আধুনিক রোগ ওভার থিংকিং
জান্নাতুল ফেরদৌস জেরিন
প্রকাশ : ১৯ এপ্রিল ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে মানুষ যখন প্রযুক্তির চরম শিখরে অবস্থান করছে, তখন জীবনযাত্রার মান বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে মানসিক অস্থিরতা। এই অস্থিরতার মূলে রয়েছে এক নীরব ঘাতক ‘ওভার থিংকিং’ বা অতিরিক্ত চিন্তন। সহজ কথায়, কোনো বিষয় নিয়ে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি ভাবা, অতীত বা ভবিষ্যৎ নিয়ে অহেতুক দুশ্চিন্তা করা এবং নিজের কাজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলাকেই ওভার থিংকিং বলা হয়। আধুনিক মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে অনেক সময় ‘প্যারালাইসিস বাই অ্যানালাইসিস’ও বলা হয়ে থাকে। বর্তমান যুগে কর্মক্ষেত্র, সামাজিক সম্পর্ক এবং ব্যক্তিগত জীবনে এটি এক নতুন ধরনের মহামারির আকার ধারণ করেছে, যা মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর ভয়াবহ প্রভাব ফেলছে।
অতিরিক্ত চিন্তার এই সমস্যাটি কোনো একক বয়সের মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে চাকুরিজীবী- সবাই কমবেশি এর শিকার। এর মূল কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো জীবনের অত্যধিক প্রতিযোগিতা। প্রতিটি পদক্ষেপে নিজেকে সেরা প্রমাণ করার মানসিক চাপ মানুষকে এক গোলকধাঁধায় আটকে ফেলছে। এছাড়া সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যাপক বিস্তার মানুষকে প্রতিনিয়ত অন্যের জীবনের সঙ্গে নিজের জীবনের তুলনা করতে বাধ্য করছে। ফেসবুকে বা ইনস্টাগ্রামে অন্যের সফলতার ছবি দেখে মানুষ নিজেদের ব্যর্থতা নিয়ে ভাবতে শুরু করে, যা থেকে জন্ম নেয় হীনম্মন্যতা ও অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা। এছাড়া অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ, আর্থিক সংকট, এবং পারিবারিক টানাপোড়েনও এই মানসিক অবস্থার অন্যতম অনুঘটক হিসেবে কাজ করে।
ওভার থিংকিংয়ের সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো এটি মানুষকে বর্তমান থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। যারা অতিরিক্ত চিন্তা করেন, তারা প্রায়শই হয় অতীতের কোনো ভুল নিয়ে অনুশোচনা করেন, অথবা ভবিষ্যতের কাল্পনিক কোনো বিপর্যয় নিয়ে ভয় পান। এই মানসিক দ্বন্দ্বের কারণে তারা বর্তমানের কাজগুলোতে মনোনিবেশ করতে পারেন না। ফলে কর্মক্ষেত্রে দক্ষতা কমে যায়, সৃজনশীলতা হ্রাস পায় এবং সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগতে হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, যারা দীর্ঘ সময় ধরে অতিরিক্ত চিন্তা করেন, তাদের মধ্যে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা স্বাভাবিক মানুষের তুলনায় অনেক কম থাকে। তারা যেকোনো বিষয়ে খুঁটিনাটি খুঁজতে গিয়ে মূল লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়েন, যা তাদের ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপরও ওভার থিংকিংয়ের প্রভাব অত্যন্ত গভীর। দীর্ঘস্থায়ী অতিরিক্ত দুশ্চিন্তার ফলে শরীরে কর্টিসল হরমোনের মাত্রা বেড়ে যায়, যাকে সাধারণত ‘স্ট্রেস হরমোন’ বলা হয়। এর ফলে উচ্চ রক্তচাপ, অনিদ্রা, হজমের সমস্যা, হৃদরোগ এবং দুর্বল রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার মতো জটিল রোগ দেখা দিতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে মাথাব্যথা, পেশিতে টান ধরা এবং দীর্ঘমেয়াদী ক্লান্তির পেছনেও মূল কারণ হিসেবে কাজ করে এই অতিরিক্ত চিন্তার অভ্যাস। মন যখন শান্ত থাকে না, শরীর তখন তার স্বাভাবিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে। এভাবেই মানসিক এই সমস্যা ধীরে ধীরে শারীরিক অসুস্থতার জন্ম দেয়, যা অনেক সময় শনাক্ত করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
তবে সুখবর হলো, ওভার থিংকিং একটি অভ্যাসজনিত সমস্যা এবং সচেতন প্রচেষ্টার মাধ্যমে এটি থেকে উত্তরণ সম্ভব। এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার প্রথম পদক্ষেপ হলো নিজের চিন্তার ধরন শনাক্ত করা। আপনি যখন বুঝতে পারবেন যে আপনি অহেতুক কোনো বিষয় নিয়ে ভাবছেন, তখনই সচেতনভাবে নিজেকে সেখান থেকে সরিয়ে আনতে হবে। মনোবিজ্ঞানীরা এক্ষেত্রে ‘ফাইভণ্ডসেকেন্ড রুল’ বা পঞ্চণ্ডসেকেন্ড নিয়মের পরামর্শ দেন- কোনো বিষয়ে অতিরিক্ত ভাবতে শুরু করলে মনে মনে পাঁচ থেকে এক পর্যন্ত উল্টো গণনা করে মনোযোগ অন্য কোনো কাজে সরিয়ে নিতে হবে। এতে মস্তিষ্ক ওই চিন্তার চক্র থেকে বেরিয়ে আসতে সাহায্য পায়।
এছাড়া নিয়মিত ধ্যান বা মেডিটেশন ও ইয়োগা হতে পারে ওভার থিংকিং প্রতিরোধের সেরা হাতিয়ার।
জান্নাতুল ফেরদৌস জেরিন
শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
