এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা উৎসব শুরু

ড. মো. আনোয়ার হোসেন

প্রকাশ : ২২ এপ্রিল ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

শিক্ষা জীবনের এক দীর্ঘ পথপরিক্রমা শেষে এসএসসি পরীক্ষা শুধু একটি মূল্যায়ন পদ্ধতি নয়, বরং এটি বাংলার প্রতিটি ঘরে এক পলিমাটিমাখা সোনালি উৎসবের আগমনী বার্তা। দীর্ঘ দশটি বছর ধরে তিল তিল করে অর্জিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার ঝুলি নিয়ে কিশোর-কিশোরীরা যখন এই জাতীয় মঞ্চে দাঁড়ায়, তখন একে স্রেফ পরীক্ষা বললে ভুল হবে; এটি একটি প্রজন্মের স্বপ্ন জয়ের মহোৎসব।

বাঙালির পার্বণের তালিকায় গত কয়েক দশকে সগৌরবে যুক্ত হয়েছে একটি আধুনিক উৎসব, যার নাম এসএসসি পরীক্ষা। এটি শুধু খাতাণ্ডকলমের লড়াই নয়, বরং এক বিশাল সামাজিক কর্মযজ্ঞ। ঋতুচক্রের আবর্তনে ২০২৬ সালের এই মাহেন্দ্রক্ষণটি যখন কড়া নাড়ছে, তখন সারা দেশের জনপদে বইছে এক অদ্ভুত শিহরণ। গ্রাম থেকে শহর, মেঠোপথ থেকে রাজপথ- সর্বত্রই এখন শুধুই প্রস্তুতির গুঞ্জন। একটি রঙিন শৈশব ও কৈশোরের বিদায়ঘণ্টা বাজে এই পরীক্ষার মাধ্যমে, যেখানে প্রতিটি ক্লাসরুমের দেয়াল আর খেলার মাঠের ধুলিকণা কান পেতে শোনে বিচ্ছেদণ্ডগাথা। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায়, ‘গিয়েছে যে দিন যাক, সে কি আর ফিরিবে!’- সত্যিই সেই স্কুলবেলার অমলিন দিনগুলো স্মৃতির পাতায় জমা রেখে শিক্ষার্থীরা এক অজানা অজানার পথে পা বাড়ায়।

এই যাত্রার প্রাক্কালে প্রতিটি পরীক্ষার্থীর প্রধান পাথেয় হয়ে দাঁড়ায় গুরুজনদের অকৃত্রিম দোয়া ও আশীর্বাদ, যা তাদের মনের কোণে এক অলৌকিক আত্মবিশ্বাস জোগায়।

বাবা-মায়ের স্নিগ্ধ চাহনি আর শিক্ষকদের অনুপ্রেরণামূলক বাণী যেন রণক্ষেত্রের সৈনিকের জন্য শ্রেষ্ঠ রক্ষাকবচ হয়ে কাজ করে, যা সব ভয়কে জয় করতে শেখায়। জীবনের প্রথম বড় কোনো সার্টিফিকেট অর্জনের এই লড়াইটি প্রত্যেকটি কিশোর মনের জন্য এক অনন্য শিহরণ, যেখানে প্রথমবারের মতো জাতীয় পর্যায়ে নিজের মেধার স্বাক্ষর রাখার সুযোগ তৈরি হয়। জীবনের এই গুরুত্বপূর্ণ বাঁকটি অতিক্রম করার মাধ্যমেই একজন শিক্ষার্থী নিজেকে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতির প্রথম সোপানে আরোহণ করতে দেখে। দেশের প্রতিটি জনপদে, গ্রামে কিংবা শহরে আজ সবার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে ২০২৬ সালের এই এসএসসি পরীক্ষা। পাড়ার মোড়ের চায়ের দোকান থেকে শুরু করে ড্রয়িংরুমের আড্ডা- সবখানেই এখন আলোচনার বিষয়বস্তু শুধু এই ছোটদের বড় পরীক্ষাটি, যা জনমনে এক অদ্ভুত কৌতূহল সৃষ্টি করেছে।

বাংলাদেশি সমাজব্যবস্থায় এই পরীক্ষাটি যেন একটি বার্ষিক ঋতু পরিবর্তনের মতো, যা চারদিকে এক উৎসবমুখর আবহ সৃষ্টি করে এবং মানুষের মনে প্রাণচাঞ্চল্যের সঞ্চার করে। রঙিন মলাটের বই আর নতুন কলমের ঘ্রাণে মুখরিত হয়ে ওঠে প্রতিটি আঙিনা, যেন প্রকৃতিও সেজেছে এই নবাগত যোদ্ধাদের বরণ করে নিতে। রাষ্ট্রীয়ভাবে এসএসসি পরীক্ষা একটি জাতীয় মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়, যা দেশের সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থার মানদণ্ড এবং ভবিষ্যতের দক্ষ জনশক্তি গড়ার প্রথম ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে। একটি জাতির উন্নতির সোপান যে এই তরুণদের হাত ধরেই নির্মিত হবে, তার প্রথম পাঠ শুরু হয় এই পরীক্ষার মাধ্যমেই। সামাজিক স্বীকৃতির মাপকাঠিতে এই পরীক্ষাটি এক বিশাল ভূমিকা পালন করে, যেখানে একজন শিক্ষার্থীর সাফল্য তার পরিবারের সম্মান ও মর্যাদাকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়। পাড়া-প্রতিবেশীর কাছে ‘এসএসসি পরীক্ষার্থী’ পরিচয়টি যে সম্মানের দাবি রাখে, তা এই বয়সের কিশোরদের মনে দায়িত্ববোধের এক নতুন মাত্রা যোগ করে।

ভবিষ্যৎ জীবনের মজবুত ভিত্তি গড়ার শ্রেষ্ঠ সময় এটি, যেখানে নির্ধারিত হয় আগামীর পেশা ও নেশার গতিপথ এবং স্বপ্ন দেখার নতুন দিগন্ত। জীবন যুদ্ধে জয়ী হতে হলে এই সোপানটি যে পরম নিষ্ঠার সঙ্গে পার হতে হয়, তা আজ প্রতিটি কোমলমতি শিক্ষার্থীর চেতনায় প্রগাঢ়ভাবে গেঁথে গেছে। পারিবারিক স্বপ্নের এক বিশাল ক্যানভাস জুড়ে থাকে এই পরীক্ষার ফলাফল, যেখানে বাবা-মায়ের বহু বছরের শ্রম আর ত্যাগের প্রতিফলন দেখতে চান তারা। সন্তানের একটি ভালো গ্রেড যেন মা-বাবার মুখের হাসি আর জীবনের সব দুঃখ ভোলার এক শ্রেষ্ঠ মহৌষধ হিসেবে কাজ করে। পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে এক সামষ্টিক প্রস্তুতি, যেখানে বন্ধু-বান্ধবরা মিলে গ্রুপ স্টাডি আর নোট আদান-প্রদানের মাধ্যমে সহমর্মিতার এক অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করে। এই সম্মিলিত প্রচেষ্টায় শুধু পড়ালেখার উন্নতি হয় না, বরং গড়ে ওঠে আজীবন অটুট থাকার মতো গভীর বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। দেশের প্রতিটি প্রান্তে আজ যে উদ্দীপনা বিরাজ করছে, তা যেন বসন্তের কোকিলের ডাকের মতোই সুমধুর এবং আগামীর সুন্দর দিনগুলোর বার্তাবাহক। প্রতিটি শিক্ষার্থীর চোখে-মুখে যে প্রত্যয় আর দীপ্তি দেখা যাচ্ছে, তা প্রমাণ করে তারা যে কোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এখন পুরোপুরি প্রস্তুত।

পরীক্ষার এই আমেজটি অনেকটা ঈদের আনন্দের মতো, যেখানে ভয় আর রোমাঞ্চ হাত ধরাধরি করে চলে এবং প্রতিটি মুহূর্তকে করে তোলে স্মরণীয়। হলের গেটে বন্ধুদের সঙ্গে শেষ মুহূর্তের পুনরাবৃত্তি আর টিফিনের বিরতিতে খুনসুটি- সব মিলিয়ে এ এক অভাবনীয় আনন্দঘন পরিবেশ।

আনন্দ ও উদযাপন শুধু ভালো ফলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং একটি বড় লক্ষ্য অর্জনের এই প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপই উপভোগ্য করে তোলা উচিত। নজরুলের ভাষায়, ‘আমরা চলিব পশ্চাতে ফেলি’ পচা অতীত’- এই মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে শিক্ষার্থীরা আগামীর উজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যায়। গণমাধ্যমগুলোতেও এখন এই পরীক্ষার খবর গুরুত্বের সঙ্গে প্রচার করা হচ্ছে, যা জনমনে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং পরীক্ষার্থীদের মানসিকভাবে চাঙা রাখতে সহায়তা করছে। খবরের কাগজের পাতা থেকে শুরু করে টেলিভিশনের স্ক্রিন- সবখানেই এখন এই উৎসবের জয়গান গাওয়া হচ্ছে।

স্কুলগুলো আজ সাজছে নতুন সাজে, বিদায় সংবর্ধনা আর মিলাদ মাহফিলের আয়োজনে প্রতিটি বিদ্যাপীঠ যেন এক স্বর্গীয় রূপ ধারণ করেছে। প্রিয় স্কুলের বারান্দা আর বটতলার সেই আড্ডাগুলো এখন বড় বেশি মায়াবী হয়ে ধরা দিচ্ছে প্রতিটি পরীক্ষার্থীর কাছে।

স্মৃতিচারণের এক বিশাল মেলা বসেছে যেন প্রতিটি মনে, যেখানে ফেলে আসা দশ বছরের হাজারো দুষ্টুমি আর হাসিকান্নার গল্প ভিড় করে আসে। সেই প্রথম দিনের স্কুলে যাওয়া থেকে আজকের এই পূর্ণতা- সবই যেন এক রূপকথার মতো মনে হয় এই সন্ধিক্ষণে। এসএসসি শেষ হওয়া মানেই এক নতুন যাত্রার শুরু, যেখানে কিশোররা শৈশবের গণ্ডি পেরিয়ে কৈশোর আর যৌবনের সন্ধিক্ষণে পদার্পণ করে। জীবনের বৃহত্তর আঙিনায় প্রবেশের এই চাবিকাঠিটি অর্জনের জন্য তারা আজ মরিয়া এবং দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ। যথাযথ মেধা মূল্যায়নের মাধ্যমে এই পরীক্ষাটি শিক্ষার্থীদের প্রকৃত সামর্থ্য নিরূপণ করে এবং তাদের সক্ষমতা অনুযায়ী উচ্চশিক্ষার পথ প্রশস্ত করে দেয়। স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ মূল্যায়নের এই ধারাটিই আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার মেরুদণ্ড হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। পরীক্ষার্থীদের প্রতি সমাজের সর্বস্তরের মানুষের সহমর্মিতা আজ চোখে পড়ার মতো, যা এক শান্তিময় ও উৎসবমুখর পরিবেশ বজায় রাখতে সাহায্য করছে। ছোটদের প্রতি বড়দের এই ভালোবাসা আর সহানুভূতি যেন আমাদের জাতীয় ঐক্যের এক অনন্য প্রতিফলন।

স্বপ্ন পূরণের এই সিঁড়িতে পা রেখে প্রতিটি শিক্ষার্থী আজ নিজেকে এক নতুন উচ্চতায় দেখতে চায়, যেখানে শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, জড়িয়ে আছে দেশের সমৃদ্ধি। তাদের প্রতিটি কলমের দাগ যেন আগামীর ডিজিটাল বাংলাদেশের এক একটি পিক্সেল হয়ে ধরা দিচ্ছে। পাহাড়সম প্রত্যাশার চাপে যেন পিষ্ট না হয়ে কিশোররা সাবলীলভাবে পরীক্ষা দিতে পারে, সেদিকে খেয়াল রাখা আমাদের সবার নৈতিক দায়িত্ব। পাহাড়ের মতো অটল থেকে প্রতিকূলতা জয় করাই হোক এই শিক্ষা উৎসবের মূল শিক্ষা।

সর্বোপরি, এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা ২০২৬ শুধু এক সেট প্রশ্নপত্রের উত্তর দেওয়া নয়, বরং এটি একটি জাতির মেধা ও মনন বিকাশের মহোত্তম প্রদর্শনী।

এই উৎসবের মধ্য দিয়ে প্রতিটি শিক্ষার্থী যেন সুনাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠে এবং দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে লাল-সবুজের পতাকাকে বিশ্বদরবারে আরও উঁচুতে তুলে ধরে- এই হোক আমাদের প্রার্থনা।

পরিশেষে বলা যায়, ২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা শুধু মেধা যাচাইয়ের ক্ষেত্র নয়, বরং এটি আমাদের জাতীয় ঐক্যের প্রতীক। পাহাড়সম প্রত্যাশা আর আকাশচুম্বী স্বপ্ন নিয়ে যে যাত্রা শুরু হতে যাচ্ছে, তা যেন প্রতিটি শিক্ষার্থীর জীবনে সাফল্যের আলোকবর্তিকা হয়ে আসে। হে নবীন শিক্ষার্থী, তোমার কলমের কালিতে লেখা হোক এক সমৃদ্ধ বাংলাদেশের নতুন ইতিহাস; তোমাদের এই নতুন যাত্রায় আমাদের অন্তহীন শুভকামনা রইল।

ড. মো. আনোয়ার হোসেন

প্রেসিডেন্ট, আন্তর্জাতিক মাদকবিরোধী সংগঠন, ফ্রিডম ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্টি অ্যালকোহল