যানজটের মহোৎসব : স্থবির ঢাকা কি তবে নিয়তি?
প্রকাশ : ১৩ এপ্রিল ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ঢাকা মানেই যেন এক স্থবির নগরী। প্রতিদিন কয়েক কোটি মানুষের এই মেগাসিটিতে যাতায়াত মানেই এক অনিশ্চিত যুদ্ধ। সকালে বাসা থেকে বেরিয়ে গন্তব্যে পৌঁছানো যাবে কি না, আর পৌঁছালেও কতটা শারীরিক ও মানসিক শক্তি অবশিষ্ট থাকবে- তা নিয়ে সংশয় প্রতিটি নগরবাসীর। বছরের পর বছর ধরে ঢাকার যানজট নিয়ে আলোচনা, গবেষণা এবং হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন হলেও দৃশ্যত পরিস্থিতির কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন হয়নি। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই সমস্যাটি এক ভয়াবহ মহোৎসবে পরিণত হয়েছে।
বিগত এক দশকে ঢাকার যোগাযোগব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে। ফ্লাইওভার, এক্সপ্রেসওয়ে এবং বহুল প্রতীক্ষিত মেট্রোরেল চালু হয়েছে। এসব মেগা প্রজেক্ট অবশ্যই যাতায়াতে কিছুটা স্বস্তি এনেছে, বিশেষ করে নির্দিষ্ট রুটে। কিন্তু মূল সমস্যার গভীরে তাকালে দেখা যায়, বিচ্ছিন্ন কিছু এলাকায় গতি ফিরলেও পুরো শহরের সামগ্রিক ট্রাফিক ব্যবস্থার কোনো সুশৃঙ্খল কাঠামো দাঁড়ায়নি। মূল সড়কের যানজট এখন অলিগলিতে ছড়িয়ে পড়েছে। মেট্রোরেল ব্যবহারের জন্য মানুষ স্টেশনে পৌঁছাতে যে সময় ব্যয় করছে, অনেক ক্ষেত্রে তা মূল ভ্রমণের সময়ের চেয়েও বেশি।
ঢাকার যানজটের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে পরিবহন খাতের চরম বিশৃঙ্খলাকে দায়ী করা যায়। গণপরিবহন ব্যবস্থার বেহাল দশা, যেখানে লক্কড়-ঝক্কড় বাসগুলো রাস্তার মাঝখানে যত্রতত্র দাঁড়িয়ে যাত্রী উঠানামা করে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অপরিকল্পিতভাবে বাড়তে থাকা ব্যক্তিগত গাড়ি এবং রিকশার আধিপত্য। একই রাস্তায় যখন দ্রুতগামী বাস-কারের সঙ্গে ধীরগতির রিকশা ও ভ্যান চলে, তখন বিশৃঙ্খলা অনিবার্য হয়ে ওঠে। এছাড়া, ফুটপাত দখল হয়ে যাওয়ায় পথচারীরা রাস্তায় হাঁটতে বাধ্য হন, যা যানবাহনের গতি আরও কমিয়ে দেয়। একটি আন্তর্জাতিক গবেষণার তথ্যমতে, যানজটের কারণে ঢাকায় প্রতিদিন কয়েক লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। এই অপচয় শুধু সময়ের নয়, বরং তা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর বিশাল নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। জ্বালানি তেলের অপচয় ও পরিবেশ দূষণ তো আছেই। এর চেয়েও বড় ক্ষতি হচ্ছে জনস্বাস্থ্যের। ঘণ্টার পর ঘণ্টা জ্যামে বসে থাকার ফলে মানুষের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি মানসিক অবসাদ, উচ্চ রক্তচাপ এবং খিটখিটে মেজাজ তৈরি হচ্ছে, যা সামাজিক অস্থিরতার একটি প্রচ্ছন্ন কারণ।
শুধু ঢাউস প্রকল্প দিয়ে ঢাকার যানজট নিরসন সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন সমন্বিত এবং কঠোর পদক্ষেপ। বাস রুট ফ্র্যাঞ্চাইজি বা সুশৃঙ্খল বাসসার্ভিস চালু করা এখন সময়ের দাবি। মানসম্মত পাবলিক ট্রান্সপোর্ট নিশ্চিত হলে মানুষ ব্যক্তিগত গাড়ির ওপর নির্ভরতা কমাবে। ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে কোনো ছাড় দেওয়া যাবে না। অবৈধ পার্কিং এবং ফুটপাত দখলমুক্ত করা জরুরি। ঢাকার ওপর চাপ কমাতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল এবং সরকারি অফিসগুলোকে ঢাকার বাইরে স্থানান্তরের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে। হাতের ইশারায় ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের সনাতন পদ্ধতি বাদ দিয়ে স্বয়ংক্রিয় ও আধুনিক প্রযুক্তিভিত্তিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে।
ঢাকা আমাদের প্রাণের শহর, আমাদের অর্থনীতির হৃৎপিণ্ড। এই শহরকে স্থবির হয়ে থাকতে দেওয়া যায় না। যানজট নিরসন শুধু সরকারের একার দায়িত্ব নয়, এতে নাগরিকদের সচেতনতাও অপরিহার্য। তবে নীতিনির্ধারকদের মনে রাখতে হবে, ফ্লাইওভার দিয়ে যানজট উপরে তোলা যায়; কিন্তু সমূলে দূর করা যায় না। এর জন্য প্রয়োজন টেকসই পরিকল্পনা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা। আমরা এমন এক ঢাকা চাই, যেখানে গন্তব্যে পৌঁছানোর অনিশ্চয়তা থাকবে না, বরং কর্মচাঞ্চল্যে মুখরিত থাকবে রাজপথ।
