পহেলা বৈশাখ : শেকড়ের সন্ধান নাকি আধুনিকতার বিস্তার
মো. আমিনুর রহমান
প্রকাশ : ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

পহেলা বৈশাখ মূলত লোকজ ঐতিহ্যের উৎসব। আমাদের শেকড় এবং সংস্কৃতির সঙ্গে এই উৎসবের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। একসময় গ্রামীণ জীবনের সরলতা, মাটির গন্ধ আর লোকজ ঐতিহ্যের এক অকৃত্রিম প্রতিফলন দেখা যেত এই উৎসবে। সাধারণ মানুষের কাছে পহেলা বৈশাখ ছিল এক আত্মিক আনন্দ; তারা একে হৃদয়ে ধারণ করত। কিন্তু সে সময়কার সেই প্রাণবন্ত উন্মাদনা আজ অনেকটা ম্লান হয়ে আসছে। পহেলা বৈশাখের নামে বর্তমানে যে অপসংস্কৃতির ধারা প্রচলিত হচ্ছে, তা আমাদের মনে বড় একটি প্রশ্ন জাগিয়ে দেয়- আমাদের বর্তমানের এই জাঁকজমকপূর্ণ উদযাপন কি আদৌ মূল সংস্কৃতিকে ধারণ করে?
পহেলা বৈশাখ উদযাপনের সূচনা হয় সম্রাট আকবরের সময় বাংলা সন প্রবর্তনের মাধ্যমে। সেসময় পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে ‘শুভ হালখাতা’র প্রচলন শুরু হয়, যা ব্যবসায়িক উৎসব হিসেবে বিশেষ গুরুত্ব পেত। বছরের প্রথম দিনে ব্যবসায়ীরা নতুন-পুরাতন খদ্দেরদের আমন্ত্রণ জানিয়ে মিষ্টিমুখ করাতেন এবং নতুনভাবে ব্যবসায়িক সম্পর্ক স্থাপন করতেন। নববর্ষের উৎসব বাংলার গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল, ফলে গ্রামের সাধারণ মানুষের কাছে দিনটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে গণ্য হতো। এ দিনটিতে ভালো খাওয়া, ভালো থাকা এবং ভালো পোশাক পরাকে ভবিষ্যতের জন্য মঙ্গলজনক বলে মনে করা হতো।
গ্রামীণ মায়েরা নানারকম পিঠাণ্ডপুলি, পায়েস ও শাকসবজি রান্না করতেন। গ্রামে গ্রামে ছোট পরিসরে মেলা বসত। সেখানে স্থানীয় কৃষিজাত দ্রব্য, কারুপণ্য ও হস্তশিল্পের নানাসামগ্রী বিক্রি হতো। লোকজ ধারার গান, নাটক ও নৃত্য পরিবেশন করা ছিল এসব মেলার বিশেষ আকর্ষণ। পাশাপাশি সার্কাস ও লাঠ খেলারও আয়োজন থাকত। স্বতঃস্ফূর্তভাবে গ্রামবাসীরা মুগ্ধতা নিয়ে এসব আয়োজন উপভোগ করতো।
১৯৮৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে প্রথম মঙ্গল শোভাযাত্রা বের হয়েছিল, যা পরবর্তীতে পহেলা বৈশাখের অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গে পরিণত হয়। ২০১৬ সালের ৩০ নভেম্বর ইউনেস্কো এটিকে বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের স্বীকৃতি দেয়, যা বাঙালির ঐতিহ্যকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরে।
কিন্তু সময়ের আবর্তে এই প্রাণের উৎসব আজ অনেকাংশে আনুষ্ঠানিকতায় পর্যবসিত হয়েছে। পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে আয়োজিত মেলা বা কনসার্টগুলো এখন অনেক ক্ষেত্রেই বাণিজ্যিক রূপ নিয়েছে। হারিয়ে যাচ্ছে চিরায়ত সংস্কৃতির সেই স্বতঃস্ফূর্ততা। এককালের ‘শুভ হালখাতা’ আজ অনেকাংশে শুধু অর্থনৈতিক লেনদেনের আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। মঙ্গল শোভাযাত্রার মতো আয়োজনও তার মূল তাৎপর্য হারিয়ে বাহ্যিকতায় আবদ্ধ হয়ে পড়েছে। আর পান্তা-ইলিশ খাওয়াও যেন ক্রমে একটি সাময়িক ফ্যাশনে পরিণত হচ্ছে। ফলে স্বতঃস্ফূর্তভাবেই প্রশ্ন জাগে- আমাদের সেই আদি ও অকৃত্রিম গ্রামীণ সংস্কৃতি আজ কোথায়?
আধুনিকতার ছোঁয়ায় পহেলা বৈশাখ আজ আমূল পরিবর্তিত। সময়ের সঙ্গে সংস্কৃতির পরিবর্তন স্বাভাবিক, তবে সেই পরিবর্তনে ভারসাম্য থাকা জরুরি। আমাদের প্রয়োজন আধুনিকতা ও ঐতিহ্যের এক সুষম মেলবন্ধন। পহেলা বৈশাখকে আমাদের এমনভাবে উদযাপন করা উচিত, যা শুধু বাহ্যিক জৌলুসে সীমাবদ্ধ না থেকে আমাদের হাজার বছরের শেকড়, চেতনা ও প্রকৃত পরিচয়কে গর্বের সঙ্গে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরতে পারে। তবেই পহেলা বৈশাখ হয়ে উঠবে প্রাণবন্ত।
মো. আমিনুর রহমান
শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
