হামের প্রাদুর্ভাব ও আমাদের স্বাস্থ্য সচেতনতা : সময়োচিত পদক্ষেপ জরুরি
প্রকাশ : ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শিশুদের মধ্যে হামের (Measles) সংক্রমণ নতুন করে দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে দুর্গম অঞ্চল এবং শহুরে বস্তি এলাকাগুলোতে এই প্রাদুর্ভাব বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এক সময় মনে করা হয়েছিল হাম বাংলাদেশ থেকে প্রায় নির্মূল হয়ে গেছে; কিন্তু বর্তমান পরিসংখ্যান বলছে- সচেতনতার অভাব এবং টিকাদান কর্মসূচিতে সাময়িক শিথিলতা আমাদের শিশুদের আবারও ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাল রোগ, যা মূলত বায়ুর মাধ্যমে ছড়ায়। এর প্রাথমিক লক্ষণ সাধারণ জ্বর ও সর্দি মনে হলেও, সঠিক সময়ে চিকিৎসা না পেলে এটি মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে। হামের জটিলতা হিসেবে নিউমোনিয়া, মস্তিষ্কের প্রদাহ (এনসেফালাইটিস), এমনকি অন্ধত্বও দেখা দিতে পারে। অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের জন্য এই রোগ অনেক সময় প্রাণঘাতী হয়ে দাঁড়ায়।
হামের প্রাদুর্ভাব বাড়ার পেছনে বেশ কিছু কারণ বিদ্যমান-
টিকাদানে অনীহা ও গ্যাপ : অনেক সময় অভিভাবকরা প্রথম ডোজ দেওয়ার পর দ্বিতীয় ডোজটি (এমআর টিকা) দিতে ভুলে যান বা গুরুত্ব দেন না।
ভুল ধারণা : অনেক গ্রামীণ এলাকায় হামকে ‘মায়ের দয়া’ বা আধ্যাত্মিক কোনো উপসর্গ মনে করে কবিরাজি চিকিৎসা করানো হয়, যা পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে।
জলবায়ু ও জনঘনত্ব : বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশে খুব দ্রুত এক শিশু থেকে অন্য শিশুর দেহে এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে।
হাম প্রতিরোধের একমাত্র কার্যকর উপায় হলো সময়মতো টিকা গ্রহণ। সরকারের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (EPI) অনুযায়ী ৯ মাস এবং ১৫ মাস বয়সে দুই ডোজ এমআর টিকা নিশ্চিত করতে হবে। কোনো কারণে শিশু টিকা না পেয়ে থাকলে নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যোগাযোগ করে দ্রুত টিকাদানের ব্যবস্থা করতে হবে। এছাড়া, সংক্রমণের লক্ষণ দেখা দিলে রোগীকে দ্রুত আইসোলেশনে রাখতে হবে যাতে অন্য শিশুরা আক্রান্ত না হয়। আক্রান্ত শিশুকে প্রচুর তরল খাবার, ভিটামিন-এ সমৃদ্ধ খাবার এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ সেবন করানো জরুরি।
একটি সুস্থ ও সবল ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়ে তোলার জন্য হামমুক্ত বাংলাদেশ অপরিহার্য। শুধু সরকারি উদ্যোগ বা টিকাদান কর্মসূচি দিয়ে এই রোগ নির্মূল করা সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন ব্যাপক সামাজিক সচেতনতা। প্রতিটি শিশুকে টিকার আওতায় আনতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, ধর্মীয় নেতা এবং গণমাধ্যমকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। মনে রাখতে হবে, অবহেলা কিংবা অসচেতনতায় ঝরে পড়া একটি প্রাণও আমাদের কাম্য নয়। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা এবং সঠিক সময়ে টিকাদানই পারে আমাদের শিশুদের এই মরণঘাতী রোগ থেকে সুরক্ষা দিতে।
