জনভোগান্তির নাম ‘বাসভাড়া’ নৈরাজ্য কি থামবে না?

প্রকাশ : ২৫ এপ্রিল ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

গণপরিবহন একটি দেশের অর্থনীতির ধমনী। আর সেই ধমনীতে যদি রক্ত চলাচলের বদলে বিষক্রিয়া শুরু হয়, তবে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় নাভিশ্বাস ওঠাই স্বাভাবিক। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয় বা অন্যান্য অজুহাতে বাসভাড়া বৃদ্ধি এবং সেই বর্ধিতভাড়া আদায়ের ক্ষেত্রে মালিক-শ্রমিকদের স্বেচ্ছাচারিতা এক চরম অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। প্রশ্ন উঠেছে- বাস মালিকরা কি আদৌ নিয়ম অনুযায়ী ভাড়া আদায় করছেন, নাকি সাধারণ যাত্রীদের পকেট কাটাকেই তারা অলিখিত নিয়মে পরিণত করেছেন?

সরকার যখনই বাসের ভাড়া পুনর্নির্ধারণ করে, তখন যাত্রী সাধারণের জন্য তা আশীর্বাদ না হয়ে অভিশাপ হয়ে দাঁড়ায়। বিআরটিএ কর্তৃক নির্ধারিত ভাড়ার চার্ট প্রতিটি বাসে দৃশ্যমান থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে তার দেখা মেলা ভার। অধিকাংশ বাসে এই চার্ট গায়েব করে দেওয়া হয় অথবা এমন জায়গায় রাখা হয় যা যাত্রীদের দৃষ্টিগোচর হয় না। ফলে কন্ডাক্টররা নিজেদের খুশিমতো ‘ওয়েবিল’ বা ‘গেট লক’ সার্ভিসের দোহাই দিয়ে অতিরিক্ত টাকা আদায় করে।

ঢাকার অভ্যন্তরীণ রুটে কিলোমিটার প্রতি ভাড়ার যে হিসাব সরকার দেয়, রাজপথের বাস্তবচিত্র তার চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, এক স্টপেজ থেকে অন্য স্টপেজের দূরত্ব মাত্র এক বা দুই কিলোমিটার হলেও যাত্রীদের কাছ থেকে সর্বনিম্ন ভাড়ার নামে ১০-১৫ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এটাকে ভাড়া আদায় না বলে সরাসরি ‘চাঁদাবাজি’ বললেও অত্যুক্তি হবে না।

বাস মালিকদের চিরচেনা অজুহাত হলো- রাস্তার যানজট, খুচরা যন্ত্রাংশের দাম বৃদ্ধি এবং পথে পথে দেওয়া ‘চাঁদা’। তাদের দাবি, সরকার যে ভাড়া নির্ধারণ করে দেয় তা দিয়ে তাদের খরচ ওঠে না। কিন্তু বাস্তবতা হলো, একজন সাধারণ যাত্রী যখন বাসে ওঠেন, তখন তিনি কোনো বিলাসিতা নয় বরং প্রয়োজনে যাতায়াত করেন। মালিকপক্ষের অভ্যন্তরীণ খরচ বা অব্যবস্থাপনার দায়ভার কেন সাধারণ যাত্রীকে বহন করতে হবে?

এছাড়া অনেক বাসের ফিটনেস নেই, সিটের অবস্থা করুণ, নেই ফ্যান বা পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা। যাত্রীসেবার মান তলানিতে রেখে ভাড়ার জন্য চাপ দেওয়া এক ধরণের নৈতিক স্খলন। লক্কড়-ঝক্কড় বাসে চড়েও যদি যাত্রীকে এসি বাসের সমান ভাড়া গুনতে হয়, তবে রাষ্ট্রীয় তদারকি সংস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

