জলাবদ্ধতা নিরসনে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে

প্রকাশ : ০৩ মে ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সাধারণত বৈশাখে কালবৈশাখী ঝড় হয়। ঝড়ে গাছপালা, বসতবাড়ি থেকে শুরু করে ফসলাদির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে এবার বৈশাখে এখন পর্যন্ত তেমন কোনো বড় ধরনের ঝড় হয়নি। বরং গত দুই-তিন দিনে বর্ষার মতো মুসলধারে বৃষ্টি হয়েছে। বৃষ্টি আল্লাহর রহমত। গত চার-পাঁচ মাসে বৃষ্টির কোনো দেখা মিলেনি। দিনের তাপমাত্রা বাড়ে প্রচণ্ড গরমে মানুষের হাসফাঁস অবস্থার সৃষ্টি হয়। এর মধ্যে লোডশেডিংয়ের কারণে জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে তোলে। জ্বালানিতেল সংকটে কৃষকরা সেচসংকটে নিপতিত হয়। যথাসময়ে খেতে পানি দিতে না পারার দুঃশ্চিন্তা তাদের মধ্যে ভর করে। কাঙ্ক্ষিত ফসল উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার শঙ্কা দেখা দেয়। এর মধ্যে গত দুই-তিন দিনের বৃষ্টি যেন তাদের জন্য আল্লাহর রহমত হয়ে আসে। প্রাকৃতিক এই বৃষ্টি সেচ নিয়ে কৃষকদের দুঃশ্চিন্তার অবসান ঘটায়। মাঠের ফসল সজীব-সতেজ হয়ে উঠেছে। নানা ধরনের মৌসুমী ফলমূল পুষ্ট ও পরিপক্ক হয়ে উঠেছে। বৃষ্টির কারণে ইরি-বোরো ধানের পানিসংকট কেটে যাওয়ায় কৃষকরা বাম্পার ফলনের আশা করছে। অসময়ের এই বৃষ্টি যেমন আল্লাহর অশেষ রহমত, তেমনি রাজধানী, চট্টগ্রামসহ গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোতে মনুষ্যসৃষ্ট সমস্যার কারণে তা জনভোগান্তিতেও পরিণত হয়েছে। বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের যথাযথ ব্যবস্থা না থাকায় সামান্য বৃষ্টিতে নগরিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে জনদুর্ভোগের সীমা থাকে না।

গতকাল দৈনিক এক প্রতিবেদনে হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি হলে রাজধানীর অলিগলি থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ সড়কে পানিবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে নগরবাসী কী অসহনীয় দুর্ভোগে পড়ে, তার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। বৃষ্টিতে এই পানিবদ্ধতা সৃষ্টি নতুন কিছু নয়। যুগের পর যুগ ধরে চলে আসছে। এ নিয়ে নগরবিদরা বহু পরামর্শ ও সমাধান দিলেও সিটি করপোরেশেন, রাজউকসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কর্ণপাত করছে বলে মনে হয় না। উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে, হবে বলে বড় বড় কথা বললেও ফলাফল শূন্য। সামনে বর্ষা মৌসুম। বৃষ্টিতে অবধারিতভাবেই রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকা কোমর সমান পানিতে ডুবে যাবে। নগরবাসীর কষ্টের সীমা থাকবে না। এখনই সামান্য বৃষ্টিতে তার আলামত দেখা যাচ্ছে। অন্যদিকে, বিভিন্ন সড়ক খোঁড়াখুড়ি শুরু হয়েছে। বর্ষা মৌসুম পর্যন্ত এ খোঁড়াখুড়ি যে চলবে তা অতীত অভিজ্ঞতা থেকে সহজেই আন্দাজ করা যায়। একদিকে জলাবদ্ধতা, অন্যদিকে সড়ক খোঁড়া এবং তাতে বৃষ্টির পানি জমে যে ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে, তাতে সন্দেহ নেই। বরাবরের মতো জলাবদ্ধতা ও যানজট মিলিয়ে এক দুর্বিষহ পরিস্থিতি সামনে অপেক্ষা করছে। এর সমাধান হবে, এমন নিশ্চয়তা আজ পর্যন্ত কোনো সরকার দিতে পারেনি। সরকার আসে, সরকার যায়, জলাবদ্ধতার সমাধান হয় না। আশা করা হয়েছিল, অন্তর্বর্তী সরকার তার দেড় বছরের শাসনামলে অন্তত পানিবদ্ধতার কিছুটা সমাধান করে যেতে পারবে। অবৈধ দখলে থাকা কিংবা ভরাট হয়ে যাওয়া খাল ও লেক উদ্ধার করে পানিপ্রবাহ সচলের মাধ্যমে পানিবদ্ধতা নিরসনের কাজটি করবে। সেটা করতে পারেনি। অসময়ের এক-দেড় ঘণ্টার