চাকরির বাজারে দক্ষতার সংকট

আরাফাত নাফিজ

প্রকাশ : ১৮ এপ্রিল ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

চাকরি, আমাদের অধিকাংশ মানুষের কাছে এক সোনার হরিণের নাম। শুধু একটা চাকরির আশায় এদেশের লাখ লাখ শিশু বড় হয়ে ওঠে। জন্মের পর মাতৃভাষা রপ্তের কিছু দিনের মধ্যেই আমাদের দেশের শিশুদের নামিয়ে দেওয়া হয় এক ইঁদুর দৌড়ে। ভালো করে পড়, না হলে চাকরি পাবে না। একবার চাকরি পেলেই মিটে যাবে আমাদের সব সমস্যা। এমন হাজারো কথার মাধ্যমে আমাদের শিশুদের অবুঝ মনে গেঁথে দেওয়া হয় একটা চাকরির স্বপ্ন। আর আমরাও নেমে পরি সেই ইঁদুরদৌড়ে। বাঙালি মধ্যবিত্ত সমাজে বিশ্বাস করে যে চাকরিই পারে আমাদের সব সমস্যার সমাধান এনে দিতে। তাইতো বাংলা গান কিংবা কবিতা সবখানেই চাকরি শব্দটা যেন আলাদা করে স্থান করে নেয়।

এই যেমন অঞ্জয় দত্তের বিখ্যাত সেই গান ‘চাকরিটা আমি পেয়ে গেছি বেলা শুনছো’। গানটার মধ্যেও ফুটে ওঠেছে বাঙালি মধ্যবিত্ত শ্রেণির চিরচারিত সেই আশার প্রতিফলন। কিন্তু বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। আমাদের দেশে চাকরি যেন এক সোনার হরিণ। প্রতি বছর লাখ লাখ মানুষ চাকরির পেছনে ছুটলেও চাকরি তারা পাচ্ছে না। কিন্তু কেন? আমাদের সমাজ থেকে সংস্কৃতি সবখানেই চাকরিকে আলাদা মর্যাদা হিসাবে ধরা হলেও কেনই বা লাখ লাখ তরুণ প্রতি বছর বেকারত্বের অভিশাপ ঘোচাতে ব্যার্থ?

আমাদের তো বলা হয়েছিল ভালো করে পড়লেই আমরা ভালো চাকরি পাবো। কিন্তু পরিসংখ্যানে নজড় দিলে তো দেখা যায় ঠিক অন্য দৃশ্য। এক প্রতিবেদন অনুযায়ী আমাদের দেশের গ্রাজুয়েট বেকারত্বের হার প্রায়ই ১৩.৫% (The daily Star)। অর্থাৎ উচ্চ শিক্ষিত হয়েও প্রতি বছর একটা বিশাল সংখ্যক শিক্ষার্থী বেকারত্ব ঘোচাতে ব্যার্থ। এছাড়া সব মিলিয়ে প্রায়ই আমাদের জনসংখ্যার প্রায়ই ৪.৭০ শতাংশ মানুষ বেকার।

(Trading Economics)। এত বৃহৎ সংখ্যক লোকের বেকারত্বের সবচেয়ে বড় কারণ দক্ষতার সংকট। আমাদের দেশের বর্তমানে সবচেয়ে বৃহৎ খাত হিসাবে গুরুত্ব দেওয়া হয় শিল্প খাতকে। আর সেখানে দক্ষ লোকের সংকট প্রায়ই ৩০% (The Bussiness Standards), কোনো কোনো খাতে এই গ্যাপ প্রায়ই ৪৫-৭০ শতাংশের কাছাকাছি। চোখ কপালে ওঠার মতো তথ্য হলো অনেক ক্ষেত্রেই দক্ষ লোকের অভাবে চাকরি থাকলেও পাওয়া যায় না যোগ্য প্রার্থী। এতসব সমস্যার কথার মূল কারণ এক কথায় বললে ডিগ্রি আছে, স্কিল নাই। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত রিপোর্ট থেকে জানা যায় চাকরিদাতাদের কিছু অভিযোগের কথা। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো, কমিউনিকেশন দূর্বলতা, সফট স্কিল না থাকা ও সমস্যা সমাধানে দক্ষতা না থাকা।

