কৃষিজমি দখল ও শিল্পায়নের নামে গ্রাম উচ্ছেদ

মোছা. রাতিয়া খাতুন

প্রকাশ : ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

উন্নয়ন ও শিল্পায়নের নামে দেশে যে অগ্রযাত্রার কথা বলা হচ্ছে, তার আড়ালে লুকিয়ে আছে এক ভয়াবহ বাস্তবতা। পরিকল্পনাহীন শিল্পায়নের ফলে প্রতিদিনই উর্বর কৃষিজমি দখল হচ্ছে, উচ্ছেদ হচ্ছে গ্রাম ও গ্রামীণ মানুষ। এই প্রক্রিয়া শুধু কৃষিকে দুর্বল করছে না, বরং দেশের খাদ্যনিরাপত্তা ও সামাজিক ভারসাম্যকেও চরম ঝুঁকির মুখে ফেলছে। বাংলাদেশ কৃষিনির্ভর দেশ এই সত্য আজও অস্বীকার করার উপায় নেই। দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠীর জীবিকা কৃষির ওপর নির্ভরশীল। অথচ সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শিল্পকারখানা, আবাসন প্রকল্প ও বাণিজ্যিক স্থাপনা গড়ে তুলতে নির্বিচারে কৃষিজমি দখল করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে জমি অধিগ্রহণে আইন ও নীতিমালার কোনো তোয়াক্কা করা হয় না। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক পরিবারগুলো ন্যায্য ক্ষতিপূরণ তো পাচ্ছেই না, বরং পুনর্বাসনের প্রশ্নেও অনিশ্চয়তায় ভুগছে।

শিল্পায়নের নামে গ্রাম উচ্ছেদের ফলে ভেঙে পড়ছে গ্রামীণ সমাজব্যবস্থা। শত বছরের বসতভিটা হারিয়ে মানুষ হয়ে পড়ছে ভূমিহীন ও জীবিকাহীন। কৃষিকাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে অনেকেই বাধ্য হচ্ছে অনিশ্চিত শহুরে জীবনে পা রাখতে। এর পরিণতিতে বাড়ছে বেকারত্ব, দারিদ্র্য ও সামাজিক বৈষম্য।

এই সংকটের সবচেয়ে দুঃখজনক দিক হলো প্রশাসনের ভূমিকা। কৃষিজমি দখল ও উচ্ছেদের অভিযোগ নতুন নয়, কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রশাসন নীরব দর্শকের ভূমিকায় অবতীর্ণ থাকে। কোথাও কোথাও প্রভাবশালীদের চাপ কিংবা স্বার্থ প্রশাসনিক দায়িত্বকে আড়াল করে ফেলে। অভিযোগ জানানো হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার নজির খুব কম। ফলে দখলদাররা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা ক্ষয়ে যাচ্ছে। কৃষিজমি ধ্বংসের প্রভাব শুধু বর্তমান প্রজন্মেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে আবাদযোগ্য জমি কমে যাওয়ার এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে খাদ্য আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়বে। এতে করে জাতীয় অর্থনীতি ও খাদ্যনিরাপত্তা উভয়ই চরম ঝুঁকিতে পড়বে।

শিল্পায়ন প্রয়োজন, তবে তা হতে হবে পরিকল্পিত ও দায়িত্বশীল। অনাবাদি বা কম উর্বর জমিতে শিল্প স্থাপন, কৃষিজমি সুরক্ষা আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ, ক্ষতিগ্রস্তদের ন্যায্য ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে প্রশাসনের জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।

উন্নয়ন মানে শুধু কারখানা বা কংক্রিটের অবকাঠামো নয়। উন্নয়ন মানে মানুষের জীবনমানের উন্নতি, খাদ্যের নিশ্চয়তা এবং গ্রামবাংলার টিকে থাকা। কৃষিজমি দখল ও গ্রাম উচ্ছেদের বিনিময়ে যে উন্নয়ন আসে, তা দীর্ঘমেয়াদে দেশের জন্য আশীর্বাদ নয় বরং গভীর সংকটেরই ইঙ্গিত দেয়।

মোছা. রাতিয়া খাতুন

শিক্ষার্থী দর্শন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়