যুদ্ধবিরতিতে কার পাল্লা কতটুকু ভারী?

মো. শাহিন আলম

প্রকাশ : ১২ এপ্রিল ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া ৩৯ দিনের রক্তক্ষয়ী সংঘাত শেষে মধ্যপ্রাচ্যে অবশেষে স্থিতিশীলতার আভাস মিলছে। গত ৮ এপ্রিল পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান দুই সপ্তাহের এক সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে। ওমান যখন সমঝোতার চেষ্টা করছিল, ঠিক তখনই আন্তর্জাতিক রীতিনীতি উপেক্ষা করে ইরান আক্রমণ করে বসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। চলমান শান্তি আলোচনার মাঝখানে এই আকস্মিক আক্রমণ গোটা বিশ্বকে হতচকিত করে দেয়। ট্রাম্প ধরেই নিয়েছিল ইরান দ্রুত নতিস্বীকার করবে, কিন্তু বাস্তবতা হয়েছে ভিন্ন। ১০ দফা শর্ত মেনে খোদ যুক্তরাষ্ট্রকেই আলোচনার টেবিলে ফিরতে হয়েছে। তবু ট্রাম্প একে বললেন বিশ্ব শান্তির এক মহান দিন। ইরান বলছে শত্রুর উপর ঐতিহাসিক বিজয়। আর নেতানিয়াহুর মতে এটি প্রজন্মের মনে রাখার মতো জয়। এই পরস্পরবিরোধী দাবির আড়ালে প্রকৃত লাভণ্ডক্ষতির খতিয়ান আসলে কী বলছে?

সংখ্যার হিসেবে ইরানের ক্ষতি নিসন্দেহে সবচেয়ে ভারী। মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএএনএ জানাচ্ছে, ৩ হাজার ৬৩৬ জন নিহত, যাদের মধ্যে ২৫৪ জন শিশু। রেড ক্রিসেন্টের তথ্যে ৮২ হাজারের বেশি স্থাপনা বিধ্বস্ত। যুদ্ধের প্রথম দিনেই মিনাবের একটি মেয়েদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হামলায় ১৭৫ জন প্রাণ হারান, যার বেশিরভাগ শিশু। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এটিকে যুদ্ধাপরাধ বলছে। বিপরীতে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের দাবি অনুযায়ী তাদের মাত্র ১৩ জন সৈন্য নিহত হয়েছেন, আর ইসরায়েলের প্রাণহানি দাঁড়িয়েছে ৩৪ জনে।

সামরিকভাবেও ইরান বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। ২০২৫ সালের জুনের ১২ দিনের সংঘাত ও এই ৩৯ দিনের যুদ্ধে পারমাণবিক স্থাপনা নাতাঞ্জ, ইসফাহান ও ফোর্দো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শীর্ষ সামরিক কমান্ডার, আইআরজিসি নেতা এবং প্রধান পারমাণবিক বিজ্ঞানীরা নিহত হয়েছেন। নৌবাহিনীর উল্লেখযোগ্য অংশ ওমান উপসাগরে ধ্বংস হয়েছে। সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি নিজেই যুদ্ধের প্রথম দিনে নিহত হয়েছেন।

তবু ইরান টিকে গেছে। তার পুত্র মোজতাবা খামেনি ৮ মার্চ নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত হয়েছেন। ২০০৩ সালে ইরাক বা ২০১১ সালে লিবিয়ার মতো রাষ্ট্রকাঠামো যে ভেঙে পড়েনি, এটাই ইরানের সবচেয়ে বড় কৌশলগত বার্তা। সামরিক সক্ষমতার প্রশ্নেও ইরান চমক দিয়েছে। ডিমোনা পারমাণবিক কেন্দ্রের কাছাকাছি আঘাত হানা, উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোতে একযোগে হামলা এবং এখন পর্যন্ত এফ-১৫ ও এ-১০ ওয়ারথগ যুদ্ধবিমানসহ বেশ কটি মার্কিন বিমান ভূ-পাতিত করা প্রভৃতি মিলিয়ে ইরান প্রমাণ করেছে যে পশ্চিমা প্রযুক্তির বিরুদ্ধেও সরাসরি লড়াই করার সক্ষমতা তাদের ফুরিয়ে যায়নি।

এই যুদ্ধে তেহরানের সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র ছিল হরমুজ প্রণালী বন্ধ করার সিদ্ধান্ত। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা এটিকে বৈশ্বিক তেল বাজারের সর্ববৃহৎ সরবরাহ বিপর্যয় বলে বর্ণনা করেছে। বিশ্বের দৈনিক উৎপাদন থেকে এক থেকে দেড় কোটি ব্যারেল ছিটকে গেছে। ব্রেন্ট ক্রুড মার্চের মাঝামাঝিতে প্রতি ব্যারেল ১২০ ডলার ছাড়িয়েছিল, যুদ্ধের আগে যা ছিল মাত্র ৭০ ডলারের কাছাকাছি। এই অর্থনৈতিক চাপই শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রকে আলোচনার টেবিলে আনতে বাধ্য করেছে।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য পূরণ হলো কি? অপারেশন এপিক ফিউরির মূল লক্ষ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করা এবং শাসনকাঠামোতে আঘাত হানা। দুটি কাজেই আংশিক সাফল্য এসেছে বটে। তবে ইরানের দেশজুড়ে গভীর মাটির নিচে ছড়িয়ে থাকা ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিগুলোর ন্যূনতম হদিসও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল পায়নি। উপরন্তু, পেন্টাগনের সামরিক ব্যয় ৩৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। ঘরোয়া জরিপে প্রায় ৫৬ শতাংশ মার্কিন নাগরিক এই যুদ্ধের বিরোধী এবং মূল্যস্ফীতি ৪.২ শতাংশে পৌঁছানোর আশঙ্কায় ট্রাম্প প্রশাসন অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপে পড়েছে। কারও কারও মতে, ট্রাম্প সামরিক বিদ্রোহেরও মুখোমুখি হয়েছেন।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, ইরান কি পারমাণবিক অস্ত্র নির্মাণ থেকে পুরোপুরি সরে আসবে? ট্রাম্প বলেছেন ইরান আর ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণে ফিরবে না। কিন্তু ইরান সেটা সরকারিভাবে স্বীকার করেনি। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচি বরং ইঙ্গিত দিচ্ছেন যে ইরান পরমাণু অস্ত্র অপ্রসার চুক্তি থেকেই বেরিয়ে আসতে পারে, যা ভবিষ্যৎ আলোচনায় দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের পরিচিত কৌশল।

তবে কূটনৈতিক দিক থেকে ট্রাম্প একটা বড় মঞ্চ পেয়েছেন। ইরানের সঙ্গে আলোচনায় তিনি তার দলকে ইসলামাবাদে পাঠিয়েছে, যার নেতৃত্বে রয়েছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিশেষ দূত উইটকফ এবং কুশনার। এটি ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর দুই দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ের বৈঠক। আলোচনার টেবিলে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন সেনা ও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং হরমুজ প্রণালীর মতো জটিল সব বিষয়। তবে পারমাণবিক প্রশ্নে কোনো কাঠামোগত চুক্তি করতে পারলে সেটি ট্রাম্পের জন্য বড় রাজনৈতিক বিজয় হিসেবে গণ্য হবে।

অন্যদিকে, ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় আঘাত হেনে এবং আঞ্চলিক প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোকে (হিজবুল্লাহ, হুতি, হামাস) দুর্বল করে ইসরায়েল সাময়িক স্বস্তি পেলেও ডিমোনা বা তেলআবিবের আইডিএফ সদর দপ্তরের কাছে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাত ইসরায়েলের নিরাপদ দুর্গ তকমাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে এবং নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করেছে। এছাড়া লেবানন ইস্যুতে অনড় অবস্থানের কারণে মিত্রদের কাছে ইসরায়েলের কূটনৈতিক গ্রহণযোগ্যতাও আগের মতো স্বতঃসিদ্ধ থাকছে না।

তবে এই যুদ্ধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় লেখা হয়েছে মস্কো ও বেইজিংয়ে। রাশিয়া সরাসরি যুদ্ধে নামেনি কিন্তু ইরানকে গোয়েন্দা তথ্য ও ড্রোন কৌশলে সহায়তা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। পিটারসন ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিক্স ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষণ বলছে, ছয় সপ্তাহে রাশিয়া অতিরিক্ত ৮৪ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয় করেছে। ইউক্রেন যুদ্ধে যে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার চাপে রাশিয়া ছিল, হরমুজ সংকট সেই চাপ অনেকটাই লাঘব করেছে।

চীনের হিসাব আরও দীর্ঘমেয়াদি। ইরানের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার ও বেল্ট অ্যান্ড রোড অংশীদার হয়েও চীন সরাসরি সামরিক সমর্থন দেয়নি। তবে ৭ এপ্রিল জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে রাশিয়া ও চীন একযোগে সেই প্রস্তাবে ভেটো দিয়েছে, যেখানে হরমুজ খুলে দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছিল। এই অবস্থান গ্লোবাল সাউথে চীনের নেতৃত্বের দাবিকে আরও শক্তিশালী করে। পক্ষান্তরে, মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা বিনষ্ট এবং জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি হওয়ায় বিশ্ব অর্থনীতি যে পরাজয়ের সম্মুখীন হয়েছে, তা অস্বীকার করার সুযোগ নাই। হরমুজ প্রণালী বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল ও ২০ শতাংশ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের চলাচলপথ। এই প্রণালী বন্ধ থাকায় কুয়েত, ইরাক, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের দৈনিক উৎপাদন ১০ মিলিয়ন ব্যারেলের বেশি কমেছে। কাতার এনার্জি সব রপ্তানি চুক্তিতে অপ্রতিরোধ্য পরিস্থিতি ঘোষণা করেছে। উপসাগরীয় দেশগুলোর প্রায় ৮০ শতাংশ খাদ্য আমদানি এই পথেই আসে, মার্চের মাঝামাঝিতে সেখানে খাদ্যদ্রব্যের দাম ৪০ থেকে ১২০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে গেছে।

মো. শাহিন আলম

কলাম লেখক ও প্রাক্তন শিক্ষার্থী, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, সলিমুল্লাহ মুসলিম হল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়