আমাদের দেশের পড়াশোনা এখনও আদিম আমলের মতো মুখস্থ নির্ভরই থেকে গেছে। হাতে-কলমে শেখানো শিক্ষা ব্যাবস্থা এখনও অতি সামান্য থেকে নগণ্য। ফলে বছর পর বছর নতুন নতুন গ্রাজুয়েট আসছে কিন্তু তারা শুধু সার্টিফিকেট নিয়েই বের হচ্ছে তেমন কোনো স্কিল না শিখেই। ফলে বিশ্ব চাকরির বাজারেও তারা টিকে থাকতে পারছে না। বাস্তবমুখী শিক্ষা ব্যবস্থার যে বিশাল অভাব রয়েছে তা হরহামেশাই স্বীকার করা হলেও এর সমাধানের কার্যকর পদক্ষেপ নিতে দেখা যায় না। আবার বিশ্ব প্রযুক্তি এখন আগের থেকে আরও দ্রুত পরিবর্তনশীল। সুতরাং নতুন নতুন প্রযুক্তির জ্ঞান আহরণ করে বিশ্ব চাকরি বাজারে টিকে থাকতেও তারা ব্যার্থ হচ্ছে। চাকরির বাজারে দক্ষ লোক না পেয়ে অনেক প্রতিষ্ঠানই বাধ্য হয়ে বিদেশী দক্ষ কর্মী নিয়োগ করছে। এতে একদিকে যেমন বাড়ছে আমাদের দেশের বেকারত্ব আরেকদিকে আমাদের দেশের অর্থনীতিতেও ফেলছে বিরাট প্রভাব। এছাড়াও সরকারি চাকরির চাকচিক্য দেখে অনেকেই সেই পথে হাটেন। সেটা সমস্যা নয় কিন্তু সমস্যা তখনই হয়ে দাঁড়ায় যখন সরকারি চাকরির মুখস্থ বিদ্যা অর্জনের চেষ্টায় যুব সমাজের বিশাল একটা অংশ শুধু মুখস্থ নির্ভর শিক্ষাই অর্জন করে এবং তারা তাদের জীবনের মূল্যবান সময় শুধু সেখানেই দেয়। ফলে যথাযথ দক্ষতা তার আর অর্জন করা হয় না। এছাড়াও সরকারের পক্ষ থেকেও বেকারত্বরোধের জন্য যথাযথ পদক্ষেপ নিতে দেখা যায় যতসামান্যই। উপযুক্ত প্রশিক্ষণের ব্যাবস্থা করলে আমরাও আমাদের জন সংখ্যাকে জনশক্তিতে পরিণত করতে পারি। এছাড়াও শুধু চাকরির পেছনে না ছুটে উদোক্তা তৈরী করতে পারলে দেশের অর্থনীতিতে বিশাল পরিবর্তন আনা সম্ভব।

এতসব হতাশার মধ্যেও আশার কথা হচ্ছে আমাদের দেশের তরুণরা এখন অনেক সর্তক হয়ে উঠছে। নিজেরাই ব্যক্তি উদ্যোগে প্রশিক্ষণ নিতে আগ্রহী এবং নিজেদের দক্ষতা বাড়িয়ে তুলছে। তারই এক উদাহরণ ফ্রিল্যান্সিংয়ের মাধ্যমে তারা দেশের সীমানা পেড়িয়ে বিদেশেও কাজ করছে এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে। তাই চাকরির পেছনে না ছুটে দক্ষতা অর্জন করলে চাকরিই আপনার পেছনে ছুটবে।

আরাফাত নাফিজ

বিভাগ-লোক প্রশাসন, বিশ্ববিদ্যালয়-জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়