গণমাধ্যম ও রাষ্ট্র : বৈরিতা নয়, বরং সত্যের আয়না
ওসমান গনি
প্রকাশ : ০৪ মে ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

গণমাধ্যমকে বলা হয় রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আইন বিভাগ, শাসন বিভাগ ও বিচার বিভাগের পাশাপাশি গণমাধ্যমের ভূমিকা অনস্বীকার্য। তবে আধুনিক রাজনীতির প্রেক্ষাপটে গণমাধ্যম ও সরকারের সম্পর্ক নিয়ে এক ধরনের জটিল সমীকরণ তৈরি হয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায়, রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত পক্ষ গণমাধ্যমকে নিজেদের প্রতিপক্ষ হিসেবে গণ্য করে। সত্য প্রকাশ যখনই কোনো মহলের স্বার্থে আঘাত হানে, তখনই গণমাধ্যমের ওপর নেমে আসে নানা প্রকার হয়রানি ও আক্রমণ। কিন্তু গভীর ও নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গণমাধ্যম আসলে কখনও সরকারের বিপক্ষ নয়; বরং সরকারের একটি দর্পণ হিসেবে কাজ করে, যেখানে প্রতিফলিত হয় রাষ্ট্রের প্রকৃত চিত্র।
গণমাধ্যমের মৌলিক দায়িত্ব হলো সত্যকে সাহসের সঙ্গে জনসমক্ষে তুলে ধরা এবং ন্যায়-নীতির পক্ষাবলম্বন করা। এটি কোনো দল বা গোষ্ঠীর চাটুকারিতার হাতিয়ার নয়, বরং জনগণের কণ্ঠস্বর। রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুদায়িত্বে যখন কোনো সরকার থাকে, তখন তাদের সামনে অগণিত কাজ ও পরিকল্পনার ভিড় থাকে। নীতিনির্ধারক হিসেবে সরকারপ্রধান বা তার মন্ত্রীসভা জনকল্যাণে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেন।
কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু থেকে প্রান্তিক পর্যায়ের খবরগুলো যথাযথভাবে পৌঁছাতে পারে না। সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে জনকল্যাণের কথা বলা হলেও মাঠপর্যায়ে রাজনৈতিক দলের একশ্রেণির অতিউৎসাহী নেতাকর্মী ক্ষমতার অপব্যবহার করে নানা অপরাধ বা অঘটন ঘটিয়ে থাকে। এই অপরাধগুলো সাধারণত সরকারের প্রধান কর্মকর্তাদের অগোচরেই থেকে যায়।
ঠিক এখানেই গণমাধ্যমের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। যখন কোনো গণমাধ্যম মাঠপর্যায়ের অপরাধ, দুর্নীতি বা অনিয়ম নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে, তখন সরকার সেগুলো জানার ও সংশোধনের সুযোগ পায়। একটি বড় রাজনৈতিক দলের প্রতিটি স্তরে কী ঘটছে, তা সরকারের একার পক্ষে নজরদারি করা প্রায় অসম্ভব। দলের ছোট পর্যায়ের নেতাকর্মীদের কর্মকাণ্ড যদি গণমাধ্যমে উঠে না আসে, তবে সরকার প্রধান জানতেই পারবেন না কোথায় বিচ্যুতি ঘটছে। যদি গণমাধ্যম ভয়ে বা চাপে পড়ে এই সত্যগুলো চেপে যায়, তবে সমাজে অপরাধ প্রবণতা আরও বাড়বে এবং অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠবে। কারণ যখন কোনো অসংগতি বা অপরাধ সংশোধনের সুযোগ থাকে না, তখন তা মহীরুহে পরিণত হয়।
সরকার যখন গণমাধ্যমের সমালোচনাকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করে, তখন সেটি রাষ্ট্রের জন্য আর্শীবাদ হয়ে দাঁড়ায়। গণমাধ্যম দেশের অভ্যন্তরীণ অপরাধ থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক নানা ষড়যন্ত্র বা অসংগতির কথা তুলে ধরে রাষ্ট্র পরিচালনার প্রধানের চোখের সামনে নিয়ে আসে।
এই তথ্যের ভিত্তিতে সরকার নিজেকে সচেতন করতে পারে এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করে বড় কোনো বিপদ থেকে রাষ্ট্রকে রক্ষা করতে পারে। মূলত গণমাধ্যম সরকারের কোনো শত্রু নয়, বরং সরকারের ‘অন্তর্দৃষ্টি’ এর সীমাবদ্ধতাকে কাটিয়ে তুলতে সাহায্য করে। গণমাধ্যমের প্রকাশিত সংবাদকে যদি সরকার বৈরিতা হিসেবে না দেখে নিজেদের ভুলত্রুটি সংশোধনের একটি বিশেষ সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করে, তবেই একটি সমৃদ্ধ ও দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র গঠন সম্ভব।
অথচ বর্তমানে চিত্রটি উল্টো। সত্য প্রকাশ করলেই গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা করা হয়। সাংবাদিক হয়রানি বা আক্রমণ প্রকারান্তরে রাষ্ট্রের কল্যাণকেই বাধাগ্রস্ত করে। কারণ গণমাধ্যম যদি অন্ধ হয়ে যায়, তবে সরকারও এক প্রকার দৃষ্টিশক্তিহীন হয়ে পড়ে। সরকার যা জানছে না, তা যদি গণমাধ্যম না জানায়, তবে সেই অজ্ঞতা রাষ্ট্রকে অন্ধকার গহ্বরে ঠেলে দিতে পারে। তাই একটি প্রগতিশীল রাষ্ট্রের জন্য গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা সরকারের নিজের স্বার্থেই জরুরি।
গণমাধ্যম ও সরকারের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও আস্থার পরিবেশ থাকলে দেশের অপরাধ প্রবণতা হ্রাস পায় এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। পরিশেষে বলা যায়, গণমাধ্যম সত্যের পথে হাঁটলে তা প্রকারান্তরে সরকারের জনবান্ধব ইমেজ তৈরিতেই সহায়তা করে। কারণ সত্য যতই তেতো হোক, তা সংশোধনের পথ দেখায় আর তোষামোদি শুধু পতনকে ত্বরান্বিত করে। তাই গণমাধ্যমকে প্রতিপক্ষ না ভেবে রাষ্ট্রের সহযোগী শক্তি হিসেবে দেখাটাই বুদ্ধিমান ও দূরদর্শী সরকারের পরিচয়।
ওসমান গনি
সাংবাদিক ও কলামিস্ট
