জ্বালানি সংকট : দীর্ঘস্থায়ী হলে কী কী অসুবিধা

মুহাম্মদ জামাল উদ্দিন

প্রকাশ : ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

একটি দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি সম্পূর্ণ জ্বালানি তেল, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের উপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশের জ্বালানি খাত আমদানিনির্ভর। মোট জ্বালানির ৬৫ শতাংশই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। গত ১ মাস ধরে আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকায় জ্বালানি তেলের সংকট এখন বিশ্বব্যাপী চরম আকার ধারণ করেছে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা হরমুজ প্রণালীতে তেলবাহী নৌযান চলাচলে ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় ২০ শতাংশ সরবরাহ হয় হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের মাধ্যমে। এটি পারস্য উপসাগরে যাওয়ার একমাত্র সামুদ্রিক প্রবেশপথ। ইরানের হুমকির কারণে হরমুজ প্রণালীতে আমদানি বন্ধ থাকায় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এরইমধ্যে আমেরিকা ইসরায়েল- ইরানযুদ্ধ বন্ধের জন্য পাকিস্তান যে উদ্যোগ নিয়েছিল তা উভয় পক্ষের মধ্য সমঝোতা না হওয়ার ভেস্তে গেছে। যার কারণে অনেকে যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী রূপ নেওয়ার আশংকা প্রকাশ করেছেন। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে একদিকে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের দাম বাড়ছে; অন্যদিকে সরবরাহ নিয়েও তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। দুশ্চিন্তায় পড়েছে বাংলাদেশের মত অনুন্নত দেশগুলো। মূল্যবৃদ্ধি স্থায়ী এবং সরবরাহে সংকট তৈরি হলে বাংলাদেশেও ঘাটতি তৈরি হতে পারে, দাম বেড়ে যেতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল-ইরানে হামলা শুরুর পর ইরান পাল্টা জবাব দিচ্ছে। এতে অনেকটা অচল হয়ে গেছে বৈশ্বিক জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম পথ ইরানের হরমুজ প্রণালী। হামলার পর তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) উৎপাদন ও রপ্তানি বন্ধ করে দিয়েছে কাতার। অন্যদিকে ইরানের ড্রোন হামলার পর সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি সৌদি আরামকো তাদের সবচেয়ে বড় শোধনাগার রাস তানুরা সতর্কতার অংশ হিসেবে বন্ধ করে দিয়েছে। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ সূত্র বলছে, দেশের জ্বালানি তেলের প্রায় শতভাগ আমদানিনির্ভর। এর মধ্যে অপরিশোধিত জ্বালানির পুরোটা আসে সৌদি আরব ও আরব আমিরাত থেকে। তবে পরিশোধিত জ্বালানি আসে বিভিন্ন দেশ থেকে। এ ছাড়া দেশের গ্যাস চাহিদার ৩৫ শতাংশ পূরণ করে আমদানি করা এলএনজি, যার বেশির ভাগ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। যুদ্ধের কারণে আমদানি নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানি তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলার ছাড়াতে পারে। বর্তমানে বিশ্ববাজারে এলএনজির দাম ২০ থেকে ২৫ শতাংশ বেড়ে গেছে। সেই সঙ্গে বিশ্বের প্রধান মুদ্রাগুলোর বিপরীতে মার্কিন ডলারের দাম বেড়েছে, যা জ্বালানি আমদানির খরচ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। অন্যদিকে কয়েকটা দেশ থেকে যে অল্প পরিমাণ তেল আমদানি করা হচ্ছে তার মূল্য অনেক বেশি। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পেয়েছে। গত ফেব্রুয়ারিতে সিঙ্গাপুর এইচএফওর দাম ছিল প্রতি মেট্রিক টন ৪৪৯ মার্কিন ডলার, যা মার্চের প্রথম সপ্তাহে বেড়ে দাঁড়ায় ৯৪১ ডলারে। অর্থাৎ, ১ মাসের কম সময়ে দাম বেড়েছে প্রায় ১০৯ শতাংশ। দেশের অর্থনীতি আগে থেকেই মন্দায় আক্রান্ত। মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে এ মন্দা আরও প্রকট আকার ধারণ করেছে। এতে একদিকে ভোক্তার আয় কমেছে অন্যদিকে যুদ্ধের প্রভাবে পরিবহন খরচসহ নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে। এতে কঠিন চাপের মুখে পড়েছে ভোক্তা। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের অবস্থা এখন সবছেয়ে নাজুক পরিস্থিতিতে রয়েছে। বিভিন্ন খাতে খরচ কমিয়ে বাধ্য হয়ে তাদের জীবনযাত্রার মান কমাতে হচ্ছে। এর মধ্য খাদ্যে মূলস্ফীতি ৮ দশমিক ২৪ শতাংশ। অর্থাৎ, গত বছরের মার্চের তুলনায় চলতি বছরের মার্চে খাদ্যপণ্যের দাম বেড়েছে গড়ে ৮ দশমিক ২৪ শতাংশ। মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের ব্যয় বাড়ছে। সেই ব্যয় বৃদ্ধি সমস্যা সৃষ্টি হত না, যদি একই হারে আয় বাড়ত। এক্ষেত্রে মানুষ টিকে থাকার জন্য সঞ্চয় ভেঙে অথবা ঋণ করে খাচ্ছে। তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় আমদানি ব্যয়ও বৃদ্ধি পেয়েছে। পাশাপাশি জাহাজ বাড়া বেড়েছে প্রায় ৬০ শতাংশ। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দামও বাড়তে শুরু করেছে। গত ফেব্রুয়ারিতে চট্টগ্রাম বন্দর হতে ইউরোপের বিভিন্ন বেস পোর্টে একটি ৪০ ফুট কনটেইনার পরিবহনের ভাড়া ছিল ১৭০০ ডলার। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বর্তমানে একই

