মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত : শক্তির রাজনীতি নাকি ধর্মীয় দ্বন্দ্ব
রাখি আক্তার
প্রকাশ : ২০ এপ্রিল ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ এক কেন্দ্রবিন্দু মধ্যপ্রাচ্য। ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে এ অঞ্চলে বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস সম্পদ রয়েছে যা পুরো বিশ্বে রপ্তানি করা হয়। রপ্তানিকৃত এই দ্রব্যগুলো বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রায় সব দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুধু অর্থনৈতিক দিক থেকে এই অঞ্চল গুরুত্বপূর্ণ নয় বরং বিশেষ করে অর্থনীতিকে কেন্দ্র করেই আন্তর্জাতিক শক্তির ভারসাম্য নির্ধারণে এই অঞ্চল সমানভাবে প্রভাব ফেলে। ইতিহাস পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় এই অঞ্চলজুড়ে যুদ্ধ, বিদ্রোহ ও রাজনৈতিক অস্থিরতা যেন সর্বদা চলেই আসছে এবং এই অস্থিরতা বারবার বিশ্ব বিবেককে নাড়া দিয়েছে। বিশেষ করে গাজাকে কেন্দ্র করে যে সংঘাত আজও চলমান সেদিক তাকালেই আমরা বুঝতে পারি সমস্যাটা কতটা ভয়াবহ। সময়কালের সেরা দুর্ভিক্ষ হয়তো এখন গাজাবাসীরা সহ্য করছে। বর্তমানে ইজরায়েল-ফিলিস্তিন যুদ্ধ শুধু রাজনৈতিক ইস্যু নয় বরং এটি মানবাধিকার, ন্যায়বিচার এবং আন্তর্জাতিক নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার অঞ্চলে পরিণত হয়েছে। যা কখনোই কাম্য নয়। বরং এই ভূখণ্ডের চলমান মানবাধিকার এবং ন্যায় বিচারের এমন দুর্বিষহ সংকট মানবসভ্যতার জন্য লজ্জা।
এছাড়া আরব-ইজরায়েল যুদ্ধ, সিরিয়ায় সিভিলিয়ান যুদ্ধ এবং সাম্প্রতিক ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ প্রমাণ করে এই অঞ্চল কতটা অস্থিরতার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছে। এই যুদ্ধগুলোর এক প্রান্ত যেমন ধর্মীয় সংঘাত হিসেবে বিশ্লেষণ করা যায়, অন্যদিকে এর অপর প্রান্তে রয়েছে রাজনৈতিক ক্ষমতার লড়াই। এছাড়া এই অঞ্চলের পরাশক্তিধর রাষ্ট্রসমূহের প্রক্সি যুদ্ধো অন্যতম। এতে অর্থনৈতিকভাবে তারা যেমন লাভবান হয়, তেমনি ক্ষমতার রাজনীতি বহাল থাকে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের এক বড় কারণ ধর্মীয় বিভাজন। ইসলাম ধর্মে শিয়া, সুন্নি বিভক্তির কারণে নানা মতপার্থক্য সৃষ্টি হয়, পরবর্তীতে তা সংঘাতে এবং ক্ষমতার লড়াইয়ে পরিণত হয়। এছাড়া ইসলাম, ইহুদি ও খ্রিস্টানদের জন্য জেরুজালেম পবিত্র স্থান হওয়ায় এই অঞ্চলে যুদ্ধ, বিদ্রোহ ভয়াবহ অবস্থায় পর্যবসিত হয়েছে। এখানে রাজনৈতিক ইস্যুই মূলত ধর্মীয় সংঘাতের রূপ নেয়। যা কালের বিবর্তনে ক্রমেই আরও অনেক বেশি ধ্বংসাত্মক হয়ে উঠেছে। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের আর এক গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো জ্বালানি স্বার্থ। পুরো বিশ্বে প্রাকৃতিক গ্যাস ও জ্বালানির অন্যতম উৎস মধ্যপ্রাচ্য। বিশেষ করে OPEC-এর সদস্য রাষ্ট্রগুলো এই জ্বালানির বাজারকে নিয়ন্ত্রণ করে। তাই বিশ্ব অর্থনীতির এক বিরাট অংশ তাদের নিয়ন্ত্রণে বলা যায়। স্বভাবতই অর্থনীতির একটা বিশাল এবং গুরুত্বপূর্ণ অংশ যখন কোনো একটি অংশের হাতে পুঞ্জিভূত থাকে তখন বিশ্বের বাকি দেশগুলোর বাঁকা এবং হিংস্র দৃষ্টি থাকে ওই অঞ্চলের প্রতি। যার ফলাফল যেন এই অংশ প্রায় সর্বদাই কোন না কোনভাবে যুদ্ধে লিপ্ত থাকে। আর যেহেতু এই অংশের তেল ও গ্যাস পুরো পৃথিবীর চাহিদা মিটিয়ে থাকে তাই এই অঞ্চলে কোনো সংঘাত কিংবা অস্থিরতা দেখা দিলে জ্বালানি সংকট, মূল্য বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দেয়। এই জ্বালানি শুধু বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলে না বরং ক্ষমতার রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।
যা বর্তমান পরিস্থিতির দিকে লক্ষ্য করলেই খুব সহজেই বুঝতে পারা যায়। ইরান-আমেরিকার যুদ্ধকে কেন্দ্র করে হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়াই বাংলাদেশে জ্বালানি সংকটের কারণে বিভিন্ন ধরনের যানবাহন, শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎ খাত, কৃষি খাতের অবস্থা বড়ই নাযুক। শুধু বাংলাদেশ নয় একইভাবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই একই সমস্যা বিরাজমান। মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত শুধু আঞ্চলিক নয়, এটি বৈশ্বিক শক্তির প্রতিযোগিতার এক ক্ষেত্র।
যেখানে শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো নিজেদের কৌশলগত ও আর্থিক স্বার্থকে কেন্দ্র করে সমর্থন ও সহযোগিতা করে আসছে। বিশেষ করে আমেরিকা দীর্ঘদিন ধরে ইজরায়েল এর প্রধান মিত্র হিসেবে রাজনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে সহায়তা দিয়ে আসছে। ফলে শক্তির রাজনীতির ভয়াবহতায় সৃষ্টির সেরা জীব মানুষই মানুষকে চিরতরে শেষ করার ধ্বংসাত্মক খেলায় লিপ্ত হয়েছে। ধর্মীয় দ্বন্দ্বের থেকেও ক্ষমতার লড়াই যেন বেশি দেখা যায়। অন্যদিকে রাশিয়া সিরিয়া সংকটে সরাসরি হস্তক্ষেপ করে সিরিয়া সরকারের পক্ষে অবস্থান নেয়, যা তাদের মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বিস্তারের একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল।
তাই মূলত মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণ হিসেবে এক প্রান্তে ধর্মীয় বিভাজন থাকলেও এর মূলে রয়েছে ভূরাজনীতি, জ্বালানি সম্পদের নিয়ন্ত্রণ এবং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা। ধর্ম এখানে সংঘাত সৃষ্টি করা এবং টিকিয়ে রাখার আবেগীয় ও পরিচয়ভিত্তিক মাত্রা যোগ করে ফলে সারা বিশ্বে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থের দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়। এ সংঘাত পুরোপুরি নিষ্পত্তি করা সহজ নয় তবে অসম্ভবও নয়। কৌশলগত কূটনৈতিক উদ্যোগ এবং সহিংসতার পরিবর্তে সংলাপ ও সমঝোতার মাধ্যমে এর সমাধান হতে পারে। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর বর্তমান সময়ের নিষ্ক্রিয়তা দূর করে সক্রিয় ও নিরপেক্ষ পদক্ষেপ গ্রহণ করা অতীব জরুরি। প্রয়োজন অনুসারে বিভিন্ন চুক্তির উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। যেখানে উল্লেখ থাকবে কোন শক্তিধর রাষ্ট্র তাদের নিজেদের স্বার্থ হাসিলের লক্ষ্যে কোন ছোট কিংবা কম শক্তিধর রাষ্ট্রের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। এ সব সংস্থাগুলোকে শক্তিধর দেশগুলোর একপাক্ষিক সমর্থন না দিয়ে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার কৌশল অবলম্বন করতে হবে।
ধর্মকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার না করে শান্তি, ন্যায়বিচার ও সহাবস্থানের মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তাছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এমন এক জটিল সমীকরণ যার পেছনে রয়েছে ধর্মীয় পরিচয়, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, জ্বালানির রাজনীতি ও ক্ষমতার দাম্ভিকতা। যার নির্মম বাস্তবতার সাক্ষী হচ্ছে এসব অঞ্চলের মানুষ এবং ধীরে ধীরে পুরো বিশ্ব। যার ফলাফল পুরো বিশ্ব আজ অস্থিতিশীলতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। যা কখনোই কাম্য হতে পারে না। এই অবস্থা থেকে উত্তরণে অন্যায় দূর করে শান্তি প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত সংস্থাগুলোকে এবং সকল শক্তিধর দেশগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে।
রাখি আক্তার
শিক্ষার্থী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, ইডেন মহিলা কলেজ
