স্ক্রিনের ফাঁদে বন্দি আগামী প্রজন্ম
শিমলা পাল, তরুণ কলামিস্ট ও লেখক, আইন বিভাগ, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
প্রকাশ : ২৬ এপ্রিল ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বিকালের সোনাঝরা রোদ এখন আর কোনো কিশোরকে মাঠে টানে না, বরং ঘরের কোণে নীল আলোর এক মায়াবী স্ক্রিন তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে। এক সময় মায়েরা রূপকথার গল্প শুনিয়ে শিশুকে ঘুম পাড়াতেন, আর এখন সেই জায়গা দখল করেছে স্ক্রিনের কৃত্রিম কোলাহল। আমরা সন্তানদের হাতে বিশ্বজগত তুলে দেওয়ার নাম করে আসলে তাদের এক যান্ত্রিক খাঁচায় পুরে ফেলেছি। আমাদের আগামী প্রজন্ম নিঃশব্দে এমন এক রঙিন খাঁচায় বন্দি হয়ে পড়ছে, যেখানে রক্ত-মাংসের মানুষের চেয়ে যান্ত্রিক পিক্সেলের আবেদন অনেক বেশি গভীর আর সংক্রামক। ভবিষ্যতের কর্ণধাররা এখন গভীর গোলকধাঁধায় বন্দি, যেখান থেকে বের হওয়ার পথটা দিন দিন অন্ধকার হয়ে আসছে। তারা প্রযুক্তির উৎকর্ষে বড় হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু মানুষের মতো মানুষ হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় মানবিক উষ্ণতা আর মাটির ঘ্রাণ পাচ্ছে?
প্রযুক্তি আমাদের জীবন সহজ করেছে সত্য, কিন্তু আমাদের সন্তানদের কাছ থেকে কেড়ে নিচ্ছে তাদের অমলিন শৈশব। স্মার্টফোন, ট্যাব, ল্যাপটপ কিংবা টেলিভিশন এসব প্রযুক্তির অনিবার্য উপস্থিতি আজকের প্রজন্মকে এমন এক জগতে আবদ্ধ করেছে, যেখানে বাস্তবতার চেয়ে ভার্চুয়াল জীবনই বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে। মনোবিজ্ঞানীরা একে বলছেন ‘ডিজিটাল ড্রাগ’। আমরা যখন একটি শিশুকে কান্না থামানোর জন্য বা দ্রুত খাবার খাওয়ানোর জন্য হাতে ফোন তুলে দিচ্ছি, তখন অজান্তেই তার কচি মস্তিষ্কে ডোপামিনের এক কৃত্রিম জোয়ার তৈরি করছি।
এই নীল আলোর মায়া মাদকের চেয়েও ভয়াবহ হয়ে উঠছে। যেমন আগের দিনের শিশুরা গাছ থেকে ফুল পাড়া কিংবা আকাশ দেখার মধ্যে যে আনন্দ খুঁজে পেত, আজকের শিশু তা পায় একটার পর একটা ছোট ভিডিও সোয়াইপ করে। এই নিরন্তর উত্তেজনা তাদের মস্তিষ্কের স্বাভাবিক গঠন ব্যাহত করছে, যার ফলে তাদের ধৈর্য কমছে এবং কোনো বিষয়ে গভীরভাবে মনোযোগ দেওয়ার ক্ষমতা বিলুপ্ত হচ্ছে। তারা এখন আর দীর্ঘ গল্প শুনতে চায় না, বরং কয়েক সেকেন্ডের উত্তেজনায় বুঁদ হয়ে থাকতে চায়।
একসময় বিকালের খেলাধুলা, বই পড়া বা পারিবারিক গল্পগুজব ছিল শিশুদের বেড়ে ওঠার অবিচ্ছেদ্য অংশ। এখন সেই জায়গা দখল করে নিয়েছে অনলাইন গেম, সোশ্যাল মিডিয়া আর ভিডিও কনটেন্ট। মানুষ সামাজিক জীব; একে অপরের চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলা, অন্যের কষ্টে সমব্যথী হওয়া কিংবা খেলার মাঠে হেরে গিয়ে আবার উঠে দাঁড়ানো এগুলো মানুষ শেখে সমাজ ও পরিবেশ থেকে।
কিন্তু স্ক্রিনে বন্দি প্রজন্ম এখন শিখছে ইমোজির ভাষা। তাদের আবেগ এখন লাইক, কমেন্ট আর ভার্চুয়াল রিঅ্যাকশনের ওপর নির্ভরশীল। হাজার হাজার অনলাইন ফ্রেন্ড থাকলেও দিনশেষে তারা প্রচণ্ড একাকী। এই একাকীত্ব থেকে জন্ম নিচ্ছে নিভৃত বিষণ্ণতা ও তীব্র অস্থিরতা। স্ক্রিনের ওপারে থাকা কৃত্রিম জগত তাদের শেখাচ্ছে যে সবকিছু এক ক্লিকেই পাওয়া যায়, অথচ বাস্তব জীবন অতটা সহজ নয়। জীবনের রূঢ় বাস্তবতার সঙ্গে যখন তাদের এই ভার্চুয়াল প্রত্যাশার সংঘাত ঘটে, তখনই তারা মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছে।
শারীরিক স্বাস্থ্যের দিকটি তো আরও করুণ। বাংলাদেশের শিশুরা প্রতিদিন গড়ে প্রায় তিন ঘণ্টা স্মার্টফোন ব্যবহার করে, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক সুপারিশকৃত সর্বোচ্চ সময়ের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি। দিনের পর দিন রোদে না যাওয়া, ঘাসের ওপর না হাঁটা আর ঘাম ঝরানো খেলাধুলা না করার ফলে শিশুদের শারীরিক বিকাশ থমকে যাচ্ছে। স্থূলতা, চোখের দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ হয়ে আসা এবং মেরুদণ্ডের ব্যথার মতো বার্ধক্যজনিত সমস্যা এখন শৈশবেই হানা দিচ্ছে। এর চেয়েও বড় শঙ্কা হলো সাইবার বুলিং এবং ইন্টারনেটের অন্ধকার গলি। একটি অপরিণত মস্তিষ্ক যখন ইন্টারনেটের বিশাল সমুদ্রে কোনো ফিল্টার ছাড়াই ঘুরে বেড়ায়, তখন সে এমন অনেক কিছুর সম্মুখীন হয় যা তার নৈতিক ও মানসিক মেরুদণ্ডকে কুরে কুরে খায়।
তবে এই পরিস্থিতির জন্য আমরা অভিভাবকরা কি দায় এড়াতে পারি? অনেক সময় নিজেদের ব্যস্ততা সামলাতে বা একটু আড্ডার সুযোগ পেতে আমরাই সন্তানদের হাতে ডিভাইস তুলে দিয়েছি। সন্তান যখন দেখে তার বাবা-মা খাবার টেবিলে বসেও স্ক্রিন স্ক্রল করছেন, তখন সেও সেটাই তার আদর্শ মেনে নেয়। আমরা তাদের হাতে ‘বই’ তুলে দেওয়ার বদলে ‘অ্যাপ’ তুলে দিয়েছি, তাদের সঙ্গে রূপকথার গল্প করার বদলে ‘কার্টুন’ চালিয়ে দিয়েছি। এই সহজ সমাধানই মূলত তাদের দীর্ঘমেয়াদী সংকটের দিকে ঠেলে দিয়েছে। আমরা ভুলে গেছি যে, সন্তানের শৈশব কোনো চার্জিং কেবলে আটকে থাকার জন্য নয়, বরং খোলা আকাশের নিচে ডানা মেলার জন্য। তবে প্রযুক্তিকে পুরোপুরি দোষারোপ করাও ঠিক নয়। সঠিকভাবে ব্যবহৃত হলে প্রযুক্তি হতে পারে শিক্ষার এক শক্তিশালী মাধ্যম। অনলাইন ক্লাস, তথ্যভিত্তিক ভিডিও কিংবা শিক্ষামূলক অ্যাপ শিশুদের জ্ঞান বাড়াতে সহায়ক হতে পারে। কিন্তু এর জন্য প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট নিয়ন্ত্রণ ও সচেতনতা।
এখনই সময় এই অদৃশ্য খাঁচা থেকে আমাদের সন্তানদের মুক্ত করার। আমাদের ফিরতে হবে শিকড়ে। পড়ার টেবিলের পাশে ছোট একটি বাগান করা, বিকালে অন্তত আধঘণ্টার জন্য হলেও তাকে নিয়ে পার্কে যাওয়া, কিংবা রাতে শোয়ার আগে স্মার্টফোন দূরে রেখে তাকে একটি শিক্ষামূলক গল্প শোনানো এই ছোট ছোট পরিবর্তনগুলোই পারে তাকে স্ক্রিনের মায়া থেকে ফেরাতে। প্রযুক্তিকে বর্জন করা নয়, বরং তাকে নিয়ন্ত্রিতভাবে ব্যবহার করতে শেখানোই হোক আমাদের অঙ্গীকার।
আমাদের মনে রাখতে হবে, আজকের শিশুরাই আগামী দিনের সমৃদ্ধ বাংলাদেশ। তারা যদি স্ক্রিনের চার দেয়ালের ভেতর নিজেদের কল্পনাশক্তি হারিয়ে ফেলে, তবে আমরা এক মেধাহীন ও আবেগহীন প্রজন্ম পাব। শৈশব মানেই ধুলোবালির ঘ্রাণ, শৈশব মানেই মুক্ত আকাশের নিচে ঘুড়ি ওড়ানো আর অবারিত স্বপ্ন দেখা। আসুন, তাদের হাতের মোবাইল কেড়ে নিয়ে হাতে আবার রঙের তুলি কিংবা রূপকথার বই তুলে দিই। নীল আলোর মায়া কাটিয়ে তাদের ফিরিয়ে আনি সবুজ প্রকৃতির স্নিগ্ধতায়। আমাদের সন্তানদের শৈশব ফিরে পাক তার স্বাভাবিক ছন্দ, তাদের চোখের তারায় ফুটে উঠুক সত্যিকারের রোদ্দুর।
আগামী প্রজন্মকে এই মরণফাঁদ থেকে বাঁচানো আমাদের শুধু দায়িত্ব নয়, বরং অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। আজ যদি আমরা তাদের এই ডিজিটাল খাঁচা থেকে মুক্ত না করি, তবে আগামীর ভোরগুলো হবে যান্ত্রিক, আবেগহীন এবং হৃদয়হীন; যেখানে মানুষ থাকবে, কিন্তু মানুষের সেই চিরায়ত প্রাণস্পন্দন হয়তো হারিয়ে যাবে নীল পর্দার অন্তহীন অন্ধকারে।