বৃষ্টিতে রাজধানীর পানিবদ্ধতার যে শোচনীয় পরিস্থিতি দেখা দিচ্ছে, তা অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের চেয়েও খারাপ হয়ে পড়ছে। বর্ষা মৌসুমে কী অবস্থা দাঁড়াবে, তা বোধকরি ব্যাখ্যা করে বলার কিছু নেই। পানিবদ্ধতা নিরসনের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব দুই সিটি কর্পোরেশনের। পরিতাপের বিষয়, তারা এ কাজ করতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে এবং হচ্ছে। এরইমধ্যে সিটি কর্পোরেশনের মেয়র হিসেবে দলীয় প্রভাবশালী নেতাদের বসানো হয়েছে। সঙ্গতকারণেই আশা করা হয়েছিল, নগরজীবনের চিরদুঃখ হয়ে থাকা পানিবদ্ধতা নিরসনে তারা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে উদ্যোগ নেবে। নগরবাসী তার দৃশ্যমান কোনো কিছু দেখতে পাচ্ছে না। বলার অপেক্ষা রখে না, রাজধানীর ড্রেনেজ সিস্টেম অপরিকল্পিত এবং এর সম্প্রসারণের সঙ্গে তাল মিলিয়ে করা হয়নি ও হচ্ছে না। বিদ্যমান যে ড্রেন ও পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা রয়েছে, সেগুলোর অধিকাংশই ময়লা-আবর্জনা জমে থাকে। ঠিকমতো পরিস্কার করা হয় না বলে নগরবাসী অভিযোগ করে আসছে। ফলে বৃষ্টির পানি জমে ভয়াবহ পানিবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে। বর্তমান সরকারের কাছে, জনগণের প্রত্যাশা অনেক। তারা মনে করে, এই সরকার পানিবদ্ধতা, যানজট, বায়ুদূষণ, শব্দদূষণসহ পরিবেশের যতধরনের দূষণ রয়েছে, তা নিরসনে ক্রাশ প্রোগ্রাম হাতে নেবে এবং তা দ্রুত দৃশ্যমান হবে। এখন পর্যন্ত তার কোনো কিছুই দেখা যাচ্ছে না। এসব ক্ষেত্রে সরকারের উদ্যোগের অভাব জনগণের জন্য হতাশার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আধুনিক মনস্ক এবং উন্নত বিশ্বে সমস্যা ও সংকট কীভাবে সাধান করা হয়, তা তার ভালোভাবে জানা আছে। অপরিকল্পিত সম্প্রসারণ এবং নাগরিক সুযোগ-সুবিধার অভাবে রাজধানী অত্যন্ত জটিল অবস্থানে রয়েছে। এই জটিল অবস্থানের মধ্যেই কীভাবে আধুনিক উপায়ে কিংবা বিদ্যমান নিষ্কাশন পদ্ধতিকে কার্যকর করে পানিবদ্ধতা ও যানজট নিরসন করা যায়, সেই পরিকল্পনা এবং তার দ্রুত বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নেওয়া ছাড়া গত্যন্তর নেই। এজন্য, সরকার নগরবিদদের সমন্বয়ে বিশেষজ্ঞ কমিটির মাধ্যমে কাজ শুরু করতে পারে। নগরবিদদের মতে, অবৈধভাবে দখল হয়ে যাওয়া রাজধানীর খাল উদ্ধার, বিদ্যমান খাল ও জলাশয় সংস্কার করে পানিপ্রবাহ বৃদ্ধি করলে পানিবদ্ধতার সমাধান অনেকাংশে সম্ভব হবে। বিদ্যমান ড্রেন ও সুয়ারেজ লাইন নিয়মিত পরিস্কার করে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা সচল রাখা জরুরি। এসব সমস্যা সমাধানে বছরের পর বছর ধরে সিটি কর্পোরেশন, ওয়াসাসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ব্লেমগেমের অবসান হওয়া জরুরি। নগরবাসী এখন আর এই পারস্পরিক দোষারোপের কথা শুনতে চায় না। তারা চায়, তাদের নিত্যদিনের সমস্যার দ্রুত সমাধান। রাজধানী, চট্টগ্রামসহ অন্যান্য শহরে স্বচ্ছন্দে চলার গ্যারান্টি। যেকোনো সরকারের অন্যতম কাজ, জনগণের তাৎক্ষণিক সমস্যার দ্রুত সমাধান করে তাদের স্বস্তি দেয়া। অর্থাৎ আগের কাজ আগে করা। পানিবদ্ধতা নিরসনে নগরবাসীরও সচেতন হওয়া প্রয়োজন। তাদের ব্যবহৃত পলিথিন ও কঠিন বর্জ্য যত্রতত্র ফেলার কারণে সেগুলো ড্রেনে জমে বৃষ্টির পানি আটকে দেয়। এটা যাতে না হয়, সেজন্য তাদেরকে সচেতন হতে হবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে আমাদের প্রত্যাশা, পানিবদ্ধতায় নগরবাসী যে অসহনীয় দুর্ভোগের শিকার হয়, দয়া করে তা দ্রুত সমাধানে উদ্যোগী হোন। দুর্ভোগ নিরসনে যাদের যে ধরনের নির্দেশনা দেয়া দরকার, তা দিন।