প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১৩ এপ্রিল, ২০২৬
ভোরের রাঙা সূর্য যখন নতুন বছরের বার্তা নিয়ে পূর্ব দিগন্তে উদিত হয়, তখন কেবল একটি ক্যালেন্ডারের পাতা ওল্টায় না, বরং জেগে ওঠে একটি জাতির হাজার বছরের সুপ্ত চেতনা। পহেলা বৈশাখ বা বাংলা নববর্ষ কেবল একটি উৎসব নয়, এটি বাঙালির আত্মপরিচয়ের দর্পণ, এক অসাম্প্রদায়িক মহামিলনের মোহনা। ইতিহাসের পরিক্রমায় এই দিনটি বাঙালির জীবনে এমন এক অনিবার্য সত্তায় পরিণত হয়েছে, যা জাতি-ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে আমাদের একই সুতোয় গেঁথে রাখে। বর্তমানে বিশ্বায়নের প্রবল জোয়ারে যখন অনেক জাতি তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি হারিয়ে ফেলছে, তখন পহেলা বৈশাখ আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেয় আমাদের শিকড়ের কথা, আমাদের মাটির কথা। এই দিনটি আসলে বাঙালির সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণের এক বার্ষিক ইশতেহার, যা প্রতি বছর আমাদের জাতিসত্তাকে নবায়ন করে।
বাঙালির এই নববর্ষ উদযাপনের গোড়াপত্তন ও বিবর্তন ইতিহাসের এক রোমাঞ্চকর অধ্যায়। মূলত খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে মোঘল সম্রাট আকবরের আমলে প্রবর্তিত ‘ফসলি সন’ থেকে এর উৎপত্তি হলেও, এটি দ্রুতই শাসনতান্ত্রিক কাঠামোর বাইরে বেরিয়ে এসে সাধারণ মানুষের প্রাণের উৎসবে পরিণত হয়। কৃষিভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থায় চৈত্র সংক্রান্তি ও পহেলা বৈশাখ ছিল কৃষকের নতুন আশার দিন। হালখাতার সেই লাল মলাটের খাতা কেবল দেনা-পাওনার হিসাব ছিল না, তা ছিল ব্যবসায়ী ও ক্রেতার মধ্যকার এক সামাজিক সেতুবন্ধন। মিষ্টিমুখ আর কুশল বিনিময়ের মাধ্যমে যে সৌহার্দ্য তৈরি হতো, তা আজও আমাদের গ্রামীণ জনপদে বেঁচে আছে। আজ আধুনিক প্রযুক্তির যুগে হিসাব-নিকাশ হয়তো ডিজিটাল হয়েছে, কিন্তু হালখাতার সেই আন্তরিক আমেজ আজও আমাদের ঐতিহ্যের স্মারক হয়ে টিকে আছে।
ইতিহাসের প্রতিটি ক্রান্তিলগ্নে, বিশেষ করে আমাদের ভাষা আন্দোলন এবং পরবর্তী রাজনৈতিক সংগ্রামগুলোতে পহেলা বৈশাখ আমাদের প্রতিরোধের শক্তি জুগিয়েছে। ১৯৫০ ও ৬০-এর দশকে যখন পাকিস্তানি শাসনামলে বাঙালির সংস্কৃতিকে মুছে ফেলার সুগভীর ষড়যন্ত্র করা হয়েছিল, তখন রমনায় বটমূলের আয়োজন কেবল গানের আসর ছিল না, তা ছিল এক বলিষ্ঠ সাংস্কৃতিক বিদ্রোহ। ছায়ানটের সেই আয়োজন থেকে শুরু করে আজকের বিশাল ব্যাপ্তি—সবই প্রমাণ করে যে বাঙালির সাংস্কৃতিক অধিকার কেউ কখনও দাবিয়ে রাখতে পারেনি। পহেলা বৈশাখ আমাদের শিখিয়েছে কীভাবে দাপুটে শক্তির সামনে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হয়। এটি শুধু একদিনের গান বা নাচের আয়োজন নয়, এটি আমাদের স্বাধীন ভূখণ্ড অর্জনের লড়াইয়ের এক অন্যতম মূল চালিকাশক্তি। যা আজও আমাদের জাতীয়তাবোধের প্রধান স্তম্ভ হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।
আজকের এই আধুনিক যুগে পহেলা বৈশাখের প্রাসঙ্গিকতা আরও বহুগুণ বেড়ে গেছে। আমরা এখন এক অস্থির সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, যেখানে বিভেদ আর অসহিষ্ণুতা বারবার আমাদের সম্প্রীতিকে আঘাত করে। উগ্রপন্থা ও সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে পহেলা বৈশাখ হলো সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র। নববর্ষের প্রভাতী সুর আমাদের হৃদয়ে শান্তির বার্তা নিয়ে আসে। বৈশাখ মানেই তো পুরনোকে বিদায় জানানো। ‘মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা’ রবীন্দ্রনাথের এই অমর পঙক্তি শুধু গানে সীমাবদ্ধ নয়, এটি আমাদের জীবনের গভীর দর্শন। গত বছরের ব্যর্থতা, ব্যক্তিগত জীবনের গ্লানি এবং সব নেতিবাচকতাকে ধুয়ে মুছে নতুন উদ্যমে পথ চলাই এই উৎসবের মূল শিক্ষা। এই পুনর্জাগরণ শুধু বাহ্যিক সাজপোশাকে বা রঙিন মেলায় সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়, বরং এটি হওয়া উচিত আমাদের মনন ও চিন্তার স্তরে। আমাদের ভেতরের সংকীর্ণতা বিসর্জন দিয়ে উদার হওয়ার শিক্ষা দেয় এই বৈশাখ। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, রাজনৈতিক বা ধর্মীয় পরিচয়ের আগে আমরা মানুষ, আর আমাদের সবচেয়ে বড় পরিচয় আমরা বাঙালি।
পহেলা বৈশাখের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ মঙ্গল শোভাযাত্রা আজ বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে ইউনেস্কোর স্বীকৃতি পেয়েছে। বর্ণিল মুখোশ, বিশালকায় পাখি, টেপা পুতুল আর লোকজ মোটিফ নিয়ে যখন হাজার হাজার মানুষ রাজপথে নামে, তখন সেখানে কোনো উঁচু-নিচু বা বিভাজন থাকে না। এই শোভাযাত্রা মূলত অমঙ্গলকে দূর করে কল্যাণের আবাহন। এটি প্রমাণ করে যে, শিল্পের ভাষা আর শেকড়ের টান মানুষকে কতটা গভীরভাবে ঐক্যবদ্ধ করতে পারে। তবে উৎসবের এই সমারোহের মাঝে আমাদের অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে যাতে তা কেবল বাণিজ্যিক মোড়কে বন্দি না হয়ে পড়ে। শহরের যান্ত্রিকতায় পহেলা বৈশাখ যেন শুধু কর্পোরেট প্রচারণার মাধ্যম না হয়। বরং আমাদের যাপিত জীবনের প্রতিটি দিন যেন বৈশাখের এই উদার ও অসাম্প্রদায়িক আদর্শে অনুপ্রাণিত থাকে। আধুনিকতার নামে আমরা যেন আমাদের লোকজ সংস্কৃতি- যেমন গ্রামীণ মেলা, যাত্রা, পালাগান বা মাটির গানগুলোকে বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যেতে না দিই। পুনর্জাগরণ মানে শুধু নতুন বিলাসিতা নয়, বরং হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যের চর্চাকে পুনরায় জীবন দান করা। বর্তমানে পহেলা বৈশাখ বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা কোটি কোটি বাঙালির এক করার প্রধান মাধ্যম। লন্ডন থেকে নিউইয়র্ক, সিডনি থেকে টোকিও যেখানে বাঙালি আছে, সেখানেই বৈশাখী গান প্রতিধ্বনিত হয়।
এই বৈশ্বিক উদযাপন বিশ্বমঞ্চে আমাদের সংস্কৃতির শক্তিকে জানান দেয়। তবে এই উদযাপনের কেন্দ্রে থাকা উচিত আমাদের আদি মাটির ঘ্রাণ। যান্ত্রিকতা আর প্রযুক্তির ভিড়ে আমরা যেন ভুলে না যাই আমাদের পল্লীগীতির সুর, আমাদের নকশী কাঁথার সূক্ষ্ম কারুকাজ। নববর্ষের এই দিনে তাই আমাদের অঙ্গীকার হওয়া উচিত পরিবেশবান্ধব এবং লোকজ ঐতিহ্যনির্ভর উৎসব পালনের। অপসংস্কৃতির আগ্রাসন রোধে পহেলা বৈশাখ হলো বাঙালির সবচেয়ে বড় সাংস্কৃতিক ঢাল। এই দিনটি আমাদের মনে সাহস জোগায় যে, আমরা একটি অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও প্রাচীন ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারী এবং সেই ঐতিহ্যকে অবিকৃতভাবে রক্ষা করা আমাদের নৈতিক ও জাতীয় দায়িত্ব।
ওসমান গনি
সাংবাদিক ও কলামিস্ট