বজ্রপাত : নীরব দুর্যোগের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা কোথায়
তাপস রায় শুভ
প্রকাশ : ০১ মে ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশে বজ্রপাত একটি বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যা প্রতিবছর কেড়ে নিচ্ছে শত শত মানুষের জীবন। সাম্প্রতিক ঘটনাবলি এই বাস্তবতাকে নির্মমভাবে উন্মোচিত করছে। গত রোববার মাত্র একদিনে দেশের সাত জেলায় প্রায় ১৪ জনের প্রাণহানির ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। প্রতিবছরই মার্চ থেকে জুলাই মাস পর্যন্ত বজ্রপাতের প্রকোপ বেড়ে যায়। বিশেষত এপ্রিল-মে মাসে এর তীব্রতা চূড়ান্ত রূপ ধারণ করে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা যায়, গত এক দশকে বাংলাদেশে প্রায় ৩ হাজারেরও বেশি মানুষ বজ্রাঘাতে মারা গেছে। এছাড়াও বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ৩০০ জন মানুষ বজ্রাঘাতে প্রাণ হারায়। যেখানে বজ্রপাতে এ বছরের প্রথম তিন মাসেই মারা গেছেন অন্তত ৬০ জন। এর মধ্যে গত ১৮ ও ২৬ এপ্রিল এই দুদিনেই মারা গেছেন প্রায় ২৮ জন। আহত হয়েছেন বেশ কয়েকজন। যা খুবই উদ্বেগের বিষয়।
আবহাওয়া ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ুর পরিবর্তন বা আবহাওয়ার ধরনে পরিবর্তন আসা, পরিবেশ দূষণের মাত্রা আগের চেয়ে বেড়ে যাওয়া, বনাঞ্চল কমা ও নির্বিচারে গাছকাটাসহ অপরিকল্পিত কৃষি সম্প্রসারণের কারণে বজ্রপাতের মাত্রা বাড়ছে। বজ্রপাতে মৃত্যুর প্রধান কারণগুলোর মধ্যে ঝড়ের সময় খোলা মাঠে কাজ করা, নিরাপদ আশ্রয়ের অভাব এবং মানুষের সচেতনতার ঘাটতি। বিভিন্ন পরিসংখ্যান বলছে যে, বজ্রপাতে নিহতদের ৭০ শতাংশেরও বেশি কৃষক, জেলে, দিনমজুর ও খোলা স্থানে কর্মরত দরিদ্র জনগোষ্ঠী। যাদের জীবিকা মূলত প্রকৃতির উপর নির্ভরশীল এবং যারা নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার সুযোগ হতে বঞ্চিত; তারাই এই বিপদের প্রধান শিকার। এটা শুধু একটি প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের চিত্র নয়-এটা একটা সামাজিক বৈষম্যের এক নির্মম প্রতিফলন।
প্রতিবছর প্রাণহানি বেড়ে যাওয়ায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় ২০১৬ সালে বজ্রপাতকে একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। কিন্তু সে অনুযায়ী এই দুর্যোগ মোকাবিলায় মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে পুরোপুরি কার্যকর পদক্ষেপ আজ অবধি প্রতিফলিত হয়নি। যার দরুন আজকের এই মৃত্যুমিছিল অব্যাহত রয়েছে। বিভিন্ন সময় মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তর থেকে কিছু কর্মসূচি নিলেও সেগুলো জনসাধারণের মধ্যে তেমন প্রভাব ফেলতে পারেনি। ভৌগোলিক কারণও বজ্রপাতের তীব্রতা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, বিশেষত হাওড়সংলগ্ন এলাকা অধিক ঝুঁকিপূর্ণ। যার মধ্যে সিলেট বিভাগ জেলার মানুষেরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে দিন কাটায়। বঙ্গোপসাগর হতে আগত আর্দ্র বায়ুপ্রবাহ, স্থানীয় জলীয়বাষ্প এবং পার্বত্য ভূপ্রকৃতির সম্মিলিত প্রভাবে এই অঞ্চলে বজ্রমেঘের সৃষ্টি অধিক হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, সিলেট অঞ্চলে মাত্র তিন মাসের মৌসুমে প্রতি বর্গকিলোমিটারে ২৫টিরও বেশি বজ্রপাত আঘাত হানে। সিলেট যেহেতু হাওড়াঞ্চল, সেদিক থেকে বাংলাদেশের হাওরাঞ্চল দেশের খাদ্য নিরাপত্তা, কৃষি উৎপাদন এবং গ্রামীণ জীবিকার প্রধান ভিত্তি। কিন্তু এই বিস্তীর্ণ জলাভূমি ও চাষযোগ্য কৃষিজমি একই সঙ্গে পরিণত হয়েছে বজ্রপাতের উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ প্রাকৃতিক ক্ষেত্র হিসেবে। যেখানে সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় কার্যকর পদক্ষেপে ঘাটতি বিরাজমান।
তবে প্রশ্ন- এই মৃত্যুমিছিল রোধে আমরা কি করছি? বাস্তবতা বলছে কার্যকর উদ্যোগ এখনও সীমিত। তালগাছ রোপণ, সতর্কবার্তা প্রদান কিংবা কিছু অবকাঠামোগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলেও, তা সামগ্রিক সমস্যার তুলনায় অপ্রতুল। বড় কোনো দুর্ঘটনার পর সাময়িক কিছু তৎপরতা দেখা যায়; কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব স্পষ্ট। বজ্রপাত প্রাকৃতিক দুর্যোগ, একে ঠেকানো যাবে না। তবে সমন্বিত ও টেকসইমূলক উদ্যোগ নিলে অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু অনেকটাই কমানো সম্ভব। আর সেই উদ্যোগটি নেওয়ার দায়িত্ব সরকারের।
এই সংকট মোকাবিলায় যেসব পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। প্রথমত, বজ্রপাত থেকে রক্ষা পেতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা। ঝড়ের আগাম পূর্বাভাস পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই জনগণকে সতর্কবার্তা পৌঁছে দিতে হবে। এক্ষেত্রে সতর্ক ব্যবস্থা শুধু ওয়েবসাইট বা শহরকেন্দ্রিক বার্তায় সীমাবদ্ধ না রেখে মোবাইল এসএমএস, মাইকিং এর দ্বারা সতর্কবার্তা দ্রুত জনগণের দোরগোড়ায় ছড়িয়ে দিতে হবে। বিশেষ করে, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান-ইউনিয়ন পরিষদকে জনসচেতনতা সৃষ্টিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। শুধু দায়িত্ব প্রদান করলেই চলবে না-প্রয়োজন প্রশিক্ষণ, অর্থায়ন এবং কার্যকর মনিটরিং। ঝড়ের সময় খোলা মাঠ ত্যাগ, গাছের নিচে অবস্থান, বৈদ্যুতিক খুঁটি ও পানির উৎস থেকে দূরে থাকা, নৌকায় অবস্থান না করা- এই বার্তাগুলো শুধু প্রচার নয়, বাস্তব প্রশিক্ষণের মাধ্যমে মানুষকে বোঝাতে ও শেখাতে হবে। কারণ গ্রামের বেশির ভাগ মানুষই অজ্ঞ। দ্বিতীয়ত, ব্যাপক হারে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি গ্রহণ করা অত্যাবশ্যকীয়। বিশেষত, তালগাছ রোপণসহ উঁচু ও শক্তিশালী গাছ, যা বজ্রপাত শোষণে সক্ষম, সেসব গাছের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে হবে এবং বৃক্ষনিধন কর্মসূচি রোধ করতে হবে। তৃতীয়ত, বজ্রপাতপ্রবণ অঞ্চলে দ্রুত আশ্রয়কেন্দ্র ও বজ্র নিরোধক দণ্ড স্থাপন করতে হবে। বিশেষত, প্রত্যন্ত ও হাওড় অঞ্চলে এই কার্যক্রম শতভাগ সম্পন্ন করতে হবে। অতএব, সময় এখনই- এই নীরব দুর্যোগের বিরুদ্ধে সমন্বিত প্রতিরোধ গড়ে তোলার। নাহলে প্রতিবছর বজ্রের ঝলকানির সঙ্গে সঙ্গে বাড়তেই থাকবে মৃত্যুর মিছিল- যা একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য এক গভীর ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি হয়ে ফুটে উঠবে।
তাপস রায় শুভ
শিক্ষার্থী, সমাজকর্ম বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
