অনলাইন ক্লাস : দরিদ্ররা মোবাইল পাবে কোথায়
জিহাদ হোসেন রাহাত
প্রকাশ : ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
ইকরাম মাঝি (ছদ্মনাম) দেশের দক্ষিণের জনপদ লক্ষ্মীপুরের রায়পুরের প্রত্যন্ত চরাঞ্চলের বাসিন্দা। বছর তেরো বয়সী ছেলেটি বাবা দুখু মাঝি আর মা মাহমুদের নেছার একমাত্র সন্তান। নদীতে মাছ ধরেই চলে তাদের সংসার। দিনে এনে দিনে খাওয়া পরিবারের ইকরাম পড়াশোনা করে স্থানীয় একটি মাধ্যমিক স্কুলের অষ্টম শ্রেণিতে। ঠিকঠাকই চলছিল তার পড়াশোনা। বিপত্তি বাঁধে সরকারের নেওয়া এক সিদ্ধান্তে। সপ্তাহে তিনদিন হবে অনলাইন ক্লাস এই ভাবনায়, মেধাবী ইকরাম পড়ে যায় দুশ্চিন্তায়। বাবার কাছে বাটন ফোন থাকলেও নেই স্মার্টফোন। ফলে তিনদিন সশরীরে ক্লাসে গেলেও বাকি তিন দিন থাকতে হয় ঘরে বসে। একদিন পর একদিন ক্লাস হওয়া এবং অনলাইন ক্লাসে উপস্থিত থাকতে না পারায় ধারাবাহিক পড়াশোনা থেকে বঞ্চিত সে। তার বন্ধুদেরও একই হাল।
শুধু ইকরাম কিংবা তার বন্ধুরা নয়। এই চিত্র দেশের লাখো শিক্ষার্থীর। একদিকে বিশ্ব অর্থনীতি থমকে আছে মধ্যপ্রাচ্যের গরম ভূরাজনীতির কারণে চলছে যুদ্ধ। অন্যদিকে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে সৃষ্টি হয়েছে সংকট। যার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশেও। নিরুপায় হয়ে মোটা অঙ্কের ভর্তুকি দিয়ে এই সংকট কাটিয়ে উঠার চেষ্টা করছে সরকার। যার দরুণ, অতিরিক্ত ভর্তুকির মাসুল গোনাতে হচ্ছে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা ও খাত ভিত্তিক বরাদ্দ থেকে। চলমান বাস্তবতায় সরকার যে জ্বালানি নীতি প্রয়োগ করছে তার যথাযথ মনিটরিং না থাকায় কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। এতে জ্বালানি সাশ্রয়ে সরকারের নেওয়া পদক্ষেপে প্রথম বলি হচ্ছে, দেশের শিক্ষাখাত। একই সঙ্গে রোডম্যাপ, কার্যকারিতা যাচাই ছাড়া হুটহাট নেওয়া সপ্তাহে তিনদিন অনলাইন ক্লাসের সিদ্ধান্তে নাখোশ সবাই।
কভিড-১৯ সময়কার ধকল এখনও কাটিয়ে উঠতে পারেনি শিক্ষার্থীরা। যে এসএসসি পরীক্ষা ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা সেটি একই কারণে ২০২৬ সালে এসেও হচ্ছে এপ্রিলের শেষার্ধে। ফলে বলার অপেক্ষা রাখে না, অপূরণীয় শিখন ক্ষতির রেশ রয়ে গেছে আজও। তাছাড়া বিগত বছরগুলোয়, বন্যা, নানা দাবিতে সড়ক অবরোধ, গণআন্দোলন, শৈত্যপ্রবাহ, সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচন, রমজান, ঈদ ও পহেলা বৈশাখ ঘিরে একের পর এক ছুটি ছিল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোয়। এতো কিছুর পর এবার জ্বালানি সংকটের দোহাই দিয়ে সপ্তাহে তিনদিন বন্ধ থাকবে সশরীরে পাঠদান।
উদ্ভুত পরিস্থিতিতে সব তর্কের পর একটি তর্ক রয়েই যায়, আর সেটি হলো- বন্ধের তিন দিনে অনলাইন ক্লাসের যে উপকরণ দরকার শিক্ষার্থীদের তা শহরাঞ্চলে হাতের নাগালে থাকলেও অজপাড়াগাঁয়ে সহজলভ্য না। দেশের মোট শিক্ষার্থীর একটি বড় অংশ দরিদ্র পীড়িত পরিবারের সদস্য। তারা মোবাইল বা ইলেকট্রনিক ডিভাইস কোথা থেকে সরবরাহ করবে সরকারের সেটিও ভাব উচিত।
বিশাল সংখ্যার এই পড়ুয়ারা তিনদিন অনলাইন ক্লাসে অংশ নিতে না পারলে পড়ার ঘাটতি কিভাবে পুষিয়ে উঠবে তা নিয়েও ভাবা দরকার আমাদের। এখন অবস্থা হয়েছে এমন, সর্বাঙ্গে ব্যাথা মলম দিব কোথা? ইন্টারনেটের চওড়া মূল্য, গ্রামাঞ্চলে শতভাগ ওয়াইফাই না পৌঁছানোসহ নানা সমস্যায় জর্জরিত পুরো দেশ।
এসব সমস্যার মধ্যে আরেকটি বিড়ম্বনার নাম এই অনলাইন ক্লাস। বিড়ম্বনা এই কারণে, দরিদ্র পীড়িত পরিবারের ছাত্র ছাত্রীরা এই ক্লাস থেকে বঞ্চিত। আর যারা ক্লাস করার সুযোগ পাচ্ছে তাদের বেশিরভাগই ডিজিটাল হাজিরার জন্য হচ্ছে উপস্থিত। পড়ায় মন বসছে না অধিকাংশের। এমন দৃশ্য হরহামেশাই উঠে আসে গণমাধ্যমে।
জ্বালানির অজুহাতে অনলাইন ক্লাসের যে কথা বলা হচ্ছে, তার গাণিতিক ভিত্তি একেবারেই কাঁচা। এক্ষেত্রে জ্বালানি সংকট কাটাতে দেশে মাত্রাতিরিক্ত বিদুৎচালিত অটোরিকশার লাগাম টানতে পারতো সরকার। বহিঃবিশ্বে আর যাই হোক এমন ঠুনকো অজুহাতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয় না। করোনা মহামারিতেও আমরা দেখেছি বিশ্বের বিভিন্ন দেশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করেছে ঠিকই কিন্তু খুলে দিয়েছে সবার আগে।
জ্বালানি সংকটে এভাবে স্কুল বন্ধ রেখে অনলাইন ক্লাসে যাওয়ার নজির বিশ্বে খুব একটা নেই। নেই এই জন্য, কারণ তারা অনলাইন ক্লাসে গেলেও আগে সব শিক্ষার্থীর দোরগোড়ায় ইলেকট্রনিক ডিভাইস ও ইন্টারনেট পৌঁছে তারপর এমন সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। অথচ বাংলাদেশে এর উল্টোরথ। তাই সরকারের উচিত এ ধরনের সিদ্ধান্তের আগে সম্ভাব্যতা, বাস্তবায়ন যোগত্যাসহ সামগ্রিক পরিবেশ যাচাই করা। নয়তো সিদ্ধান্ত সুফল নয়, বয়ে আনবে, খেলা রঙের ঢং।
জিহাদ হোসেন রাহাত
শিক্ষার্থী, জার্নালিজম অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ, মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি
