মনুষ্যত্বহীন মানুষে ভরা এ কোন পৃথিবী
জোবাইদুল ইসলাম, শিক্ষার্থী, আরবি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
প্রকাশ : ২৬ এপ্রিল ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
পৃথিবীজুড়ে আজ মনুষ্যত্বহীন মানুষের মহাসমারোহ পরিলক্ষিত হচ্ছে প্রতি ক্ষণে ক্ষণে। মানুষ হওয়ার মৌলিক গুণ মনুষ্যত্ব-মানবিকতা যেন বিলীন হয়ে গেছে কালের গর্ভে। মানুষ আজ উদভ্রান্ত, দিশাহারা, দলান্ধ হয়ে টিকে আছে নিকৃষ্ট জীব হিসেবে। মানুষ আর পশুর মধ্যে যে পার্থক্য ছিল সেই পার্থক্যের সীমারেখা আজ নিশ্চিহ্ন প্রায়। বিবেকবোধ যেন বিকিয়ে দিয়েছে অনেক আগেই। নিজেকে একজন সত্যিকারের মানুষ হিসেবে পরিচয় দিতে গিয়ে কুণ্ঠাবোধ করবে না এমন কাউকে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়েছে। স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে মনে- কেন এমন হলো মানুষ? যে মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব সে মানুষ আজ পশুর চেয়েও অধম প্রাণীতে কেন পরিণত হলো? উত্তরটা ব্যাপক-বিস্তৃত, এককথায় দেওয়া সম্ভবপর হবে না।
আইনের রক্ষক আজ আইনের ভক্ষক। দুর্নীতি দমন কমিশনই আজ সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত। যারা জনসম্মুখে মানবাধিকারের বুলি আওড়ায় তাদের হাতেই নির্যাতিত-নিষ্পেষিত হচ্ছে গৃহকর্মী থেকে শুরু করে অন্যান্যরা। মানুষের মন-মগজ যেন পঁচে গিয়ে এখন দুর্গন্ধযুক্ত পুঁজ বের হওয়া ছাড়া আর কিছু অবশিষ্ট নেই। দলান্ধ হয়ে বিরোধী দলের প্রতি দমন-পীড়ন, নির্যাতন চালানো যেন আজ রাজনীতির নোংরা খেলার অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিবেকবোধ যেন দলের কাছে বর্গা দিয়ে দিয়েছে তারা। তাদের চিন্তাশক্তি, ভালো-মন্দ বুঝার ক্ষমতা যেন আজ নিছকই গালগল্পে রূপ নিয়েছে। ভালোকে ভালো, মন্দকে মন্দ বলার পরিবর্তে মানুষ আজ দলান্ধ হয়ে মন্দকে মন্দ মানতে নারাজ। অন্ধ অনুকরণ মানুষকে পৈশাচিক আনন্দে উল্লসিত করছে। মানুষ আজ শুধুই একটি প্রাণসম্পন্ন জীব হিসেবে বেঁচে আছে। মনুষ্যত্ব, বিবেকবোধ, চিন্তাশক্তি, আত্মসম্মান আজ বিলুপ্তপ্রায় কিছু ঐতিহাসিক বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়েছে।
নিত্যদিনে ধর্ষণ রূপ নিয়েছে পৈশাচিক এক আনন্দ লাভের উন্মত্ত লোভাতুর খেলায়। পতিতালয়গুলো যে তাদের লালসা মেটানোর জন্য প্রস্তুত সেটা তারা বেমালুম ভুলে গিয়ে নিরীহ, সম্ভ্রান্ত নারী জাতির উপর অত্যাচারের হাতিয়ার হিসেবে বেছে নিয়েছে। নারীও যে মানুষ, নারীরও যে প্রাণ আছে, নারীও যে এক সম্ভ্রান্ত জাতি সেটা আজ তাদের চিন্তায় আসে না। উন্মত্ত লালসা মেটাতে পর্নোগ্রাফির মিথ্যে নীল জগতের নিখুঁত অভিনয় আর ক্যামেরার কারসাজি তাদের কাছে নারীকে বানিয়েছে এক ভোগ্যপণ্য। যাকে ইচ্ছেমতো নির্যাতন চালিয়ে পৈশাচিক এক আনন্দে মাতে তারা। তাদের কে বুঝাবে যে, নারী কোনো পতিতা না, বেশ্যালয়ের নারীদেরমতো সাধারণ সম্ভ্রান্ত ঘরের নারী তাদের ওই উচ্চাভিলাস মেটাতে পারবে না। তাদের বিকৃত লালসার বলি হচ্ছে ছোট্ট নাবালিকা শিশু থেকে শুরু করে অশীতিপর বৃদ্ধা পর্যন্ত।
ক্ষমতাশীল, অর্থের পাহাড়ধারী ভালো মানুষ আর বিশ্বনেতার মুখোশধারী বিকৃত, নিকৃষ্ট, নীচু জাতের সেইসব মানুষদের কাছে ছোট্ট মেয়েশিশু, নাবালিকা মেয়েরা আজ তাদের খাবারের অংশ, বিকৃত লালসা মেটানোর হাতিয়ার। তাদের এই মুখোশ উন্মোচন হওয়ার পরও তারা দিব্যি সুখে দিনাতিপাত করছে। তারা মানুষ হলে তাদের মনুষ্যত্ব কোথায়? কোথায় তাদের মানবিকতা আর ভালো মানুষের কণ্ঠস্বরের প্রতিধ্বনির বাস্তবরূপ? গৃহকর্মীকে নির্যাতন করে সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। অথচ তার কাছে গৃহকর্মী থাকার কথা ছিল অতি আদর-যত্ন আর ভালোবাসায়। রক্ষকই আজ ভক্ষক হয়ে উঠেছে। মুখে মানবাধিকারের বুলি জপে মানুষের কাছে মানবাধিকার কর্মী হিসেবে পরিচিতি পাওয়া মানুষটার কাছেই গৃহকর্মী তার ন্যূনতম মানবাধিকারটুকু পায় না। মানুষকে মানুষ হিসেবে বিচার করতে আজ ভুলে গেছি আমরা। ধনী-গরিব, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, কর্মকর্তা-কর্মচারী, উঁচু-নিচু এসব ভাগে ভাগ করতে করতে আজ মানুষকে মানুষ হিসেবে বিচার করার ক্ষমতা লোপ পেয়েছে আমাদের।
ফেসবুক, ইউটিউব, ইন্সটাগ্রাম, টেলিগ্রাম, টিকটক আজ আমাদের মন-মগজকে এমনভাবে গ্রাস করেছে যে, আমরা মস্তিষ্ক বিকৃত, মানসিক বিকারগ্রস্ত এক জীবে পরিণত হয়েছি। আমাদের চিন্তা-চেতনা, আচার-আচরণ, দেখার দৃষ্টিভঙ্গি নষ্ট হয়ে গেছে। আমাদের আসক্তি আজ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, মৃত্যুর মুখে পতিত হওয়ার অবস্থা হলেও আমাদের হুঁশ থাকে না আমরা কোনদিকে যাচ্ছি? আসুন, মনুষ্যত্বসম্পন্ন, বিবেকসম্পন্ন সত্যিকারের মানুষ হয়ে উঠতে চেষ্টা করি। মানবিকতা আর ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে একটি সুন্দর পৃথিবী বিনির্মাণ করি। যে পৃথিবী হবে সবার বাসযোগ্য পৃথিবী। মানুষকে মানুষ হিসেবে বিবেচনা করে যাবতীয় ভুল-ত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখার অভ্যাস গড়ে তুলি। কবি চণ্ডীদাসের সেই বিখ্যাত উক্তি অন্তরে লালন করি, ‘সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই।’