রাজধানীর গণপরিবহনে ‘সিটিং সার্ভিস’ বা ‘গেট লক’ সেবা এক অভিনব প্রতারণার নাম। সরকার কয়েকবার এই সার্ভিস বন্ধের ঘোষণা দিলেও মালিকদের চাপে তা বারবার থমকে গেছে। সিটিং সার্ভিসের নাম করে কোনো যাত্রী মাঝপথে নামলেও তাকে শেষ গন্তব্যের ভাড়া দিতে বাধ্য করা হয়। অথচ এসব বাসেও ঠাসাঠাসি করে যাত্রী তোলা হয়। মালিকরা একদিকে আইন মানছেন না, অন্যদিকে যাত্রীদের পকেট খালি করছেন। সাধারণ মানুষের আয়ের সিংহভাগ যদি যাতায়াত খরচেই চলে যায়, তবে তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন হবে কীভাবে?

বাসভাড়া নিয়ে এই নৈরাজ্যের প্রধান কারণ হলো যথাযথ তদারকির অভাব। মাঝেমধ্যে বিআরটিএ’র ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালায়, কিছু জরিমানা করা হয়; কিন্তু তা যেন সমুদ্রের মাঝে এক ফোঁটা জল। অভিযান শেষ হতে না হতেই পরিস্থিতি আবার আগের রূপে ফিরে আসে। মালিকরা এতটাই শক্তিশালী যে, অনেক সময় প্রশাসনের নির্দেশকেও তারা বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখান। পরিবহন খাতের ওপর এক ধরনের অদৃশ্য ‘মাফিয়া’ নিয়ন্ত্রণ বজায় রয়েছে বলে সাধারণ মানুষের ধারণা। এই অরাজকতা বন্ধ করতে হলে শুধু কাগজ-কলমে ভাড়া নির্ধারণ করলেই হবে না, প্রয়োজন কঠোর প্রয়োগ। নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো নেওয়া জরুরি হতে পারে-

ডিজিটাল টিকিট সিস্টেম : প্রতিটি বাসে ই-টিকেটিং বাধ্যতামূলক করতে হবে। যাত্রী কত কিলোমিটার ভ্রমণ করছেন, তার ওপর ভিত্তি করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভাড়া নির্ধারিত হবে।

দৃশ্যমান ভাড়ার চার্ট : প্রতিটি বাসের প্রবেশপথে এবং ভেতরে বড় করে ভাড়ার তালিকা টাঙাতে হবে। চার্ট না থাকলে বাসের লাইসেন্স বাতিলের কঠোর আইন করতে হবে।

অভিযোগ কেন্দ্র : যাত্রীদের জন্য সহজলভ্য হটলাইন বা অ্যাপ চালু করতে হবে, যেখানে অভিযোগ করলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ফ্র্যাঞ্চাইজি পদ্ধতি : বড় শহরগুলোতে বিক্ষিপ্ত বাসের বদলে কয়েকটি নির্দিষ্ট কোম্পানির অধীনে বাসের রুট পারমিট দিতে হবে, যাতে জবাবদিহিতা নিশ্চিত হয়।

গণপরিবহনে শৃঙ্খলার অভাব একটি সভ্য সমাজের জন্য লজ্জাজনক। বাস মালিকদের অতি-মুনাফা লাভের লোভ এবং সাধারণ যাত্রীদের জিম্মি করার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। সরকারকে কঠোর অবস্থানে থেকে যাত্রী অধিকার রক্ষা করতে হবে। মনে রাখতে হবে, সাধারণ মানুষের পিঠ দেওয়ালে ঠেকে গেলে সেই অসন্তোষের অনল পুরো সমাজব্যবস্থাকেই ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তাই সময় থাকতেই বাসভাড়া আদায়ের এই লাগামহীন ঘোড়াকে বশ করা প্রয়োজন। সাধারণ যাত্রীদের কষ্টের টাকা যেন মালিকদের পকেটের অবৈধ উৎস না হয়- এটাই আজকের প্রত্যাশা।