এসএসসি ও সমমানের-২০২৬ ব্যাচের জন্য শুভকামনা

ড. মো. আনোয়ার হোসেন

প্রকাশ : ২০ এপ্রিল ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

আসন্ন ২১ এপ্রিল ২০২৬ থেকে শুরু হতে যাওয়া এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা তোমাদের জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ সোপান। এই মাহেন্দ্রক্ষণে তোমাদের জন্য রইল একরাশ উষ্ণ অভিনন্দন ও প্রাণঢালা ভালোবাসা। তোমরা শুধু পরীক্ষার্থী নও, তোমরা আগামীদিনের বাংলাদেশের কারিগর এবং নতুন স্বপ্নের মশালবাহী।

পরীক্ষার এই দীর্ঘপথ-পরিক্রমায় সবার আগে প্রয়োজন পরম করুণাময় সৃষ্টিকর্তার প্রতি অবিচল আস্থা ও বিশ্বাস। স্রষ্টার ওপর ভরসা রাখলে মনের গহিনে এক অদ্ভুত প্রশান্তি জন্ম নেয়, যা প্রতিকূলতা জয়ে সাহস জোগায়। নিজের কর্মের সঙ্গে যখন আধ্যাত্মিক শক্তি যুক্ত হয়, তখন যেকোনো কঠিন পথও সুগম হয়ে ওঠে। দৃঢ় মনোবল সাফল্যের প্রধান চাবিকাঠি হিসেবে কাজ করে। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায়, ‘বিপদে মোরে রক্ষা করো এ নহে মোর প্রার্থনা, বিপদে আমি না যেন করি ভয়।’ মনের জোর থাকলে যেকোনো কঠিন প্রশ্ন বা পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সহজ হয়। আত্মবিশ্বাসই অর্ধেক বিজয় নিশ্চিত করে দেয়। মনে রেখো, জিপিএ-৫ বা ‘এ প্লাস’ জীবনের শেষ কথা নয়। এটি মেধা যাচাইয়ের একটি মানদণ্ড মাত্র, কিন্তু মানুষের সম্পূর্ণ যোগ্যতা বা ভবিষ্যতের একমাত্র মাপকাঠি নয়। ফলের চেয়ে তোমার অর্জিত জ্ঞান এবং শেখার প্রক্রিয়াটি অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। জীবনের পরীক্ষায় সফল হতে হলে শুধু পুঁথিগত বিদ্যায় সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। পরীক্ষা কেন্দ্রে অসৎ উপায় অবলম্বন বা নকল থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ দূরে রাখা প্রতিটি শিক্ষার্থীর নৈতিক দায়িত্ব। সততা শুধু পরীক্ষায় নয়, সারাজীবনের পাথেয়। অনৈতিকভাবে অর্জিত সাফল্য ক্ষণস্থায়ী এবং তা পরবর্তী জীবনে গ্লানির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। প্রকৃত মেধাবীরা কখনোই মিথ্যার আশ্রয় নেয় না।

বর্তমান সময়ে ‘সাইলেন্ট এক্সপ্রেস’ বা নিরবচ্ছিন্ন গতির বিষয়টি মাথায় রেখে এগিয়ে যেতে হবে। কোলাহলমুক্ত শান্ত মনে নিজের লক্ষ্যপানে ধাবিত হওয়া বুদ্ধিমানের কাজ। বাইরের অপ্রয়োজনীয় ব্যস্ততা কমিয়ে নিজের পড়াশোনায় নিমগ্ন থাকাই এই মুহূর্তের প্রধান দাবি। স্থির লক্ষ্যই লক্ষ্যে পৌঁছানোর পথকে মসৃণ করে। প্রশ্ন ফাঁসের মরীচিকার পেছনে ছুটে নিজের সময় ও মেধা নষ্ট করা চরম বোকামি। গুজব বা প্রশ্ন আউটের আশায় না থেকে নিজের প্রস্তুতির ওপর ভরসা রাখাই শ্রেয়। মনে রাখবে, ফাঁকি দিয়ে পাওয়া সাফল্য কখনও স্থায়ী সম্মান বয়ে আনে না; বরং তা আত্মমর্যাদাকে ধূলিসাৎ করে দেয়। অদম্য সাহস নিয়ে পরীক্ষার হলে প্রবেশ করতে হবে। ভীরুতা মানুষকে পিছিয়ে দেয়, আর সাহস নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। যেকোনো চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করার মানসিকতা থাকতে হবে। জীবন যুদ্ধের এই ছোট যুদ্ধে জয়ী হতে হলে সাহসের কোনো বিকল্প নেই। লক্ষ্য স্থির রাখা সাফল্যের একটি বড় শর্ত। তুমি ভবিষ্যতে কী হতে চাও এবং তোমার গন্তব্য কোথায়, তা আগে থেকেই নির্ধারণ করে নাও। লক্ষ্যহীন জীবন পালহীন নৌকার মতো, যা মাঝপথে হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। স্পষ্ট লক্ষ্য থাকলে পড়ার টেবিল থেকে শুরু করে পরীক্ষার হল পর্যন্ত একাগ্রতা বজায় থাকে।

সঠিক প্রস্তুতিই তোমাকে আত্মবিশ্বাসের চূড়ায় পৌঁছে দেবে। সিলেবাসের প্রতিটি অংশ খুঁটিয়ে পড়া এবং বিগত বছরের প্রশ্নগুলো বিশ্লেষণ করা প্রস্তুতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। পরিকল্পনাহীন পরিশ্রম অনেক সময় কাঙ্ক্ষিত ফল দেয় না, তাই একটি সুশৃঙ্খল রুটিন মেনে পড়াশোনা করা জরুরি।

নিয়মিত পড়াশোনা করার অভ্যাস মেধাকে শাণিত করে। ‘আজ নয় কাল’ বলে পড়া জমিয়ে রাখলে শেষ সময়ে পাহাড়সম চাপ তৈরি হয়। প্রতিদিনের পড়া প্রতিদিন শেষ করলে আত্মতৃপ্তি পাওয়া যায় এবং পাঠ্য বিষয়গুলো দীর্ঘস্থায়ী স্মৃতিতে জমা থাকে। ধারাবাহিকতাই হলো সাফল্যের মূল মন্ত্র।

সময়নিষ্ঠ হওয়া প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য অপরিহার্য গুণ। পরীক্ষায় প্রতিটি সেকেন্ডের মূল্য অপরিসীম। সময়ের সঠিক ব্যবস্থাপনা না জানলে জানা উত্তরও লিখে শেষ করা সম্ভব হয় না। তাই পড়ার টেবিল থেকে পরীক্ষার হল- সর্বত্রই ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলতে শিখতে হবে।

একাগ্র চিত্ত বা মনোযোগের গভীরতা পড়াশোনার মান বৃদ্ধি করে। মনোযোগ বিচ্ছিন্ন হলে দীর্ঘক্ষণ পড়েও কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায় না। পড়ার সময় সব ধরনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও মনোযোগ হরণকারী বস্তু থেকে দূরে থাকতে হবে। ধ্যানমগ্ন হয়ে পড়া আত্মস্থ করলে তা সহজে ভোলা যায় না।

ধৈর্য ধারণ করা বড় অর্জনের পূর্বশর্ত। দীর্ঘ প্রস্তুতি পর্বে ক্লান্তি আসতে পারে, তবে ধৈর্য হারানো চলবে না। প্রতিকূল সময়ে শান্ত থেকে নিজের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করতে হবে। মহৎ কাজগুলো কখনও তাড়াহুড়ো করে হয় না, এর জন্য সময়ের প্রয়োজন হয়। নিজের ওপর অগাধ আত্মবিশ্বাস রাখো। ‘আমি পারব’- এই মন্ত্রটি মনে গেঁথে নাও। অনেক সময় সামান্য ভুলের কারণে আত্মবিশ্বাস ডগমগ হয়ে যায়, কিন্তু ভেঙে পড়া চলবে না। মনে রাখবে, তোমার সামর্থ্য তোমার চিন্তার চেয়েও অনেক বেশি। পরীক্ষার এই সময়ে সুস্থ শরীর বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। অসুস্থতা সব পরিকল্পনা ভণ্ডুল করে দিতে পারে। তাই পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ, পর্যাপ্ত পানি পান এবং নিয়মিত ঘুমের দিকে নজর দিতে হবে। শরীর ভালো থাকলে মনও সজীব থাকে এবং পড়া দ্রুত আয়ত্তে আসে। পরিশ্রমী হওয়ার কোনো বিকল্প নেই। প্রবাদ আছে, ‘পরিশ্রম সৌভাগ্যের প্রসূতি।’ অলসতা মেধাকে ধ্বংস করে দেয়। নিজের মেধা ও শ্রমের সঠিক সমন্বয় ঘটাতে পারলে সাফল্য ধরা দিতে বাধ্য। কঠোর শ্রমই একজন সাধারণ শিক্ষার্থীকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়।

মেধার জয় সব সময়ই অনস্বীকার্য। সৃজনশীল চিন্তা ও মেধার সঠিক প্রতিফলন ঘটলে যে কেউ চমক দেখাতে পারে। মুখস্থ বিদ্যার চেয়ে বুঝে পড়ার ওপর গুরুত্ব দাও। তোমার স্বকীয় মেধা যেন উত্তরপত্রে প্রতিফলিত হয়, সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখা প্রয়োজন। স্বপ্ন পূরণ করাই হোক তোমার মূল চালিকাশক্তি। আকাশছোঁয়া স্বপ্ন দেখো এবং তা বাস্তবায়নে মরিয়া হও। এপিজে আবদুল কালাম বলেছিলেন, ‘স্বপ্ন সেটা নয় যা তুমি ঘুমিয়ে দেখো, স্বপ্ন সেটাই যা তোমাকে ঘুমাতে দেয় না।’ তোমার স্বপ্নই তোমাকে ক্লান্তির মুহূর্তে শক্তি জোগাবে। সাফল্য নিশ্চিত করার জন্য ইতিবাচক চিন্তা করা খুব জরুরি। নেতিবাচক ভাবনা মনকে দুর্বল করে দেয়। তুমি যদি তোমার সেরাটা দিতে পার, তবে সাফল্য তোমার পদচুম্বন করবেই। জয়ী হওয়ার মানসিকতা নিয়ে প্রতিটি পরীক্ষা দিতে হবে। ভয়হীন পরীক্ষা দেওয়ার মানসিক প্রস্তুতি নাও। পরীক্ষার হল কোনো ভয়ের জায়গা নয়, বরং তোমার মেধা প্রদর্শনের মঞ্চ। ভয়কে জয় করতে পারলেই সাবলীলভাবে উত্তর লেখা সম্ভব।

পরীক্ষার আতঙ্ক ঝেড়ে ফেলে হাসিমুখে কলম ধরতে হবে। সুচিন্তিত পরিকল্পনা সাফল্যের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে। কোন বিষয়টি আগে পড়বে, কোনটিতে দুর্বলতা আছে- এসবের একটি নিখুঁত ছক থাকা চাই। পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করলে সময়ের অপচয় রোধ হয় এবং আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি পায়। অগোছালো কাজ সব সময় ফলপ্রসূ হয় না। সৃজনশীল ভাবনা তোমাকে অন্যদের চেয়ে আলাদা করে তুলবে। গতানুগতিক উত্তরের বাইরে নিজের চিন্তা ও সৃজনশীলতার মিশেলে উত্তরপত্র সাজাও। বর্তমান শিক্ষাপদ্ধতিতে সৃজনশীলতাই হলো শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের একমাত্র উপায়। তোমার স্বকীয়তা যেন শিক্ষককে মুগ্ধ করে।

পরিশেষে বলা যায়, বিজয় সুনিশ্চিত হবে তখনই যখন তুমি সৎ পথে থেকে পরিশ্রম করবে। দেশপ্রেমের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে নিজের শিক্ষাকে দেশ ও দশের কল্যাণে নিয়োজিত করার শপথ নাও। তোমরাই হবে ২০২৬ সালের গর্বিত কাণ্ডারি, যারা জ্ঞানালোক দিয়ে অন্ধকার দূর করবে। সর্বোপরি, তোমাদের প্রতি নিরন্তর শুভকামনা রইল। বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে বুক টান করে এগিয়ে চলো আগামীর উজ্জ্বল সম্ভাবনার দিকে। বাংলার সবুজ প্রান্তর আজ তোমাদের সাফল্যের অপেক্ষায়। জয় তোমাদের হবেই, হে নবীন প্রাণ; বিশ্বজয়ের নেশায় মাতো নির্ভয় চিত্তে।

ড. মো. আনোয়ার হোসেন

প্রাবন্ধিক, কথা সাহিত্যিক ও প্রেসিডেন্ট আন্তর্জাতিক মাদকবিরোধী সংগঠন, ফ্রিডম ইন্টারন্যাশনাল এন্টি অ্যালকোহল