নিরাপদ খাদ্য : মৌলিক অধিকার নাকি উচ্চবিত্তের বিলাস
বাপ্পাদিত্য চৌধুরী প্রবাল
প্রকাশ : ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
একটি দেশের উন্নয়নের প্রকৃত মানদণ্ড শুধু উড়ালসড়ক বা প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান দিয়ে নির্ধারিত হয় না; এর সার্থকতা নির্ভর করে নাগরিক কতটুকু নিরাপদ ও নিশ্চিন্ত জীবন যাপন করছেন তার ওপর। আর সেই নিরাপত্তার সবচেয়ে প্রাথমিক স্তর হলো নিরাপদ খাদ্য। কিন্তু আজ এমন এক বাস্তবতায় আমরা দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে মানুষের প্রতিদিনের ভাত, ডাল, তেল, দুধ- এই সাধারণ খাদ্যগুলোই হয়ে উঠেছে অনিরাপদ। ফলে প্রশ্নটি আর তাত্ত্বিক নয়- নিরাপদ খাদ্য কি এখন শুধু উচ্চবিত্তের বিলাস?
উন্নয়নের চাকচিক্য অনেক সময় আমাদের চোখে এক ধরনের কৃত্রিম পর্দা তৈরি করে, যার আড়ালে চাপা পড়ে যায় জনস্বাস্থ্যের গভীর সংকট। বর্তমান বাজারে তথাকথিত ‘নিরাপদ’ বা ‘অর্গানিক’ খাদ্যপণ্যের দাম সাধারণ পণ্যের তুলনায় অনেক বেশি। সুপারশপে ‘নিরাপদ’ তকমা লাগানো পণ্যগুলো সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। ফলে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের জন্য এসব পণ্য কেনা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠছে। অন্যদিকে সাধারণ বাজারে পাওয়া খাদ্যের মান নিয়ে রয়েছে গুরুতর প্রশ্ন। এর ফলে সমাজে এক ধরনের অদৃশ্য বিভাজন তৈরি হচ্ছে- যেখানে একদল মানুষ অর্থের বিনিময়ে তুলনামূলক নিরাপত্তা কিনতে পারছে, আর বৃহত্তর জনগোষ্ঠী প্রতিদিন ঝুঁকিপূর্ণ খাদ্য গ্রহণে বাধ্য হচ্ছে।
এই সংকটের চিত্র আরও স্পষ্ট হয় Bangladesh Food Safety Authority -এর বিভিন্ন প্রতিবেদনে। সংস্থাটির পর্যবেক্ষণে দেশের বহু খাদ্য নমুনায় ভেজাল ও অনিরাপদ উপাদানের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। চালকে আকর্ষণীয় করতে রাসায়নিক ব্যবহার, মশলায় কৃত্রিম রঙ, তেলে নিম্নমানের মিশ্রণ, এমনকি দুধে ক্ষতিকর দ্রব্যের ব্যবহার- এসব এখন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং নিত্যদিনের বাস্তবতা। অভিযান পরিচালিত হলেও বাজারের সামগ্রিক চিত্রে বড় পরিবর্তন দেখা যায় না। বরং অধিক মুনাফার আশায় কিছু অসাধু ব্যবসায়ী খাদ্যের মতো মৌলিক উপাদানকেও ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিতে কুণ্ঠিত হচ্ছেন না।
এই ভেজাল খাদ্যের প্রভাব শুধু তাৎক্ষণিক অসুস্থতায় সীমাবদ্ধ নয়; এটি দীর্ঘমেয়াদে জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি। World Health Organi“ation -এর তথ্য অনুযায়ী, দূষিত খাদ্য প্রতি বছর প্রায় ৬০০ মিলিয়ন মানুষকে অসুস্থ করে এবং ৪ লাখেরও বেশি মানুষের মৃত্যু ঘটায়। শিশুদের পুষ্টিহীনতার একটি বড় কারণও অনিরাপদ খাদ্য। বাংলাদেশেও খাদ্যবাহিত রোগ, কিডনি ও লিভারের জটিলতা এবং দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতার সঙ্গে অনিরাপদ খাদ্যের সম্পর্ক নিয়ে চিকিৎসকদের উদ্বেগ বাড়ছে। অর্থাৎ মানুষ ক্ষুধা নিবারণ করলেও শরীর প্রয়োজনীয় পুষ্টি পাচ্ছে না- যা এক নীরব কিন্তু ভয়াবহ পুষ্টি সংকট তৈরি করছে। সমস্যার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অর্থনৈতিক চাপ। নিম্ন ও মধ্য আয়ের পরিবারগুলো অনেক সময় তাদের সীমিত আয়ের একটি বড় অংশ চিকিৎসায় ব্যয় করতে বাধ্য হয়, যার পেছনে খাদ্যবাহিত অসুস্থতা বড় কারণ। ফলে উন্নয়নের সুফল মানুষের জীবনমান উন্নত করার বদলে চিকিৎসা খাতে ব্যয় হয়ে যাচ্ছে। এই বাস্তবতা উন্নয়নের ধারণাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
আইনগত কাঠামোর দিক থেকে বাংলাদেশ পিছিয়ে নেই। ‘নিরাপদ খাদ্য আইন-২০১৩’ একটি শক্তিশালী আইন। কিন্তু সমস্যাটি আইন প্রণয়নে নয়, বরং তার কার্যকর প্রয়োগে। মাঠপর্যায়ে জনবল সংকট, সীমিত ল্যাব সুবিধা এবং তদারকির ঘাটতির কারণে অনেক ক্ষেত্রেই আইন তার প্রত্যাশিত ফল দিতে পারছে না। অনেক সময় অপরাধীরা সামান্য শাস্তি পেয়ে পুনরায় একই কাজে লিপ্ত হয়, যা পুরো ব্যবস্থার দুর্বলতাকে স্পষ্ট করে।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে অনেক উন্নত দেশে খাদ্যের উৎস ট্র্যাকিং বা traceability বাধ্যতামূলক- খামার থেকে ভোক্তার টেবিল পর্যন্ত প্রতিটি ধাপ নজরদারির আওতায় থাকে। এ ক্ষেত্রে Food and Agriculture Organization (FAO) খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই ধরনের ট্র্যাকিং ব্যবস্থাকে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশে সেই ব্যবস্থা এখনও কার্যকরভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি, যা খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতের পথে বড় প্রতিবন্ধক। এই বাস্তবতায় সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি রয়ে যায়- মানুষ ক্ষুধা নিবারণ করবে কীভাবে? যদি যে খাদ্য মানুষের বেঁচে থাকার ভিত্তি, সেটিই রোগের কারণ হয়ে ওঠে, তবে তা শুধু খাদ্যসংকট নয়; এটি একটি জনস্বাস্থ্য বিপর্যয়। ক্ষুধা নিবারণ আর সুস্থ থাকার মধ্যবর্তী নির্বাচনে যদি মানুষকে নামতে হয়, তবে সেটি কোনো সভ্য সমাজের লক্ষণ হতে পারে না। সমাধান অবশ্যই সম্ভব, তবে তা হতে হবে সমন্বিত ও কঠোর। উৎপাদন থেকে বিপণন পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে নজরদারি জোরদার করতে হবে। বাজার পর্যায়ে দ্রুত খাদ্য পরীক্ষার ব্যবস্থা চালু করা, কৃষকদের নিরাপদ উৎপাদন বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং ভোক্তাদের অভিযোগ জানানোর সহজ ব্যবস্থা তৈরি করা জরুরি। পাশাপাশি ভেজালকারীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে এই অপরাধের পুনরাবৃত্তি না ঘটে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- নিরাপদ খাদ্যকে বিলাসিতা নয়, একটি মৌলিক অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। এটি অবশ্যই রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কারণ পেটভর্তি বিষ নিয়ে কোনো জাতি দীর্ঘপথ পাড়ি দিতে পারে না। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা না গেলে উন্নয়ন নয়, বরং একটি সুস্থ ভবিষ্যৎই আমাদের নাগালের বাইরে থেকে যাবে। নিরাপদ খাদ্যকে একটি বিশেষ শ্রেণির সুবিধা হিসেবে সীমাবদ্ধ রাখা মানে একটি জাতির ভবিষ্যৎকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়া। তাই এখনই সময় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার, যাতে প্রতিটি নাগরিক তার ন্যায্য অধিকার-নিরাপদ খাদ্য- নিশ্চিতভাবে পেতে পারে। অন্যথায় উন্নয়নের সমস্ত অর্জন শুধু পরিসংখ্যানেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
বাপ্পাদিত্য চৌধুরী প্রবাল
উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ, মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ
