জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির চাপে পিষ্ট জনজীবন
প্রকাশ : ২২ এপ্রিল ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতিতে জ্বালানি তেল শুধু একটি পণ্য নয়, বরং এটি অর্থনীতির চালিকাশক্তি। সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানি তেলের দফায় দফায় মূল্যবৃদ্ধি দেশের সাধারণ মানুষের জীবনে এক ভয়াবহ দুর্যোগের বার্তা নিয়ে এসেছে। যখন আন্তর্জাতিক বাজারের দোহাই দিয়ে দেশীয় বাজারে তেলের দাম বাড়ানো হয়, তখন তার প্রভাব শুধু পরিবহন ভাড়ায় সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তা চাল-ডাল-নুন থেকে শুরু করে প্রতিটি নিত্যপণ্যের গায়ের দাম বাড়িয়ে দেয়। এই অসহনীয় মূল্যস্ফীতির চাপে পিষ্ট সাধারণ জনগণ কীভাবে এই পরিস্থিতি সামলাবে, তা এখন জাতীয় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে প্রথমেই আঘাত আসে পরিবহন খাতে। পণ্যবাহী ট্রাকের ভাড়া বৃদ্ধি পাওয়ায় পাইকারি ও খুচরা বাজারে সবজির দাম আকাশচুম্বী হয়। অন্যদিকে, কৃষিপ্রধান এই দেশে সেচ কাজের জন্য ডিজেলের ব্যবহার অপরিহার্য। তেলের দাম বাড়লে চাষাবাদ খরচ বাড়ে, যার চূড়ান্ত মাশুল দিতে হয় সাধারণ ভোক্তাকে। যখন আয় থাকে স্থির কিন্তু ব্যয়ের পাল্লা ভারী হতে থাকে, তখন নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো সঞ্চয় হারিয়ে ঋণের জালে জড়িয়ে পড়ে। এই বৈরী পরিস্থিতি সামলাতে জনগণ মূলত তিনটি উপায়ে টিকে থাকার চেষ্টা করছে-
ভোগব্যয় হ্রাস : অধিকাংশ মানুষ তাদের খাদ্য তালিকা থেকে প্রোটিন ও পুষ্টিকর খাবার বাদ দিয়ে কোনোমতে পেট ভরানোর চেষ্টা করছে। শিক্ষা ও চিকিৎসার মতো মৌলিক খাতগুলোতে খরচ কমিয়ে তারা প্রতিদিনের বাজারের হিসাব মেলাচ্ছে।
বিকল্প যাতায়াত : মধ্যবিত্ত শ্রেণি ব্যক্তিগত বাহন ছেড়ে গণপরিবহনে ঝুঁকছে, এমনকি অনেকে স্বল্প দূরত্বে হেঁটে বা সাইকেলে যাতায়াত করে খরচ বাঁচানোর চেষ্টা করছে।
অতিরিক্ত শ্রম : আয়ের ঘাটতি মেটাতে সাধারণ মানুষ অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা ব্যয় করছে, যা তাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে।
তেলের দাম বাড়লে একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী ‘কৃত্রিম সংকট’ তৈরি করে পণ্যের দাম কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেয়। সরকার তেলের দাম যে অনুপাতে বাড়ায়, বাজারে তার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি প্রভাব পড়ে। এই অরাজকতা রুখতে হলে কঠোর বাজার মনিটরিংয়ের কোনো বিকল্প নেই। টিসিবির মাধ্যমে সাশ্রয়ী মূল্যে পণ্য সরবরাহ শুধু শহরকেন্দ্রিক না রেখে গ্রাম পর্যায়েও বিস্তৃত করা জরুরি।
মূল্যস্ফীতির চাপ থেকে সাধারণ মানুষকে বাঁচাতে হলে সরকারকে বহুমুখী পদক্ষেপ নিতে হবে। উন্নয়ন প্রকল্পের চেয়ে মানুষের জীবনযাত্রার স্থায়িত্বকে প্রাধান্য দিয়ে জ্বালানি খাতে ভর্তুকি সচল রাখা প্রয়োজন। ওএমএস এবং খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতা আরও বাড়াতে হবে যেন কোনো পরিবার অনাহারে না থাকে। দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য সৌরশক্তি ও প্রাকৃতিক গ্যাসের ব্যবহার বাড়িয়ে আমদানিকৃত তেলের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে হবে।
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি মানেই সাধারণ মানুষের পকেটে সরাসরি আঘাত। উন্নয়নের জোয়ার তখনই সার্থক হবে, যখন মানুষের জীবনযাত্রায় স্বস্তি থাকবে। বর্তমানের এই ঊর্ধ্বমুখী মূল্যস্ফীতি শুধু একটি অর্থনৈতিক সমস্যা নয়, এটি একটি মানবিক সংকটও বটে। জনগণের সহনশীলতার বাঁধ ভেঙে যাওয়ার আগেই সরকারকে কার্যকর নীতি গ্রহণ করতে হবে। তেলের দাম বাড়ানো যদি অপরিহার্য হয়, তবে তার বিপরীতে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা সুরক্ষা ও বাজার সিন্ডিকেট ভেঙে ফেলার সৎসাহস সরকারকে দেখাতে হবে। অন্যথায়, সাধারণ মানুষের জীবন শুধু টিকে থাকার লড়াইয়েই পর্যবসিত হবে।
