বাঙালি মানসে সংস্কৃতিবোধের সংকট
নাজমুল ইসলাম
প্রকাশ : ১৯ এপ্রিল ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
সংস্কৃতি মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। নৃতত্ত্ববিদ ইবি টেইলরের ভাষায়, সংস্কৃতি হলো ‘সেই জটিল সমষ্টি, যার মধ্যে জ্ঞান, বিশ্বাস, শিল্প, নৈতিকতা, আইন, প্রথা এবং সমাজের সদস্য হিসেবে অর্জিত নানা অভ্যাস অন্তর্ভুক্ত’। অর্থাৎ, মানুষের চিন্তা ও জীবনযাপনের বহুমাত্রিক প্রকাশই সংস্কৃতি।
কিন্তু আজ আমাদের চিন্তায় এক বড় বিভ্রান্তি দেখা দিয়েছে : সংস্কৃতি কি স্বভাবতই বৈচিত্র্যময়, নাকি একরৈখিক হওয়া উচিত? বাস্তবতা হলো, সংস্কৃতি কখনও স্থির নয়। এটি প্রবাহমান নদীর স্রোতের মতো। সময়, সমাজ ও ভৌগোলিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে এটি বদলায়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও সংস্কৃতিকে কোনো স্থির বস্তু হিসেবে নয়, বরং মানুষের আত্মার সঙ্গে সম্পৃক্ত একটি প্রবাহমান প্রক্রিয়া হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। বাংলার মাটিতে এই প্রবাহের ধারা শত শত বছর ধরে চলছে। আমাদের ইতিহাস তার জ্বলন্ত সাক্ষী। আর্য-অনার্য-দ্রাবিড় থেকে শুরু করে তুর্কি, মোগল ও সুফি প্রভাব, সবকিছুর মিলনে গড়ে উঠেছে আমাদের সংকর ঐতিহ্য। মধ্যযুগে মুসলিম শাসকদের পাশাপাশি পীর-আওলিয়া ও আলেমগণের আগমন এই সংকরতার সবচেয়ে উজ্জ্বল উদাহরণ।
শাহ জালাল, খান জাহান আলীসহ অসংখ্য পীর-দরবেশ বাংলার মাটিতে ইসলাম প্রচার করেছিলেন স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে মিলেমিশে। ফলে স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে পীর-দরবেশের খানকাহ, মসজিদ, গজল, ওয়াজ-মাহফিল ইত্যাদি আমাদের সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। নরবলি, সতীদাহ কিংবা যৌতুক, এগুলোও একসময় ‘প্রাচীন সংস্কৃতি’র অংশ ছিল, কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে। অস্তিত্ব হারিয়েছে বাঙালি সংস্কৃতি থেকে। এই যোজন-বিয়োজনের চলমান প্রক্রিয়াতেই গড়ে উঠেছে বাঙালির সংস্কৃতি।
হাল আমলে সংস্কৃতির নামে দুটি চরম প্রবণতা দেখা দিয়েছে। একদিকে বৈচিত্র্যের অজুহাতে এমন অনেক কিছু গ্রহণ করা হচ্ছে যা সমাজের নৈতিক ভিত্তির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। অন্যদিকে একরৈখিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর সংস্কৃতিকে সবার ওপর চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতাও বাড়ছে। এই দুই প্রবণতাই সংস্কৃতির স্বাভাবিক বিকাশকে ব্যাহত করছে।
তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এই দ্বন্দ্ব সবচেয়ে তীব্র। বৈশ্বিক যোগাযোগ ও প্রযুক্তির কারণে নতুন চিন্তা, ভাষা ও প্রকাশভঙ্গির সঙ্গে তাদের পরিচয় ঘটছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে এই বৈচিত্র্যই ছিল সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র। বাংলা-ইংরেজি-আরবি-উর্দু-ফারসির মিশেলে গড়ে উঠেছিল নতুন স্লোগান, ‘তুমি কে আমি কে, রাজাকার রাজাকার’, ‘ইনকিলাব’, ‘আজাদি’, ‘ইনসাফ’। এই বহুত্ববাদী ভাষাই আন্দোলনকে গতি দিয়েছিল।
কিন্তু সেই বৈচিত্র্যকে কীভাবে গ্রহণ করব, এ নিয়ে স্পষ্ট কোনো মানদণ্ড এখনও গড়ে ওঠেনি। ফলে একদিকে ‘মুক্তচিন্তা’র নামে ব্যক্তিগত স্বাধীনতার সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। অন্যদিকে ধর্মীয় সংস্কৃতিকে একরৈখিক করে ‘সম্প্রীতির মুখোশে’ এক গোষ্ঠীর মূল্যবোধ অন্যের উপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। বাঙালি সংস্কৃতির নামে এক ধর্মের বিশ্বাসকে অন্য ধর্মাবলম্বীদের মানতে বাধ্য করার চেষ্টাও লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
একটি সুস্থ সমাজ গড়তে আমাদের স্পষ্টভাবে জানতে হবে : সংস্কৃতির ভিত্তি কী? আমরা সংস্কৃতিকে দুই ভাগে ভাগ করতে পারি : বস্তুগত ও আধ্যাত্মিক। আধ্যাত্মিক সংস্কৃতি চিন্তা, বিশ্বাস, দর্শন ও নৈতিকতার সঙ্গে জড়িত এবং এখানে আপস করার সুযোগ নেই। প্রত্যেকেই তার বিশ্বাস অনুযায়ী তার ধর্মীয় সংস্কৃতি পালন করবে। একজনের বিশ্বাসগত সংস্কৃতিকে অন্যের উপর চাপিয়ে দেওয়া অন্যায়। আর বস্তুগত সংস্কৃতি (খাবার, পোশাক, উৎসব) যতক্ষণ ধর্মীয় আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক না হয়, ততক্ষণ গ্রহণযোগ্য। শুকর মাংস ইসলামে হারাম, গো-মাংস হিন্দু ধর্মে নিষিদ্ধ, এগুলো ধর্মীয় বিশ্বাসের অংশ। ওয়াজ-মাহফিল, ঈদ বাঙালি মুসলিম সমাজের শত শত বছরের সংস্কৃতি, আর কীর্তন ও পূজা হিন্দু সম্প্রদায়ের হাজার বছরের ঐতিহ্য। এ দুটি পরস্পর সাংঘর্ষিক হলেও উভয়ই বাঙালি সংস্কৃতির অংশ। কিন্তু সম্প্রীতির নামে একটিকে অন্যের উপর জোর করে চাপিয়ে দেওয়া মুক্তচিন্তা নয়, বরং চিন্তার সংকীর্ণতা।
তাই প্রয়োজন একটি ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি। সংস্কৃতি হবে পরিবর্তনশীল ও বহুমাত্রিক, কিন্তু একই সঙ্গে নৈতিকভাবে সুসংহত। ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও সমাজের মূল্যবোধের মধ্যে একটি সুস্থ সমন্বয়ই গড়ে তুলতে পারে সাংস্কৃতিক পরিবেশ। বাংলার সংস্কৃতি নিজেই এক সংকর ঐতিহ্য, এটাই তার সবচেয়ে বড় শক্তি। একে অস্বীকার করা যেমন ভুল, তেমনি অযাচিতভাবে সবকিছু গ্রহণ করা বা অন্যের উপর চাপিয়ে দেওয়াও অন্যায়।
সংস্কৃতি নিয়ে আমাদের চিন্তায় পরিমিতি, যুক্তি ও নৈতিকতার সমন্বয় জরুরি। না হলে আমরা হয় অস্থির বৈচিত্র্যের মধ্যে হারিয়ে যাব, নয়তো সংকীর্ণ একরৈখিকতায় আবদ্ধ হয়ে পড়ব। সুস্থ সমাজ গঠনের জন্য সংস্কৃতিকে দেখতে হবে সংঘর্ষের ক্ষেত্র হিসেবে নয়, বরং ভারসাম্যের এক চলমান প্রক্রিয়া হিসেবে।
নাজমুল ইসলাম
শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া
