কৃষিকাজে নারীদের অবদানের দৃশ্যমান স্বীকৃতি কোথায়
ওরাইনা খাঁন চৌধুরী
প্রকাশ : ০১ মে ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ। এ দেশের অর্থনীতি, খাদ্য নিরাপত্তা এবং গ্রামীণ জীবনযাত্রার সঙ্গে কৃষি গভীরভাবে জড়িত। কিন্তু কৃষির এই বিশাল কাঠামোর ভেতরে একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি দীর্ঘদিন ধরে উপেক্ষিত থেকে গেছে- কৃষিকাজে নারীদের অবদান। একজন পুরুষ কৃষক মাঠে যে কাজ করেন, তার সমপরিমাণ কিংবা অনেক ক্ষেত্রেই তার চেয়েও বেশি কাজ করেন একজন নারী। অথচ সেই শ্রম অধিকাংশ সময় অদৃশ্য থেকে যায়, স্বীকৃতি পায় না, মূল্যায়ন তো দূরের কথা। গ্রামীণ বাংলাদেশে ভোরবেলা সূর্য ওঠার আগেই নারীদের দিন শুরু হয়। পরিবারের জন্য রান্না, পানি আনা, গবাদিপশুর যত্ন নেওয়া- এই সব কাজের পাশাপাশি তারা সক্রিয়ভাবে অংশ নেন কৃষিকাজে। ধান রোপণ, আগাছা পরিষ্কার, ফসল কাটা, শুকানো, সংরক্ষণ- প্রতিটি ধাপে নারীদের ভূমিকা অপরিহার্য। অনেক ক্ষেত্রে তারা বীজ বাছাই, চারা উৎপাদন এবং ঘরে বসেই বিভিন্ন কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাত করার কাজও করেন। কিন্তু এই কাজগুলোকে প্রায়ই ‘গৃহস্থালির কাজ’ বলে অবমূল্যায়ন করা হয়, ফলে তা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড হিসেবে গণ্য হয় না।
সমস্যার মূল কারণগুলোর একটি হলো সামাজিক মানসিকতা। আমাদের সমাজে এখনও প্রচলিত ধারণা হলো কৃষক মানেই একজন পুরুষ। নারীরা যেন কৃষকের সহকারী মাত্র, অথচ বাস্তবে তারা নিজেরাও সমানভাবে কৃষক। এই মানসিকতার কারণে নারীদের শ্রমকে স্বীকৃতি দেওয়া হয় না, তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাও সীমিত থাকে। জমির মালিকানা অধিকাংশ ক্ষেত্রে পুরুষদের নামে থাকায় নারীরা কৃষি সংক্রান্ত ঋণ, প্রশিক্ষণ বা সরকারি সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন। পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশের কৃষিখাতে নারীদের অংশগ্রহণ ক্রমেই বাড়ছে। পুরুষরা শহরমুখী হওয়ায় গ্রামে কৃষিকাজের বড় অংশ এখন নারীদের কাঁধে এসে পড়েছে।
কিন্তু এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তাদের মর্যাদা বা অধিকার বাড়েনি। তারা এখনও শ্রমিক হিসেবে কাজ করলেও মজুরি পান কম, অনেক ক্ষেত্রে কোনো মজুরিই পান না, কারণ তাদের কাজকে ‘পারিবারিক দায়িত্ব’ হিসেবে দেখা হয়। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- নারীদের কাজের পরিধি পুরুষদের চেয়ে অনেক বিস্তৃত। একজন পুরুষ হয়তো মাঠে নির্দিষ্ট সময় কাজ করেন, কিন্তু একজন নারী ঘর ও মাঠ- দুই জায়গাতেই কাজ করেন। এই দ্বৈত দায়িত্ব তাদের শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্লান্ত করে তোলে। তবুও তাদের এই পরিশ্রমকে স্বাভাবিক ধরে নেওয়া হয়, যেন এটি তাদের কর্তব্য, কোনো অবদান নয়।
কৃষিক্ষেত্রে নারীদের অবদান অদৃশ্য থাকার আরেকটি কারণ হলো তথ্যের অভাব। অনেক সময় সরকারি বা বেসরকারি গবেষণায় নারীদের কাজ সঠিকভাবে প্রতিফলিত হয় না। ফলে নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রেও তাদের প্রয়োজন ও সমস্যাগুলো উপেক্ষিত থাকে। উদাহরণস্বরূপ, কৃষি প্রশিক্ষণ কর্মসূচি বা প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ সাধারণত পুরুষদের জন্য বেশি সহজলভ্য হয়, নারীরা সেখানে অংশ নেওয়ার সুযোগ পান কম। তবে আশার কথা হলো, ধীরে ধীরে পরিস্থিতির পরিবর্তন হচ্ছে। বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থা ও নারী অধিকার সংগঠন এখন কৃষিতে নারীদের ভূমিকা তুলে ধরার চেষ্টা করছে। নারীদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ, ক্ষুদ্রঋণ সুবিধা এবং কৃষি উপকরণ সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে নারীরা নিজেরাই কৃষি উদ্যোক্তা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছেন, যা সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। তবুও এই পরিবর্তন যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন একটি সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। প্রথমত, নারীদের কৃষক হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। তাদের নামেই কৃষি কার্ড, ঋণ এবং অন্যান্য সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, জমির মালিকানায় নারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে, যাতে তারা স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। তৃতীয়ত, কৃষি প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে নারীদের জন্য বিশেষ সুযোগ তৈরি করতে হবে। এছাড়া সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করাও অত্যন্ত জরুরি। পরিবার থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় পর্যায় পর্যন্ত সবাইকে বুঝতে হবে যে নারীরা শুধু গৃহিণী নন, তারা দেশের খাদ্য উৎপাদনের অন্যতম প্রধান শক্তি। তাদের শ্রমকে সম্মান জানানো মানে দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা। মিডিয়ারও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। সংবাদপত্র, টেলিভিশন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কৃষিতে নারীদের সাফল্যের গল্প তুলে ধরা উচিত। এতে একদিকে যেমন তাদের কাজের স্বীকৃতি বাড়বে, অন্যদিকে নতুন প্রজন্মের নারীরাও কৃষিতে আগ্রহী হবে। সবশেষে বলা যায়, কৃষিকাজে নারীদের অবদান কোনোভাবেই অদৃশ্য নয়- বরং তা অত্যন্ত দৃশ্যমান, শুধু আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিই তা দেখতে ব্যর্থ হয়। একজন পুরুষ কৃষক যে কাজ করেন, একজন নারী কৃষকও সেই একই কাজ করেন, অনেক সময় আরও বেশি দায়িত্ব পালন করেন। তাই সময় এসেছে এই অদৃশ্য শ্রমকে দৃশ্যমান করার, তাদের প্রাপ্য সম্মান ও অধিকার নিশ্চিত করার। নারীদের এই অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়া শুধু ন্যায়বিচারের প্রশ্ন নয়, এটি দেশের টেকসই উন্নয়নের জন্যও অপরিহার্য। কৃষির মাটিতে যে ঘাম ঝরে, সেখানে নারী-পুরুষের ভেদাভেদ নেই- আছে শুধু পরিশ্রম আর জীবনের সংগ্রাম। সেই সংগ্রামের সমান অংশীদার নারীদের আর আড়ালে রাখার সুযোগ নেই। এখনই সময় তাদের সামনে নিয়ে আসার।
ওরাইনা খাঁন চৌধুরী
শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়
