তখন তদারকি সংস্থাগুলোর পক্ষে প্রতিটি ফোঁটা তেলের হিসাব রাখা সহজ হবে। এতে করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির মাধ্যমে মুনাফা লোটার অসাধু চক্রটির দৌরাত্ম্য কমে আসবে।
স্মার্টফোন নেই এমন নাগরিকদের জন্যও বিকল্প ব্যবস্থা (ওয়েবসাইট থেকে কিউআর কোড প্রিন্ট করা) রাখা হয়েছে, যা এই উদ্যোগকে অন্তর্ভুক্তিমূলক করেছে।
প্রযুক্তির সুফল যেন কেবল একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, তা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব এবং ফুয়েল পাস অ্যাপের নকশায় সেই প্রতিফলন ইতিবাচক।
যেকোনো নতুন প্রযুক্তি প্রবর্তনের ক্ষেত্রে কিছু প্রাথমিক চ্যালেঞ্জ থাকে। ‘ফুয়েল পাস’ অ্যাপের ক্ষেত্রেও আমাদের কয়েকটি বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।
বিআরটিএ-এর ডেটাবেসের সঙ্গে রিয়েল-টাইম সংযোগ রক্ষা করতে হলে উচ্চগতির ইন্টারনেট এবং নিরবচ্ছিন্ন সার্ভার সেবা নিশ্চিত করতে হবে। সার্ভার ডাউন থাকলে ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হতে পারে। সাধারণ চালক ও ফিলিং স্টেশন কর্মীদের এই অ্যাপ ব্যবহারে দক্ষ করে তুলতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে নতুন প্রযুক্তি গ্রহণে অনীহা দেখা যায়, তাই পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও প্রচারণা প্রয়োজন।
ব্যবহারকারীদের তথ্য ও যানবাহনের ডেটা যেন হ্যাকিং বা অন্য কোনো অপব্যবহারের শিকার না হয়, সেদিকে কঠোর নজরদারি রাখতে হবে। জ্বালানি নিরাপত্তা একটি দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড। বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের এই সময়ে দেশের অভ্যন্তরে সরবরাহ ব্যবস্থাকে দক্ষ ও অপচয়মুক্ত করা অপরিহার্য। ‘ফুয়েল পাস’ অ্যাপটি শুধু একটি সফটওয়্যার নয়, বরং এটি জ্বালানি খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠার একটি অঙ্গীকার।
আমরা আশা করি, রাজধানীর এই পাইলটিং প্রকল্প থেকে প্রাপ্ত অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে দ্রুততম সময়ে সারা দেশে সব ধরনের যানবাহনের জন্য এই ব্যবস্থা চালু করা হবে।
স্টেকহোল্ডারদের সমন্বিত প্রচেষ্টা এবং কারিগরি ত্রুটিমুক্ত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা গেলে, এটি ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ বিনির্মাণে একটি মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। জ্বালানি বিতরণে আসুক গতি, নিশ্চিত হোক স্বচ্ছতা- এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
