বিশ্ব পারকিনসন্স দিবস : নীরব স্নায়ুরোগের কারণ, লক্ষণ ও করণীয়
ডা.মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ
প্রকাশ : ১১ এপ্রিল ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

প্রতি বছর ১১ এপ্রিল বিশ্বব্যাপী পালিত হয় (বিশ্ব পারকিনসন্স দিবস)। এই দিনটি প্রখ্যাত চিকিৎসাবিজ্ঞানী (জেমস পারকিনসন্স)-এর জন্মদিন উপলক্ষে নির্ধারণ করা হয়েছে। তিনি প্রথম এই রোগের বৈজ্ঞানিক বর্ণনা প্রদান করেন। পারকিনসন্স একটি দীর্ঘস্থায়ী স্নায়ুতন্ত্রের অবক্ষয়জনিত রোগ, যা ধীরে ধীরে মানুষের স্বাভাবিক চলাফেরা, ভারসাম্য, কথা বলা এবং দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এ রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়, তবে বর্তমানে অপেক্ষাকৃত কম বয়সীদের মধ্যেও এর উপস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
পারকিনসন্স রোগ কী : পারকিনসন্স হলো এক ধরনের (পারকিনসন্স রোগ), যেখানে মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট স্নায়ুকোষ ধীরে ধীরে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। এর ফলে ডোপামিন নামক একটি গুরুত্বপূর্ণ রাসায়নিকের ঘাটতি তৈরি হয়। এই রাসায়নিকটি শরীরের চলাফেরা ও পেশির সমন্বয় নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যখন ডোপামিনের পরিমাণ কমে যায়, তখন শরীরের স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হয় এবং নানা উপসর্গ দেখা দিতে শুরু করে।
রোগের কারণ : পারকিনসন্স রোগের সুনির্দিষ্ট কারণ এখনও সম্পূর্ণভাবে জানা না গেলেও গবেষণায় কিছু ঝুঁকির কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে-
* বয়সজনিত পরিবর্তন: ৬০ বছরের বেশি বয়সীদের মধ্যে ঝুঁকি বেশি
* বংশগত প্রভাব: পরিবারে এ রোগ থাকলে সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়
* পরিবেশগত প্রভাব: কীটনাশক, বিষাক্ত রাসায়নিক ও দূষণের প্রভাব
* মস্তিষ্কে রাসায়নিক ভারসাম্যহীনতা: ডোপামিনের ঘাটতি
দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ ও কোষের ক্ষয়
লক্ষণসমূহ : পারকিনসন্স রোগের লক্ষণ ধীরে ধীরে শুরু হয় এবং সময়ের সঙ্গে তা বাড়তে থাকে। শুরুতে লক্ষণগুলো হালকা থাকলেও পরে তা গুরুতর হয়ে উঠতে পারে।
* হাত, পা বা শরীরের কোনো অংশ কাঁপা
* চলাফেরায় ধীরগতি
* পেশি শক্ত হয়ে যাওয়া
* ভারসাম্য রক্ষা করতে অসুবিধা
* হাঁটার সময় শরীর সামনের দিকে ঝুঁকে পড়া
অন্যান্য লক্ষণ :
* ঘুমের সমস্যা ও অস্থিরতা
* বিষণ্ণতা, উদ্বেগ ও মানসিক চাপ
* স্মৃতিশক্তি দুর্বল হয়ে যাওয়া
* কোষ্ঠকাঠিন্য
* গন্ধ অনুভবের ক্ষমতা কমে যাওয়া
* কথা বলার স্বর ধীরে বা অস্পষ্ট হয়ে যাওয়া
প্রকারভেদ : পারকিনসন্স রোগ সাধারণত তিনটি প্রধান ভাগে বিভক্ত-
১. অজানা কারণজনিত পারকিনসন্স : এটি সবচেয়ে বেশি দেখা যায় এবং এর নির্দিষ্ট কারণ এখনও নির্ধারণ করা যায়নি।
২. দ্বিতীয়িক পারকিনসন্স : কোনো ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, বিষক্রিয়া বা অন্য রোগের কারণে এই ধরনের পারকিনসন্স দেখা দেয়।
৩. অস্বাভাবিক পারকিনসন্স : এই ধরনের রোগে লক্ষণ দ্রুত বাড়ে এবং জটিলতা বেশি দেখা যায়। সাধারণ চিকিৎসায় সবসময় ভালো ফল পাওয়া যায় না।
জটিলতা : দীর্ঘদিন ধরে পারকিনসন্স রোগ চলতে থাকলে নানা ধরনের জটিলতা দেখা দিতে পারে-
* চলাফেরায় মারাত্মক অসুবিধা
* বারবার পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি বৃদ্ধি
* স্মৃতিভ্রংশ বা মানসিক অবক্ষয়
* গিলতে সমস্যা, ফলে অপুষ্টির ঝুঁকি
কথা বলতে অসুবিধা :
* বিষণ্ণতা ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা
* দৈনন্দিন কাজকর্মে অন্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়া
বিশ্ব পরিস্থিতি : বিশ্বজুড়ে প্রায় এক কোটিরও বেশি মানুষ পারকিনসন্স রোগে আক্রান্ত। প্রতিবছর নতুন রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। বয়স্ক জনগোষ্ঠীর মধ্যে এ রোগ বেশি দেখা যায়। উন্নত দেশগুলোতে রোগ শনাক্তের হার বেশি হলেও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে সচেতনতার অভাবে অনেক রোগী শনাক্ত হয় না।
বাংলাদেশ পরিস্থিতি : বাংলাদেশে আনুমানিক ২ থেকে ৩ লক্ষ মানুষ পারকিনসন্স রোগে ভুগছেন। গ্রামীণ অঞ্চলে সচেতনতার অভাব এবং চিকিৎসা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক রোগী শুরুতেই চিকিৎসা নিতে পারেন না। ফলে রোগ জটিল আকার ধারণ করে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংখ্যাও তুলনামূলকভাবে কম।
চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপনা :
পারকিনসন্স রোগ সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য না হলেও সঠিক চিকিৎসা ও পরিচর্যার মাধ্যমে দীর্ঘদিন নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব-
* ওষুধের মাধ্যমে ডোপামিনের ঘাটতি পূরণ করা
* নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম ও চলাফেরার অনুশীলন
* কথা বলার সমস্যা দূর করতে বিশেষ অনুশীলন
* জটিল ক্ষেত্রে মস্তিষ্কে বিশেষ যন্ত্রের মাধ্যমে উদ্দীপনা প্রদান
হোমিওসমাধান : পারকিনসন্স রোগে হোমিওপ্যাথিক দৃষ্টিভঙ্গি
হোমিওপ্যাথির মূলনীতি হলো- ‘রোগ নয়, রোগীর চিকিৎসা করা হয়।’ তাই পারকিনসন্স রোগের ক্ষেত্রে শুধু রোগের নাম দেখে চিকিৎসা করা যথেষ্ট নয়; বরং রোগীর সামগ্রিক লক্ষণ, শারীরিক গঠন, মানসিক উপসর্গ এবং পরিবেশগত প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে চিকিৎসা প্রদান করা অত্যন্ত জরুরি।
একজন অভিজ্ঞ হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক যদি রোগীর পূর্ণাঙ্গ লক্ষণসমষ্টি সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে পারেন, তাহলে আল্লাহর রহমতে এ চিকিৎসা পদ্ধতিতে ভালো ফলাফল পাওয়া সম্ভব। পারকিনসন্স রোগে প্রাথমিকভাবে লক্ষণ অনুযায়ী যেসব হোমিওপ্যাথিক ঔষধ বিবেচনা করা হয়ে থাকে:- কস্টিকাম, জিঙ্কাম মেটালিকাম, আগারিকাস মুসকারিয়াস, জেলসিয়াম, প্লাম্বাম মেটালিকাম, মারকুরিয়াস সল, নাক্স ভোমিকা, আর্সেনিকাম অ্যালবাম, হায়োসায়ামাস, ল্যাকেসিস, অপিয়াম, ক্যালকেরিয়া কার্বোনিকা, ব্যারাইটা কার্বোনিকা, সেপিয়া, সালেসিয়া, কালি ফস, কোনিয়াম, বেলাডোনা, স্ট্রামোনিয়াম, আর্জেন্টাম নাইট্রিকাম
সতর্কতা : উপরোক্ত প্রতিটি ঔষধই নির্দিষ্ট লক্ষণ, মানসিক অবস্থা, শারীরিক বৈশিষ্ট্য এবং রোগের পর্যায়ের ওপর ভিত্তি করে নির্বাচন করা হয়। তাই একই রোগ হলেও সবার জন্য একই ঔষধ প্রযোজ্য হয় না।
অতএব, নিজে নিজে ঔষধ সেবন না করে অবশ্যই একজন অভিজ্ঞ ও বিশেষজ্ঞ হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করা উচিত। এতে সঠিক চিকিৎসা নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি সম্ভাব্য জটিলতা এড়ানো সম্ভব হবে।
ঘরোয়া করণীয় : দৈনন্দিন জীবনে কিছু নিয়ম মেনে চললে রোগের অগ্রগতি ধীর করা সম্ভব-
খাদ্যাভ্যাস :
* সুষম ও পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ
* আঁশযুক্ত খাবার বেশি খাওয়া
* পর্যাপ্ত পানি পান করা
ব্যায়াম :
* প্রতিদিন নিয়মিত হাঁটা
* হালকা ব্যায়াম ও শরীর প্রসারণ
* ভারসাম্য বজায় রাখার অনুশীলন
মানসিক যত্ন :
* মানসিক চাপ কমানো
* পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সময় কাটানো
* ইতিবাচক চিন্তা বজায় রাখা
নিরাপত্তা ব্যবস্থা :
* ঘরের ভেতর নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা
* পা পিছলে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমানো
* প্রয়োজনে সহায়ক উপকরণ ব্যবহার
সচেতনতার গুরুত্ব : পারকিনসন্স রোগ ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পায়, তাই শুরুতেই শনাক্ত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সচেতনতা বৃদ্ধি পেলে রোগের জটিলতা অনেকাংশে কমানো সম্ভব। এ বিষয়ে (বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা)সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান কাজ করে যাচ্ছে।
পরিশেষে বলতে চাই, পারকিনসন্স একটি দীর্ঘস্থায়ী কিন্তু নিয়ন্ত্রণযোগ্য রোগ। সঠিক সময়ে চিকিৎসা গ্রহণ, নিয়মিত ব্যায়াম, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং পারিবারিক সহায়তা একজন রোগীর জীবনমান উন্নত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিশ্ব পারকিনসন্স দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়- এই রোগ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি, রোগীর প্রতি সহানুভূতি এবং সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমেই আমরা একটি সুস্থ ও মানবিক সমাজ গড়ে তুলতে পারি।
ডা.মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ
লেখক, কলাম লেখক ও জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষক, প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি
