সড়কের পাশে ময়লার ভাগাড়
সুমাইয়া সিরাজ সিমি
প্রকাশ : ২২ এপ্রিল ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
দুপুরের রোদে কিংবা বিকালের ব্যস্ত সময়ে দেশের কোনো শহরের রাস্তায় একটু হেঁটে দেখলেই বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। চারপাশে যানবাহনের শব্দ, মানুষের ভিড় আর তার মধ্যেই চোখে পড়ে রাস্তার ধারে জমে থাকা ময়লার স্তূপ। বাতাসে ভেসে আসে পচা আবর্জনার তীব্র দুর্গন্ধ, যা শুধু অস্বস্তিই নয়, এক ধরনের অসহায়তার অনুভূতিও তৈরি করে। এই দৃশ্য এখন আর ব্যতিক্রম নয় বরং বাংলাদেশের অধিকাংশ নগরের এক সাধারণ চিত্রে পরিণত হয়েছে।
শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, বাজার এলাকা, বাসস্ট্যান্ড কিংবা অলিগলিতে প্রতিদিনই জমে থাকে নানা ধরনের বর্জ্য। কোথাও প্লাস্টিকের স্তূপ, কোথাও খাবারের উচ্ছিষ্ট, আবার কোথাও গৃহস্থালির ময়লা দিনের পর দিন পড়ে থাকে। অনেক সময় দেখা যায়, রাস্তার একপাশ দিয়ে মানুষ ও যানবাহন স্বাভাবিকভাবে চলাচল করছে, আর অন্যপাশে জমে থাকা আবর্জনা পুরো পরিবেশকে করে তুলেছে অস্বাস্থ্যকর ও দুর্গন্ধময়। এই অবস্থায় পথচারীদের নাক চেপে পথ চলা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না।
এমন বাস্তবতা আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো- এই অবস্থার জন্য দায়ী কে? আমরা নাগরিকরা, নাকি দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ? আমাদের আচরণের দিকে তাকালে বিষয়টির একটি বড় অংশ স্পষ্ট হয়ে যায়। আমরা অনেকেই খুব স্বাভাবিকভাবে যেখানে-সেখানে ময়লা ফেলি। রাস্তার মধ্যখানে, ফুটপাতে, ড্রেনের পাশে কিংবা খালি জায়গায় যেখানেই সুবিধা পাই, সেখানেই ময়লা ফেলে দিই। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে পানির বোতল ফেলে দেওয়া, খাবারের প্যাকেট ছুড়ে ফেলা, কিংবা বাসার ময়লা এনে রাস্তায় ফেলে রাখা এসব যেন আমাদের দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। যেন রাস্তা আমাদের ব্যক্তিগত ডাস্টবিন। এই অভ্যাসটি এতটাই সাধারণ হয়ে গেছে যে অনেকেই এটিকে ভুল বলেই মনে করেন না। আমরা মনে করি, ‘একটু ফেললে কী হবে?’ কিন্তু এই একটু’ই প্রতিদিন জমে বিশাল সমস্যায় রূপ নিচ্ছে।
এই অভ্যাসের পেছনে রয়েছে একটি বিপজ্জনক মানসিকতা- ‘সবাই করছে, আমিও করি।’ যখন আমরা দেখি অন্য কেউ রাস্তার উপর ময়লা ফেলছে, তখন সেটিকে অস্বাভাবিক মনে হয় না। বরং আমরা সেটিকে গ্রহণ করে নেই। ফলে একটি ভুল কাজ ধীরে ধীরে সামাজিকভাবে স্বাভাবিক হয়ে ওঠে।
কিন্তু একটি শহরের রাস্তা কখনোই ময়লা ফেলার জায়গা হতে পারে না। এটি শুধু চলাচলের পথ নয়, এটি একটি শহরের পরিচয় বহন করে। একটি শহরের পরিচ্ছন্নতা তার নাগরিকদের সচেতনতা ও সভ্যতার প্রতিফলন। অথচ আমরা নিজেরাই সেই পরিচয়কে ক্ষতিগ্রস্ত করছি আমাদের অসচেতন আচরণের মাধ্যমে। তবে পুরো দায় যদি শুধুই নাগরিকদের উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে সেটিও হবে অন্যায়। কারণ বাস্তবতা হলো- দেশের অনেক শহরে এখনও পর্যাপ্ত ডাস্টবিন নেই। কোথাও ডাস্টবিন থাকলেও তা নিয়মিত পরিষ্কার করা হয় না, ফলে উপচে পড়ে ময়লা। অনেক এলাকায় নির্দিষ্ট বর্জ্য ফেলার স্থান নেই বললেই চলে। এমন পরিস্থিতিতে অনেকেই বাধ্য হয়ে কাছের রাস্তার পাশেই ময়লা ফেলে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় এই ঘাটতি এবং পরিকল্পনার অভাব সমস্যাটিকে আরও তীব্র করে তুলছে।
কিন্তু এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে- ডাস্টবিনের অভাব কি আমাদের দায়মুক্ত করে দেয়? বাস্তবে দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রে ডাস্টবিন থাকা সত্ত্বেও মানুষ তা ব্যবহার করে না। কয়েক কদম হাঁটার চেয়ে তারা যেখানে দাঁড়িয়ে আছে সেখানেই ময়লা ফেলে চলে যেতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। এই মানসিকতা বদলানোই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশের বিভিন্ন শহরের বাজার এলাকায় গেলে দেখা যায়, দোকানিরা দোকান পরিষ্কার করে সেই ময়লা সরাসরি রাস্তায় ফেলে দেয়। পথচারীরাও একইভাবে চলতে চলতে ময়লা ফেলে যায়। দিনের শেষে রাস্তা হয়ে ওঠে আবর্জনার স্তূপ, আর সেখান থেকে ছড়ায় অসহ্য দুর্গন্ধ। এই দুর্গন্ধ শুধু অস্বস্তির কারণ নয়, এটি জনস্বাস্থ্যের জন্যও মারাত্মক হুমকি। জমে থাকা ময়লা থেকে জন্ম নেয় রোগবাহক পোকামাকড়, বিশেষ করে মশা, যা ডেঙ্গু ও ম্যালেরিয়ার মতো রোগ ছড়াতে সহায়তা করে। পচা বর্জ্য থেকে নির্গত গ্যাস বায়ুদূষণ বাড়ায়, যা শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন শারীরিক সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ড্রেনের মুখ বন্ধ হয়ে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়, যা বর্ষাকালে পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তোলে।
এই সমস্যার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আইন প্রয়োগের দুর্বলতা। যেখানে-সেখানে ময়লা ফেলার বিরুদ্ধে আইন থাকলেও তার কার্যকর প্রয়োগ খুব কমই দেখা যায়। কেউ প্রকাশ্যে ময়লা ফেললেও তাকে কোনো ধরনের শাস্তির সম্মুখীন হতে হয় না। ফলে এই প্রবণতা দিন দিন আরও বেড়ে যাচ্ছে। অর্থনৈতিক দিক থেকেও এই সমস্যার প্রভাব কম নয়। শহর পরিষ্কার রাখতে সরকারকে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে, যা উন্নয়নের অন্যান্য খাতে ব্যবহার করা যেত। পাশাপাশি নোংরা পরিবেশ দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করছে এবং পর্যটনের ক্ষেত্রেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তাহলে সমাধান কোথায়?
প্রথমত, সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আরও কার্যকর ও আধুনিক উদ্যোগ নিতে হবে। পর্যাপ্ত ডাস্টবিন স্থাপন, নিয়মিত বর্জ্য অপসারণ এবং নির্দিষ্ট ডাম্পিং ব্যবস্থার উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে আইন প্রয়োগ জোরদার করতে হবে, যাতে কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে ময়লা ফেললে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
দ্বিতীয়ত, নাগরিকদের নিজেদের আচরণ পরিবর্তন করতে হবে। ডাস্টবিন না পাওয়া গেলে ময়লা কিছু সময় নিজের কাছে রাখা খুব কঠিন কিছু নয়। বরং এটি একটি দায়িত্বশীল নাগরিকের পরিচয়। পরিবার থেকে শুরু করে সমাজের প্রতিটি স্তরে পরিচ্ছন্নতার শিক্ষা ছড়িয়ে দিতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এই সমস্যাকে ‘কার দায়’ হিসেবে না দেখে ‘আমাদের সবার দায়িত্ব’ হিসেবে দেখা। কারণ শহর আমাদের, এর পরিবেশও আমাদের জীবনযাত্রার অংশ। আমরা যদি নিজেরাই দায়িত্ব নিতে শিখি, তাহলে পরিবর্তন সম্ভব। পরিচ্ছন্ন শহর গড়ে তোলা কোনো বিলাসিতা নয়, এটি একটি মৌলিক প্রয়োজন। আমরা যদি এখনই আমাদের অভ্যাস পরিবর্তন না করি, তাহলে ভবিষ্যতে এই সমস্যা আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।
তাই সময় এসেছে নিজেদের প্রশ্ন করার- আমি কি আমার শহরকে পরিষ্কার রাখতে দায়িত্বশীল? কারণ রাস্তা কখনোই ডাস্টবিন নয়; এটি আমাদের চলার পথ, আমাদের সভ্যতার প্রতিচ্ছবি। কিন্তু আমরা যদি আমাদের অভ্যাস পরিবর্তন না করি, তাহলে সেই রাস্তা ধীরে ধীরে ডাস্টবিনেই পরিণত হবে। আর তখন দায় কার, সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেয়ে বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়াটাই হবে আরও কঠিন।
সুমাইয়া সিরাজ সিমি
শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়
