সাহিত্যচর্চার সংকটে নতুন প্রজন্ম

বাপ্পাদিত্য চৌধুরী প্রবাল, উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ, মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ

প্রকাশ : ২৫ এপ্রিল ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

গত ২৩ এপ্রিল ছিল বিশ্ব বই দিবস- বই, পাঠাভ্যাস এবং জ্ঞানচর্চার গুরুত্ব স্মরণ করার এটি একটি বিশেষ দিন। কিন্তু এমন একটি দিনের পরেই যখন আমরা নিজেদের বাস্তবতার দিকে আঁখি মেলি, তখন প্রশ্ন জাগে- আমরা কি সত্যিই বইয়ের সঙ্গে আমাদের সুসম্পর্কটিকে ধরে রাখতে পেরেছি? এই প্রশ্ন থেকেই উঠে আসে নতুন প্রজন্মের সাহিত্যচর্চার সংকটের বিষয়টি। সাহিত্য শব্দের উৎপত্তি ‘সহিত’ শব্দ হতে। অর্থাৎ সাহিত্য মানে মিলনের ভাবকে বোঝায়- বইয়ের সঙ্গে বইয়ের, আত্মার সঙ্গে আত্মার। বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক জীবনে সাহিত্যচর্চা একসময় ছিল দৈনন্দিন জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। বই পড়া, লাইব্রেরিতে সময় কাটানো, সাহিত্য নিয়ে আলোচনা- এসব নিছক অভ্যাস নয়, বরং বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক অনুশীলন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ছিল। কিন্তু আধুনিক যুগে সেই চিত্র ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে। নতুন প্রজন্মের মধ্যে বই পড়ার অভ্যাস কমে যাওয়া এবং সাহিত্যচর্চার প্রতি অনাগ্রহ প্রবণতা এখন একটি বাস্তব ও উদ্বেগজনক সামাজিক সংকটে পরিণত হয়েছে।

এই পরিবর্তনের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে প্রযুক্তিনির্ভর জীবনযাত্রা। স্মার্টফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং অনলাইন বিনোদনের সহজলভ্যতা মানুষের সময় ও মনোযোগ কেড়ে নিয়েছে। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে বই পড়া বা সাহিত্য অনুধাবনের মতো ধৈর্যনির্ভর অভ্যাস ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছে। দ্রুত তথ্য পাওয়ার প্রবণতা মানুষকে গভীরভাবে চিন্তা করার বদলে শর্টকার্ট ও তাৎক্ষণিক কনটেন্টের দিকে বেশি আকৃষ্ট করছে। বাংলাদেশের পাঠাভ্যাস নিয়ে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় বিভিন্ন গবেষণায় উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। CEO WORLD Magayine-Gi World Reading Rankings ২০২৪ অনুযায়ী, ১০২টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৯৭তম। দেশে একজন মানুষ বছরে গড়ে প্রায় ২ থেকে ৩টি বই পড়েন, যা বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় অনেক কম। উন্নত দেশগুলোতে এই সংখ্যা সাধারণত ১০টিরও বেশি, যা পাঠসংস্কৃতির বড় পার্থক্য তুলে ধরে। দেশীয় বাস্তবতাও একই আশঙ্কাজনক চিত্র প্রকাশ করে। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর পরিচালিত National Student Assessment (NSA) 2022 অনুযায়ী, প্রাথমিক স্তরের ৫০ শতাংশের বেশি শিক্ষার্থী পড়তে শিখলেও তার অর্থ অনুধাবন করতে পারে না। অর্থাৎ তারা শব্দ পড়তে পারলেও গভীরভাবে সেটি বুঝতে পারছে না, যা ভবিষ্যৎ সাহিত্যচর্চার জন্য একটি বড় প্রতিবন্ধকতাস্বরূপ। লাইব্রেরি ব্যবস্থার অবস্থাও এই সংকটকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। বাংলাদেশ জাতীয় গ্রন্থাগার ও আর্কাইভসের অধীনে দেশে জাতীয়, বিভাগীয় ও জেলা মিলিয়ে সরকারি পাবলিক লাইব্রেরি রয়েছে প্রায় ৭০টির মতো। এর বাইরে কলেজ, স্কুল, প্রতিষ্ঠান ও কমিউনিটি মিলিয়ে দেশে মোট লাইব্রেরির সংখ্যা আনুমানিক ৪,০০০ - ৬,০০০ এর বেশি। কিন্তু সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো- লাইব্রেরির সংখ্যা নয়, বরং সেগুলোর ব্যবহার। সংখ্যার হিসেবে লাইব্রেরির প্রাচুর্যতা থাকলেও সেখানে নিয়মিত পাঠকের সংখ্যা কমে যাচ্ছে এবং অনেক জায়গায় এটি শুধু প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতির কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বলা ভালো- লাইব্রেরি থাকলেও তা ব্যবহার না করলে তার কার্যকারিতা হারিয়ে যায়। অনেক শিক্ষার্থী লাইব্রেরিতে গেলেও শুধু নোট বা গাইড বইয়ের ওপর নির্ভর করেন, সৃজনশীল বই পড়ার আগ্রহ তুলনামূলকভাবে কম। ফলে প্রকৃত পাঠাভ্যাস গড়ে ওঠে না এবং সাহিত্যচর্চা ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে। orld Bank–এর Learning Poverty Report অনুযায়ী, বাংলাদেশের একটি বড় অংশের শিশু সাধারণ অনুচ্ছেদ বা গল্প বুঝতে ব্যর্থ হচ্ছে। এই দুর্বল ভিত্তি ভবিষ্যতে সাহিত্যচর্চার জন্য বড় বাধা তৈরি করছে, কারণ সাহিত্য বোঝার জন্য শুধু পড়া নয়, প্রয়োজন অনুভব ও বিশ্লেষণের সূক্ষ্মতা ।

অন্যদিকে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যবিজ্ঞান ও গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনা বিভাগের গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের তরুণদের একটি বড় অংশ বই পড়ার চেয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশি সময় ব্যয় করে। এই প্রবণতাকে গবেষকরা ‘ডিজিটাল ডিস্ট্রাকশন’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন, যা মনোযোগ ও গভীর পাঠাভ্যাস উভয়কেই দুর্বল করছে। তবে পুরো চিত্রটি একেবারেই যে হতাশাজনক, এমনটা নয়। এত ব্যস্ততার মধ্যেও এখনও অনেক তরুণ-তরুণী বই পড়ছে, নতুন প্রজন্মের অনেকেই লেখালেখিতে যুক্ত হচ্ছেন (বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরাম নতুন লেখক নির্মাণ করছে) এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্মে সাহিত্যচর্চা করছে।