পরিবহনে খরচ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৪০০ ডলার।

জ্বালানির দাম বৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে একই সঙ্গে বাড়ছে পণ্য পরিবহন খরচ। এই অস্থিরতা থেকে বাদ যাচ্ছে না আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যও। কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে অস্থিরতা আরও বাড়তে পারে। এদিকে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ ও ঋণপ্রবাহ সর্বনিম্নে পৌঁছেছে। এতে নতুন কর্মসংস্থান যেমন হচ্ছে না, তেমনি বিদ্যমান কর্মও ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। এতে আয় কমার পাশাপাশি বেকারত্ব ও বাড়ছে। যা মানুষের জীবনযাত্রাকে আরও নিম্নমুখী ও কঠিন করে তুলছে। দেশের চলমান জ্বালানি সংকট মানুষের আয় ও ব্যয়ের উপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। আয় কম কিন্তু ব্যয় বেশি- এই দ্বৈত চাপে সাধারণ মানুষ অনেকটা দিশাহারা। কর্মসংস্থানের সবছেয়ে বড় খাত ক্ষুদ্র ও মাজারি শিল্পের বেশ কিছু কারখানা এরইমধ্যে বন্ধ ও আংশিক চালু রয়েছে। এতে শ্রমিকরা চাকরি হারাচ্ছে। কমে যাচ্ছে রাস্তায় যানবাহন। এর ফলে চালক ও সংশ্লিষ্ট শ্রমিকদের আয়ও কমছে। পরিবহন খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় যাতায়াত খরচ বৃদ্ধি পাচ্ছে। দেশে শিল্প উৎপাদনে সবছেয়ে বেশি জ্বালানির প্রয়োজন হয় গার্মেন্টস, টেক্সটাইল, সিমেন্ট, স্টিল, সিরামিকসহ সব রকম কারখানায় বিদ্যুৎ, গ্যাস ও ডিজেল লাগে। পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহের অভাবে এর উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। যার ফলে বিদেশে রপ্তানির পরিমাণ কমে যাচ্ছে। দেশের নির্মাণ খাতের মধ্য রড-সিমেন্ট, ইটভাটা ও নির্মাণ যন্ত্রপাতি অন্যতম। এই সবকিছুই জ্বালানিনির্ভর। জ্বালানি সংকটে রড সিমেন্ট, টাইলস, ইট উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে তেলে সরকার রেশনিং আরোপ করেছে। সরকারের তরফ হতে বলা হচ্ছে দেশে পর্যাপ্ত তেলের মজুত রয়েছে। অথচ পেট্রোল পাম্পে গিয়ে লাইনের পর লাইন ধরে কাঙ্ক্ষিত তেল ক্রয় করতে পারছে না।

এছাড়া সিন্ডিকেটের কারণে চাহিদা অনুযায়ী তেল পাওয়া যাচ্ছে না। বিশেষ করে গ্রামে বাড়তি দরে তেল বিক্রি হচ্ছে। ট্রাক ভাড়া আগের তুলনায় ৫-৭ হাজার টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। পাশাপাশি অন্যান্য পরিবহন খরচও বৃদ্ধি পেয়েছে। মাছ-মাংস, মুরগি ও নিত্যপণ্যের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধি পাওয়ায় সবজি থেকে শুরু করে সব পণ্যের দাম বেড়ে গেছে। অসাধু ব্যবসায়ীরা এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে কিছু পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন। গত কয়েকদিনে রান্নার গ্যাসের বাজারে সবছেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে। এপ্রিল মাসে ১২ কেজি এলপিজির দাম একলাফে ৩৮৭ টাকা বাড়িয়ে ১৭২৮ টাকা নির্ধারণ করেছে। তবে বাস্তবে বাজারে ২ হাজার টাকার নিচে গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে না।

দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি তেলের সংকট হলে সর্বপ্রথম মিল-কলকারখানা বন্ধ হয়ে যাবে। মিল কলকারখানা বন্ধ হয়ে গেলে মানুষের কর্মসংস্থান কমে যাবে। দেশ-বিদেশে বেকার সংখ্যা মারাত্মক হারে বৃদ্ধি পাবে। তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পর্যায়ক্রমে বিদ্যুৎ তৈরি করতে না পেরে উৎপাদন বন্ধ করে দিবে। যখন অফিস আদালত ও মানুষের ঘরে বিদ্যুৎ থাকবে না। তখন সারা দেশে এক অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি হবে। জিনিষপত্রের দাম আকাশছোঁয়া হবে। বিশেষ করে খাদ্যপণ্যের দাম মারাত্মক হারে বৃদ্ধি পেতে থাকবে। যার ফলে আস্তে আস্তে সবকিছু অচল হয়ে যাবে। বর্তমানে বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের সংকটের কারণে বহু সংখ্যক কারখানার উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। আমাদের দেশে অতিরিক্ত জ্বালানি তেল আমদানির প্রধান কারণ হচ্ছে শিল্প ও পরিবহন সেক্টরে জ্বালানির চাহিদা পূরন। পরিবহন সেক্টরে যানবাহন চালাতে আমাদের প্রচুর জ্বালানির দরকার হয়। এই খাতে সর্বোচ্চ চাহিদা মিটিয়ে যানবাহন চলাচল সচল রাখতে হয়। বাংলাদেশে দৈনিক জ্বালানি তেলের চাহিদা প্রায় ২ লাখ ৬০ হাজার থেকে ২ লাখ ৮৮ হাজার ব্যারেল (প্রতি ব্যারেল ১৫৯ লিটার)। তবে মেট্রিক টনের হিসেবে, দেশে দৈনিক প্রায় ১৪ হাজার টন জ্বালানি তেলের প্রয়োজন হয়। এর মধ্যে চাহিদার সিংহভাগই ডিজেল ব্যবহৃত হয়। পরিবহন সেক্টরে পর্যাপ্ত জ্বালানির যোগান দিতে না পারলে দেশের মধ্য অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি হবে। বিশেষ করে মানুষ স্কুল-কলেজ, অফিস-আদালত এবং কর্মস্থলে যাওয়া আসা করতে পারবে না। পণ্য পরিবহনে সংকট সৃষ্টি এবং আমদানি-রপ্তানি বন্ধ হওয়ার আশংকা রয়েছে।

আমদানি-রপ্তানি ও ব্যবসা বাণিজ্য বন্ধ হয়ে গেলে রিজার্ভের উপর চাপ সৃষ্টি হবে। দেশজুড়ে প্রাকৃতিক গ্যাসের তীব্র সংকট ও বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতায় দেশের কৃষি অর্থনীতিতে কালো ছায়া নেমে এসেছে। বর্তমানে দেশের বৃহত্তম ৬টি ইউরিয়া সার কারখানার মধ্য ৫টিরই উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে। চলমান গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদন চালু রাখা সম্ভব হচ্ছে না। এতে করে বোরো মৌসুমে ইউরিয়া সারের সংকট সৃষ্টির আশংকা রয়েছে। সার সংকটে খাদ্য নিরাপত্তার উপরও প্রভাব ফেলতে পারে। জ্বালানি সংকটের কারণে কৃষি পণ্য পরিবহনেও সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। পরিবহন ভাড়া বেড়েছে লাগামছাড়া, খেতে পচে যাচ্ছে ফসল। যথাসময়ে মাঠের ফসল বাজারে পৌঁছাচ্ছে না। যার কারণে কৃষক পাচ্ছে না উৎপাদন খরচও। চাপে রয়েছে পোলট্রি, দুগ্ধ ও মৎস খাত। এমন পরিস্থিতিতে দেশের কৃষি অর্থনীতির জন্য অশনিসংকেত হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। বাংলাদেশে দ্রুত জ্বালানি সমস্যার সমাধান করা না হলে সবছেয়ে বড় আঘাত আসবে সরকারি-বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে। বাংলাদেশের অধিকাংশ বিদ্যুৎকেন্দ্র হচ্ছে ফার্নেস অয়েল, গ্যাস ও কয়লাভিত্তিক। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে পর্যাপ্ত জ্বালানি তেল ও গ্যাস সরবরাহ করতে না পারলে উৎপাদনে যেতে পারবে না।

গত ১৪ তারিখ আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধির অযুহাতে ফার্নেস অয়েলের দাম একলাপে ৩৫ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। সর্বশেষ সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রতি লিটার ফার্নেস অয়েলের দাম ৭০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৯৪ টাকা ৬৯ পয়সা নির্ধারণ করেছে। দেশে ফার্নেস অয়েলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় বিদ্যুৎ খাত ও সামগ্রিক শিল্প অর্থনীতিতে নতুন চাপ সৃষ্টি হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন ব্যয় বাড়লে তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত খুচরা বিদ্যুতের দাম, শিল্প উৎপাদন ব্যয় এবং বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে প্রতিফলিত হবে। বর্তমানে বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকির চাপ উল্লেখযোগ্য এবং পিডিবি এরইমধ্য বড় অঙ্কের লোকসানে রয়েছে। এই অবস্থায় উৎপাদন ব্যয় বাড়লে সরকারকে হয় ভর্তুকি বাড়াতে হবে, নয়তো পাইকারি ও খুচরা বিদ্যুতের দাম সমন্বয়ের পথে যেতে হবে। ভয়ংকর খবর হচ্ছে, আমেরিকাণ্ডইরান যুদ্ধের দেড় মাস পার হতেই গত ১৪ তারিখে বাংলাদেশের একমাত্র তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারী তেলের অভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। আমেরিকাণ্ডইরানযুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে বিদেশে ব্যবসা-বাণিজ্য ও কর্মসংস্থান বন্ধ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এতে করে বিদেশে বসবাসরত শ্রমিকদের ছাঁটাই হওয়ার সম্ভবনা রয়েছে। প্রবাসে কর্মরত শ্রমিকদের ছাঁটাই করা হলে প্রবাসী আয় কমে যাবে এবং রিজার্ভ হ্রাস পাবে।

অর্থনীতিবিদ আবু আহমেদ বলেন, জ্বালানি এমন একটি পণ্য, যার সঙ্গে দেশের সবকিছুর সম্পৃক্ততা রয়েছে। এ অবস্থায় জ্বালানি সংকট দেশের অর্থনীতিকে আরও বিপর্যস্ত করে তুলবে। যুদ্ধ না থামলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে। এরমধ্যে ঋণের ফাঁদে পড়েছে দেশ। বর্তমানে বিদেশি ঋণ রয়েছে ১১৫ বিলিয়ন ডলার। এছাড়া বাজেট ঘাটতি মোকাবিলায় সরকারকে বিশাল অংকের ঋণ নিতে হচ্ছে। যার অন্যতম একটি কারণ হলো- বড় অঙ্কের সুদ পরিশোধের চাপ। সরকার ক্ষমতা গ্রহণের দেড় মাস সময়ে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ঋণ নিয়েছে ৪১ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে রাজস্ব বাজেটের ৭০ শতাংশই সরকারের পরিচালন ব্যয়ে চলে যাচ্ছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারকে পরিচালন ব্যয় কমাতে হবে এবং জ্বালানি ব্যবহারে সাশ্রয়ী হতে হবে। বৈশ্বিক সংকটের কারণে জ্বালানির যে সংকট তার আঁচ বাংলাদেশকেও স্পর্শ করেছে।

কিন্তু এতে জনগণ যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয় তার জন্য সরকারকে দুরদর্শী পদক্ষেপ নিতে হবে। ভবিষ্যতে তেলের দাম আরও বৃদ্ধি করা হলে ভোক্তার ওপর আরও চাপ বেড়ে যাওয়ার আশংকা রয়েছে। তাই জ্বালানির দাম অতিরিক্ত বৃদ্ধি না করে বিকল্প উপায়ে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে। জ্বালানি ডিপো, ফিলিং স্টেশন ও ব্যক্তিগত গুদামে একযোগে অভিযান পরিচালনা করে অবৈধ মজুত ও কালোবাজারি নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি সংকট নিরসনে তড়িৎ গতিতে জ্বালানি তেল সরবরাহ এবং নতুন গ্যাস থেকে পর্যাপ্ত গ্যাস উত্তোলনের উদ্যোগ নিতে হবে। গ্যাস উত্তোলন ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। এরইমধ্যে লোডশেডিং বেড়েছে, আরও প্রকট হতে পারে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট। এখনই কঠোর, দৃশ্যমান ও সমন্বিত ব্যবস্থা নেওয়া না হলে এ কৃত্রিম সংকট দ্রুত জাতীয় অর্থনীতি, কৃষি উৎপাদন ও জনজীবনে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করবে।

মুহাম্মদ জামাল উদ্দিন

প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট