মে দিবসের চেতনা : শ্রমিকের অধিকার ও আগামীর কর্মসংস্থান

ওসমান গনি

প্রকাশ : ০১ মে ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মে দিবস শুধু ক্যালেন্ডারের পাতায় লালকালিতে চিহ্নিত কোনো সাধারণ ছুটির দিন নয়, বরং এটি ইতিহাসের অগ্নিগর্ভে জন্ম নেওয়া এক দীর্ঘস্থায়ী সংগ্রামের প্রতীক। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে আমেরিকার শিকাগোর হে মার্কেটে শ্রমিকরা যে আট ঘণ্টা কর্মঘণ্টার দাবিতে রক্ত দিয়েছিলেন, তা শুধু তৎকালীন বঞ্চনার প্রতিবাদ ছিল না, বরং তা ছিল মানবতার মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠার এক মহাকাব্যিক সূচনা। সময়ের বিবর্তনে শিল্প বিপ্লবের রূপ বদলেছে, প্রযুক্তির জয়জয়কার হয়েছে; কিন্তু সেই রক্তে ভেজা মে দিবসের মূল চেতনা আজ একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড়িয়ে নতুন করে সংজ্ঞায়িত হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। আজকের পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে যখন আমরা মে দিবস পালন করি, তখন শুধু অতীতের গৌরবগাথা রোমন্থন করাই যথেষ্ট নয়, বরং শ্রমিকের অধিকার এবং আগামীর অনিশ্চিত কর্মসংস্থানের সমীকরণকে মিলিয়ে দেখা সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি যেখানে উৎপাদনের সংজ্ঞাই বদলে যাচ্ছে, আর সেই পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে শ্রমিকের সংজ্ঞা ও অধিকারের জায়গাটিও নতুন করে নির্ণয় করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।

শ্রমিক অধিকারের লড়াইয়ের ইতিহাস আসলে অধিকারহীন মানুষের নিজের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখার লড়াই। অষ্টাদশ ও উনবিংশ শতাব্দীতে যখন শিল্প কারখানায় মানুষের শ্রমকে যন্ত্রের দাস হিসেবে ব্যবহার করা হতো, তখন মানুষের জীবনের মূল্য ছিল অত্যন্ত নগণ্য। সেই অবর্ণনীয় দুর্দশা থেকে বেরিয়ে আসার পথ হিসেবেই উঠে এসেছিল শ্রমিকের ঐক্যবদ্ধ কণ্ঠস্বর। আজ আমরা যখন মানবাধিকারের কথা বলি, তখন শ্রমিকের অধিকারকে সেই মানবাধিকারের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবেই বিবেচনা করতে হয়। কারণ শ্রমিকের ঘামেই গড়ে ওঠে আধুনিক সভ্যতার ভিত্তিপ্রস্তর। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, বিশ্বায়ন ও মুক্তবাজার অর্থনীতির দাপটে শ্রমিকের অধিকারের ধারণাটি অনেক ক্ষেত্রেই নড়বড়ে হয়ে পড়েছে। মুনাফার নেশায় মত্ত কিছু করপোরেট প্রতিষ্ঠান শ্রম আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে শ্রমিকের ন্যায্য পাওনা ও নিরাপত্তা থেকে তাদের বঞ্চিত করছে। প্রাতিষ্ঠানিক শ্রমবাজারের বাইরে যে বিশাল অনানুষ্ঠানিক শ্রমশক্তি রয়েছে, তাদের সুরক্ষা আজও একটি অমীমাংসিত প্রশ্ন। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, গিগ ইকোনমি এবং দূরবর্তী কর্মসংস্কৃতির এই যুগে শ্রমিকের পরিচয় ও অধিকারের সীমানা ক্রমশ ঝাপসা হয়ে আসছে, যা শ্রমিকের শোষণের নতুন রূপান্তরকে উসকে দিচ্ছে। যখন কোনো শ্রমিক কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নিয়মিত কর্মচারী হিসেবে গণ্য হন না, তখন তিনি শ্রম আইন দ্বারা প্রদত্ত সুরক্ষা থেকেও বঞ্চিত হন, আর এটাই বর্তমান সময়ের বড় ট্র্যাজেডি।

আগামীর কর্মসংস্থান নিয়ে আজ সারা বিশ্ব এক বিশাল উদ্বেগের মধ্যে সময় পার করছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এবং স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রপাতির ব্যাপক ব্যবহার শ্রমবাজারের চিরাচরিত কাঠামোকে ওলটপালট করে দিচ্ছে। একদিকে যেমন নতুন নতুন পেশার সুযোগ তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে লাখ লাখ শ্রমিকের কাজ হারিয়ে ফেলার আশঙ্কা জেঁকে বসছে। এই পরিবর্তন কি কেবল প্রযুক্তির উৎকর্ষ, নাকি শ্রমিকের জন্য এক বড় ধরনের বিপর্যয়? মে দিবসের চেতনার আলোকে যদি আমরা বিচার করি, তবে দেখা যায় প্রযুক্তির এই রূপান্তর কেবল উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির হাতিয়ার হওয়া উচিত নয়, বরং তা মানুষের জীবনের মান উন্নয়নের সোপান হওয়া বাঞ্ছনীয়। কিন্তু যদি মুনাফার চরম লিপ্সায় যন্ত্রকে মানুষের বিকল্প হিসেবে দাঁড় করানো হয় এবং শ্রমিকের দক্ষতার উন্নয়নের চেয়ে তাকে প্রতিস্থাপন করাকেই শ্রেয় মনে করা হয়, তবে তা হবে মে দিবসের আদর্শের সঙ্গে চরম বিশ্বাসঘাতকতা। আগামীর কর্মসংস্থান এমন হওয়া উচিত যেখানে মানুষ এবং প্রযুক্তির সহাবস্থান নিশ্চিত থাকবে, যেখানে যন্ত্র মানুষের পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে, প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নয়। আমাদের মনে রাখতে হবে, প্রযুক্তির উন্নয়ন যদি মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ কেড়ে নেয়, তবে সেই উন্নয়ন কখনোই টেকসই হতে পারে না। আমাদের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাকে এমনভাবে ঢেলে সাজাতে হবে যাতে শ্রমিকরা প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজেদের কর্মক্ষম রাখতে পারে।

শ্রমিক ও মালিকের সম্পর্কের নতুন সমীকরণ নির্ধারণ করা এখন সময়ের বড় প্রয়োজন। ঐতিহাসিকভাবে মালিক ও শ্রমিকের সম্পর্ককে অনেক সময় সংঘাতমূলক হিসেবে দেখানো হয়েছে, যেন তারা একে অপরের প্রতিপক্ষ। কিন্তু আধুনিক অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে এই সম্পর্ককে পারস্পরিক নির্ভরশীলতার ভিত্তিতে নতুন করে ঢেলে সাজাতে হবে। একটি প্রতিষ্ঠানের সাফল্য শুধু মালিকের বিনিয়োগের ওপর নির্ভর করে না, বরং সেটি শ্রমিকের শ্রম ও মেধার সম্মিলিত ফসল। তাই শ্রমিকের অধিকারের কথা বলতে গিয়ে শুধু মজুরি বা কর্মঘণ্টার দিকে তাকালেই চলবে না, কর্মপরিবেশের নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং শ্রমিকের ব্যক্তিগত উৎকর্ষের জায়গাটিও নিশ্চিত করতে হবে। মালিকপক্ষ যখন শ্রমিকের শ্রমে নিজেদের সমৃদ্ধি খুঁজে পান, তখন শ্রমিকের প্রতি দায়িত্বশীলতাও তাদের অন্যতম প্রধান কর্তব্য হওয়া উচিত। এই পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও দায়িত্বশীলতাই পারে শ্রম অসন্তোষ কমিয়ে শিল্পের বিকাশ ত্বরান্বিত করতে। যখন শ্রমিকরা নিজেদের কাজের জায়গায় নিরাপদ বোধ করেন এবং তাদের মতামতকে মূল্যায়ন করা হয়, তখন তাদের কাজের গতি ও মান উভয়ই বৃদ্ধি পায়, যা সরাসরি মালিকের মুনাফায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।

আমাদের বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মে দিবসের তাৎপর্য আরও গভীর। এখানে তৈরি পোশাক শিল্প থেকে শুরু করে কৃষি এবং অনানুষ্ঠানিক খাতের বিশাল এক শ্রমিক গোষ্ঠী দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রেখেছে। আমাদের উন্নয়নের মডেলে শ্রমিকের শ্রমই মূল চালিকাশক্তি। কিন্তু এখনও শ্রমিকদের একটি বড় অংশ ন্যূনতম নিরাপত্তা ও অধিকার থেকে বঞ্চিত। কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনার ঝুঁকি, পেশাগত স্বাস্থ্য সমস্যার প্রকোপ এবং চাকরির নিশ্চয়তার অভাব আমাদের শ্রমবাজারের এক রূঢ় বাস্তবতা। আগামীর কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে আমাদের প্রস্তুতি কেমন, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের ঢেউ যখন আমাদের দেশেও আছড়ে পড়ছে, তখন সেই প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে আমাদের শ্রমিকদের দক্ষ করে গড়ে তোলা সবচেয়ে জরুরি। শুধু সস্তা শ্রমের ওপর ভিত্তি করে উন্নয়ন টেকসই হতে পারে না, আমাদের প্রয়োজন দক্ষ ও প্রযুক্তি-সচেতন জনশক্তি। সেই সঙ্গে সামাজিক নিরাপত্তার বলয় আরও শক্তিশালী করতে হবে যাতে কোনো শ্রমিকই কর্মহীন হওয়ার ভয়ে অসহায়ত্ব অনুভব না করেন। আমাদের দেশীয় শিল্প উদ্যোক্তাদের এগিয়ে আসতে হবে যাতে তারা তাদের শ্রমিকের জীবনমান উন্নয়নে বিনিয়োগ করেন। সরকারের পক্ষ থেকে শ্রম আইন প্রয়োগে কঠোরতা অবলম্বন এবং শ্রমিকদের কল্যাণে সরকারি তহবিলের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।

শ্রমিকের অধিকার কোনো দান বা করুণা নয়, এটি তাদের অর্জন। মে দিবসের চেতনা আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেয় যে, ন্যায়বিচার ও সাম্য ছাড়া কোনো অর্থনৈতিক উন্নয়নই পূর্ণতা পেতে পারে না। আজ যখন আমরা একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ দেশ গড়ার স্বপ্ন দেখি, তখন সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের মূল কারিগরদের অবহেলা করার কোনো অবকাশ নেই। শ্রমিকের জীবনমান উন্নয়ন এবং আগামীর কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা দূর করতে রাষ্ট্র, মালিক এবং শ্রমিক সংগঠনগুলোর মধ্যে একটি ত্রিপক্ষীয় সমঝোতা ও সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা এবং কর্মক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরি করা আজকের দিনের প্রধান চ্যালেঞ্জ। শ্রমিকদের জন্য যথাযথ স্বাস্থ্য বিমা, অবসরকালীন ভাতা এবং নিরাপদ আবাসন নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব। শ্রমিক সংগঠনগুলোকে শুধু রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার না করে, তাদের প্রকৃত শ্রমিক কল্যাণে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে।

পরিশেষে বলা যায়, মে দিবসের চেতনা কোনো প্রাচীন নথিতে বন্দি থাকার বিষয় নয়; এটি প্রতিনিয়ত সচল এক শক্তি। এ শক্তিই আমাদের পথ দেখায়, কীভাবে অধিকারের লড়াইকে নিয়মতান্ত্রিক ও টেকসই রূপ দেওয়া যায়। প্রযুক্তি এবং পরিবর্তনের এই স্রোতে হারিয়ে না গিয়ে, বরং পরিবর্তনের অংশীদার হিসেবে শ্রমিকদের গড়ে তোলা আমাদের সম্মিলিত দায়িত্ব। আগামী প্রজন্মের জন্য আমরা যদি একটি মানবিক কর্মসংস্থান ব্যবস্থা রেখে যেতে চাই, তবে শ্রমিকের মর্যাদা ও অধিকারের প্রশ্নে কোনো ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই। এই লড়াই শুধু আজকের নয়, বরং প্রতিটি দিনের। শ্রমিকের ঘামের সঠিক মূল্যায়ন ছাড়া কোনো রাষ্ট্রই তার পূর্ণ সম্ভাবনায় পৌঁছাতে পারে না। আসুন, এই মে দিবসে আমরা নতুন করে অঙ্গীকার করি যে, শ্রমিকের ঘামের সঠিক মূল্যায়ন হবে, মানুষের শ্রম হবে সম্মানের এবং আগামীর কর্মসংস্থান হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক, যেখানে কোনো মানুষই উন্নয়নের চাকায় পিষ্ট হবে না, বরং প্রতিটি শ্রমিকই হবে সেই উন্নয়নের গর্বিত অংশীদার। তবেই মে দিবসের প্রকৃত সার্থকতা নিহিত থাকবে এবং শিকাগোর সেই শহীদদের রক্তদান বৃথা যাবে না। একটি মানবিক ও সমতাপূর্ণ বিশ্ব বিনির্মাণে শ্রমিকের অধিকারের সুরক্ষা শুধু একটি আইনি বাধ্যবাধকতা নয়, এটি আমাদের মানবিক মূল্যবোধের বহিঃপ্রকাশ। এই অঙ্গীকার বাস্তবায়নে আমাদের প্রত্যেককে নিজ নিজ অবস্থান থেকে কাজ করে যেতে হবে, যাতে মে দিবসের সূর্য প্রতিদিন শ্রমিকের মুখে হাসি ফোটাতে পারে।

ওসমান গনি

লেখক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট